শিজ়ুও আইশিমা কে ছিলেন? গুগল না করে চট করে বলা কঠিন। আরও প্রণিধানযোগ্য, কিছু দিন আগে অবধিও গুগল করেও বলা ছিল অসম্ভব। কারণ, শিজ়ুও আইশিমা ‘বিশেষ’ কেউ ছিলেন না। ছিলেন আমার-আপনার, আরও পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই; চাকুরিজীবী, সংসারী, সাধ্যবিত্ত। অন্তত ফেব্রুয়ারি, ২০২০ অবধি তা-ই ছিলেন। ২০২০-র মার্চে জাপানের পুলিশ শিজ়ুও আইশিমাকে গ্রেফতার করে চিনে বেআইনি জৈব-রাসায়নিক অস্ত্র পাচারের অভিযোগে। আইশিমার দাবি, তিনি নির্দোষ।
জেলে বন্দি থাকাকালীনই আইশিমার ক্যান্সার ধরা পড়ে। এক বার-দু’বার নয়, আট-আট বার তাঁর জামিনের আবেদন নাকচ হয়। অবশেষে এগারো মাস পরে, ২০২১-এর ফেব্রুয়ারিতে ৭২ বছর বয়সে শিজ়ুও আইশিমা মারা যান।
এ লেখা এখানেই শেষ হওয়ার কথা। সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ নীরস ইতিহাস তো এইটুকুই। তা হলে বাকি কাহিনির অর্থ কী? প্রয়োজনই বা কোথায়? প্রয়োজন, কারণ মানুষ তথ্য নয়, কাহিনিতেই বিশ্বাস করে এসেছে বার বার। প্রয়োজন, কারণ গল্পের ক্ষমতা নথির চেয়ে ঢের বেশি। আর আসল কাহিনির সূচনা ঠিক সেখান থেকেই, যেখানে নথিবদ্ধ লিপির আঙুল পৌঁছয় না।
আইশিমা ছোট থেকেই যন্ত্রপাতি সারাতে, তৈরি করতে ভালবাসতেন। স্কুল-কলেজের ছাত্র থাকাকালীনই বাড়িতে বানিয়ে ফেলতেন রেডিয়ো, অ্যামপ্লিফায়ার ইত্যাদি টুকিটাকি যন্ত্রপাতি। সে ছেলে যে বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেবে, সেটাই স্বাভাবিক। আইশিমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
ইয়োকোহামা শহরের একটি বিখ্যাত কোম্পানি ওহ্কাওয়ারা কাকোহকিতে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর কাজ করেছেন আইশিমা। চাকরিজীবনের শেষ দিকে প্রায়ই বৌকে বলতেন, “চাকরি ছেড়ে, চলো— দু’জনে মাউন্ট ফুজির তলায় গিয়ে বাসা বাঁধি। ছোট্ট কটেজ মতো তৈরি করব। আমি বাড়ির বাগানে আনাজপাতি চাষ করব। দু’জনে মিলে তাকিজাইকু (বাঁশ দিয়ে নানারকম কুটিরশিল্প) তৈরি করব।”
বলতেন বটে, কিন্তু...
ওহ্কাওয়ারা কাকোহকি সংস্থাটির সবচেয়ে বেশি নামডাক ছিল স্প্রেয়ার অ্যান্ড ড্রায়ার বানানোয়। যেমন-তেমন স্প্রেয়ার-ড্রায়ার নয়, উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্র যা তরল বস্তুকে মুহূর্তে ধুলোগুঁড়োয় বদলে দিতে পারে। এই যে আপনি প্যাকেট থেকে কফির গুঁড়ো গরম জলে ফেলে ইনস্ট্যান্ট কফি বানিয়ে খান, সেই গুঁড়ো আসলে তরল কফিকে এই ধরনের স্প্রেয়ার-ড্রায়ারের মধ্যে দিয়ে চালনা করেই তৈরি করা।
রেডিয়ো, অ্যামপ্লিফায়ারের মতো আইশিমা স্প্রেয়ার-ড্রায়ার তৈরি করতেও ভালবাসতেন। তাই, চাকরি ছেড়ে মাউন্ট ফুজি যাওয়া হয়ে উঠত না শেষমেশ।
এক দিন তাঁর ভাগ্য খুলে গেল। ওহ্কাওয়ারা কাকোহকি-র একটি গবেষণাগার ছিল মাউন্ট ফুজির পাদদেশেই, ফুজিনোইমিয়া শহরে। ২০১৮ সালে আইশিমাকে সেই গবেষণাগারের পরামর্শদাতা হিসেবে পাঠানো হল সেখানে। কোম্পানির দেওয়া বাড়িটির জানলা দিয়ে দেখা যায় গর্বোদ্ধত মাউন্ট ফুজি।
স্বপ্নের চাকরির স্বপ্নের শেষ অধ্যায়। স্বপ্নের অবসর! কিন্তু স্বপ্নের সমস্যা হল, তা বড় ক্ষণস্থায়ী।
