E-Paper

ভোটমুখী রাজ্যে উপহার? কাঠামোগত সংস্কার? ভোট আর সংস্কারের ভারসাম্য রক্ষাই চ্যালেঞ্জ নির্মলার

নির্মলা টানা ন’বার বাজেট পেশ করতে চলেছেন। আর কোনও অর্থমন্ত্রীর এমন রেকর্ড নেই। সেই সঙ্গে এ বারের প্রেক্ষাপটও অভূতপূর্ব। দেশে আর্থিক বৃদ্ধির হার যথেষ্ট ভাল।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৪৪
নির্মলা সীতারামন।

নির্মলা সীতারামন। — ফাইল চিত্র।

বিধানসভা ভোটমুখী রাজ্যের জন্য উপহার। বিকশিত ভারত-এর লক্ষ্য পূরণে আর্থিক বৃদ্ধিকে চাঙ্গা রাখতে কাঠামোগত সংস্কার।রবিবারের বাজেট কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সামনে এই রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষা।

সামনে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, কেরল, তামিলনাড়ু, পুদুচেরিতে বিধানসভা নির্বাচন। ভোটমুখী রাজ্যের বিজেপি নেতাদের প্রত্যাশা থাকবে, বাজেটে মোদী সরকার এই সব রাজ্যের জন্য কিছু না কিছু উপহার ঘোষণা করবে। যাতে বিজেপির প্রচারে নামতে সুবিধা হয়। গত বছরের বাজেটে ভোটমুখী বিহারের জন্য ঠাসা উপহার ছিল। নির্মলা সীতারামন বিহারের মধুবনী প্রিন্টের শাড়ি পরেই বাজেট পেশ করেছিলেন। এ বার তিনি বাংলা, অসম না কি কেরল, তামিলনাড়ু, কোন রাজ্যের শাড়ি পরবেন, তা নিয়ে রীতিমতো বাজি ধরছেন বিজেপি নেতারা।

এই রাজনৈতিক চাহিদার সঙ্গে অর্থনীতির দাবি হল, এ বারের বাজেট কাঠামোগত সংস্কারের দিশা দেখাক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের পরোয়ানা ও ইউক্রেন থেকে ইরানে যুদ্ধের আবহে বিশ্ব বাজারে এখন ঘোর অনিশ্চয়তা। তার মধ্যেও ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার উঁচু তারে বেঁধে রাখতে হলে এবং কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। যাতে দেশের শিল্পপতিরা বিনিয়োগে উৎসাহ পান, আরও বিদেশি লগ্নি আসে এবং রফতানি থেকে বিদেশি মুদ্রার আয় বাড়ানো যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ২০৪৭-এ ‘বিকশিত ভারত’ বা উন্নত অর্থনীতির লক্ষ্য পূরণ করতেও আগামী দশ-বিশ বছর টানা ৮ শতাংশ হারে আর্থিক বৃদ্ধি দরকার।

অর্থ মন্ত্রক সূত্রের খবর, কাঠামোগত সংস্কারের বার্তা দিতে রবিবার বাজেটে অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেটের দ্বিতীয় ভাগ বা ‘পার্ট বি’, যেখানে নীতি নির্ধারণ, সংস্কারের কথা থাকে, সেখানে অনেক বেশি সময় ব্যয় করবেন। সাধারণত অর্থমন্ত্রীরা বাজেটের প্রথম অংশ বা ‘পার্ট এ’, যেখানে কোন প্রকল্পে কত অর্থ বরাদ্দ হল, তার পিছনে বেশি বাক্য ও সময় ব্যয় করে থাকেন। সেই তুলনায় অর্থমন্ত্রী এ বার বাজেটে মোদী সরকারের সামনে আশু অগ্রাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের নীতি, শুল্ক বা কর সংক্রান্ত বিষয়ে বেশি জোর দিতে চাইছেন।

নির্মলা টানা ন’বার বাজেট পেশ করতে চলেছেন। আর কোনও অর্থমন্ত্রীর এমন রেকর্ড নেই। সেই সঙ্গে এ বারের প্রেক্ষাপটও অভূতপূর্ব। দেশে আর্থিক বৃদ্ধির হার যথেষ্ট ভাল। মূল্যবৃদ্ধির হার খুবই কম। আর্থিক বৃদ্ধির সাহায্যে শিল্পের জন্য সস্তায় ঋণ নিশ্চিত করতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদের হার কমাচ্ছে। যাতে শিল্পের জন্য ঋণ সস্তায় মেলে। একেবারে আদর্শ স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি। অথচ বিশ্ব অর্থনীতিতে ঘোর অনিশ্চয়তা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কবে থামবে, ইরানে কবে আমেরিকা হামলা করে বসবে, তার কোনও ঠিক নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্প শুল্ক-যুদ্ধ শুরু করেছেন। ভারতের উপরে তিনি ৫০% শুল্ক চাপিয়েছেন। আমেরিকার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তি এখনও অধরা।