অচিরেই দুঃস্বপ্নের কালো মেঘ ঘনিয়ে এল। টোকিয়ো মেট্রোপলিটান পুলিশ সন্দেহ করতে শুরু করল, ওহ্কাওয়ারা কাকোহকি বেআইনি উপায়ে বিপজ্জনক জৈব-রাসায়নিক অস্ত্র পাচার করছে চিনে।
স্প্রেয়ার অ্যান্ড ড্রায়ার কোম্পানির সঙ্গে জৈব-রাসায়নিক অস্ত্রের কী সম্পর্ক? ব্যাপার হল, স্প্রেয়ার অ্যান্ড ড্রায়ার শুধু আপনার কফির স্বাদ-গন্ধেরই বারোটা বাজায় না; বাতাসে ছড়িয়ে দিতে পারে কৃত্রিম জীবাণু বা ক্ষতিকারক ন্যানো-পার্টিকল! ফলে জৈব-রাসায়নিক অস্ত্র হিসেবে তা দারুণ কার্যকর। এ ধরনের যন্ত্র রফতানির জন্য সরকার থেকে বিশেষ অনুমতি লাগে।
অতএব, শুরু হল পুলিশি তদন্ত। আইশিমা ছাড়াও আরও অন্তত জনা-পঞ্চাশেক কর্মচারীকে নিয়মিত পুলিশি জেরার মুখোমুখি হতে হল।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রতি বার ফুজিনোইমিয়া থেকে যেতে হত হারাজাকু থানায়। ট্রেনেই যাও বা গাড়িতে, সময় লাগত কম-বেশি আট ঘণ্টা। সত্তর বছরের আইশিমা এই পথটি পেরিয়েছিলেন কুড়ি বার— পেরিয়েছিলেন তাঁর কাজ ও চরিত্রকে সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখবেন বলেই। কাজ হয়নি তাতে।
২০২০ সালের ১১ মার্চ। পুলিশ এসে দরজায় কড়া নাড়ল, “আপনাকে যেতে হবে আমাদের সঙ্গে। একটু কাজ আছে।”
পরের দিনই আইশিমার স্ত্রী আতঙ্কিত, বিস্ফারিত চোখে টিভিতে দেখলেন তাঁর স্বামীকে; হাতে হাতকড়া। স্ত্রীর যে কোনও কৌতূহল, যে কোনও প্রশ্নের জবাব থাকত আইশিমার কাছে। কিন্তু জেলখানায় স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে এসে আকুল স্ত্রী যখন জিজ্ঞেস করলেন কী করে এমন হল, আইশিমা নিরুত্তর রইলেন। এই প্রথম বার!
জাপানি আইনে অভিযুক্ত অপরাধীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল না করেও তাকে তেইশ দিন আটক রাখা যায়। তার পরে ফের নতুন করে গ্রেফতার করে, ফের আরও তেইশ দিন। এই ভাবে... যত দিন ইচ্ছে!
আইনের এই প্যাঁচটির অপব্যবহারের নিদর্শন জাপানে অজস্র। কাউকে ১০৮ দিন বিনা বিচারে আটকে রাখা হয়েছে তো কাউকে দশ মাস! ওসাকায় এমন ঘটনার কথাও শোনা যায়, যেখানে চল্লিশ দিন স্বামী-স্ত্রীকে আটক রাখার পর পুলিশ স্বীকার করে নেয়, তারা ভুল লোককে গ্রেফতার করেছিল।
আইশিমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রমী কিছু ঘটল না। তাঁর উকিল গাও তাকাদা মক্কেলের জামিনের আবেদন করলেন এবং যথারীতি তা প্রত্যাখ্যাত হল। কারণ দর্শানো হল, ছাড়া পেয়ে অভিযুক্ত প্রমাণ লোপের চেষ্টা করবে। উকিল লিখিত অঙ্গীকার করলেন, পরিবারের কেউ অভিযুক্ত কোম্পানি বা তার কোনও কর্মচারীর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখবে না। নিজেদের ফোন, ইমেল, চিঠিপত্রও তদন্তের সুবিধার্থে দাখিল করবে।
বরফ গলল না তাতেও। বদলে গাজর ঝোলানো হল মরিয়া অভিযুক্তের সামনে, ‘অপরাধ স্বীকার করে নাও। জামিন পেয়ে যাবে।’
দৃঢ়স্বরে অস্বীকার করলেন আইশিমা, যে অপরাধ তিনি করেননি, হাজতবাস এড়াতে তা তিনি স্বীকার করবেন না কোনও মতেই।
‘তা হলে ফেরত যাও জেলে।’
তিনটি তাতামি মাদুরের সমান আয়তনের সঙ্কীর্ণ সেলে বসবাস করতে-করতে বৃদ্ধ আইশিমার শরীর ভাঙতে থাকল দ্রুত। অন্ত্র থেকে ক্রমাগত রক্তক্ষরণের ফলে ভুগতে শুরু করলেন তীব্র রক্তাল্পতায়। এক বার রক্তও দিতে হল তাঁকে।
২০২০-র ২৯ সেপ্টেম্বর, ফের জামিনের আবেদন