এই অনিশ্চয়তার ফলে ভারতে প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নি, শেয়ার বাজারে বিদেশি তহবিলগুলির লগ্নি শুকিয়ে আসছে। টাকার দর হু হু করে নামছে। বিনিয়োগকারীরা এ দেশে বিনিয়োগ করতে ভরসা পাচ্ছেন না। কোভিডের আগে কর্পোরেট কর কমানো হয়েছিল। এখনও শিল্পপতিরা মেপে পা ফেলছেন। বাজারে চাহিদা বাড়াতে মোদী সরকার মোটামুটি ভাবে হাতের সব তাস ফেলে দিয়েছে। আয়করে ছাড় দেওয়া হয়েছে। জিএসটি ছাঁটাই করে জিনিসপত্রের দাম কমনো হয়েছে। কিন্তু শহরাঞ্চলে বাজারে বিক্রিবাটা তেমন বাড়েনি। রফতানি ধাক্কা খাওয়ায় বস্ত্র, চামড়া, জুতো, স্বর্ণ-অলঙ্কারের মতো শিল্পে, যেখানে বিপুল হারে কর্মসংস্থান হয়, সেখানে ‘গেল, গেল’ রব উঠেছে।

অর্থমন্ত্রীকে এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আর্থিক বৃদ্ধিতে উৎসাহ দিতে পরিকাঠামোয় লগ্নিতে যথেষ্ট খরচ করতে হবে। একই সঙ্গে রাজকোষ ঘাটতি, ঋণের বোঝা কমিয়ে আনার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে কাঠামোগত সংস্কারের বার্তা দিতে হবে। লাল ফিতের ফাঁস কাটিয়ে সরকারি নিয়ন্ত্রণ আলগা করতে হবে। শিল্পমহলের জন্য কর জমা, সরকারি বিধিনিয়ম পালনের প্রক্রিয়া সহজ ও আধুনিকীকরণ করতে হবে। বাজারে চাহিদা বাড়াতে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।

আর্থিক উপদেষ্টা সংস্থা ডেলয়েট ইন্ডিয়া-র অর্থনীতিবিদ রুমকি মজুমদারের মতে, ‘‘শুল্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি এড়ানোর মানসিকতা, কর্পোরেট আয় কমতে থাকার ফলে গত বছর এ দেশের শেয়ার বাজার থেকে বিদেশি লগ্নিকারীরা সরে গিয়েছেন। ফলে টাকার দর প্রবল ভাবে পড়েছে। ফলে আমদানির খরচ বেড়ে যেতে পারে। মূল্যবৃদ্ধি আবার মাথাচাড়া দিতে পারে।’’ তাঁর আশা, রফতানির বাজারে অনিশ্চয়তার ফলে ছোট-মাঝারি শিল্পের পাশে দাঁড়াবে মোদী সরকার। জরুরি খনিজ, বিরল মৌলের উত্তোলন ও বিকল্প জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করার চেষ্টা হবে। বিদেশি লগ্নির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে।

গত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আয়করে ছাড় দিয়েছিলেন। এ বার তাই আয়করে বিরাট কোনও রদবদল হওয়া কঠিন। যদিও আয়কর হিসেবের ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন বাড়ানো হবে, শেয়ার বাজারের আয়ে কর কমানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আয়করের বোঝা কমানোর পরে জিএসটি কমানো হয়েছে। ফলে কর বাবদ আয় কিছুটা ধাক্কা খেয়েছে। নতুন আয়ের রাস্তা তৈরিতে অর্থমন্ত্রী ফের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের পথে হাঁটবেন কি? আর্থিক সমীক্ষায় তেমন সুপারিশ রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, বেসরকারি লগ্নি ও বিদেশি পুঁজির অভাব পূরণে অর্থমন্ত্রীকে গত কয়েক বছরের মতোই পরিকাঠামোয় খরচে জোর দিতে হবে। আমদানি শুল্কের সংস্কার, ছোট-মাঝারি শিল্পের জন্য সরকারি নিয়ম পালনের ব্যবস্থা সহজ করা এবং ট্রাম্পের শুল্কের চাপে আতঙ্কিত রফতানিকারী ছোট-মাঝারি সংস্থাকে সুরাহার ব্যবস্থা করতে হবে। ভারতের পণ্যের গুণগত মান বাড়ানো, গবেষণা-মানোন্নয়নে উৎসাহ দিতে হবে, যাতে আমেরিকার বাইরে ব্রিটেন, ইউরোপের বাজারে রফতানি বাড়ানো যায়। রফতানিকারী সংস্থাগুলির সংগঠন ফিও-র সভাপতি এস সি রলহন বলেন, ‘‘রফতানির কঠিন বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে পণ্য তৈরির খরচ কমাতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে কাঁচামালে আমদানি কর পণ্যের উপরে করের থেকে বেশি। এই সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। গবেষণা-মানোন্নয়নন-উদ্ভাবনে উৎসাহ দিতে এ ক্ষেত্রে খরচে কর ছাড় দিতে হবে। বিশ্ব বাজারে ভারতীয় পণ্যের বিপণনে উৎসাহ দিতেও কর ছাড় দেওয়া উচিত।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Nirmala Sitharaman Budget

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy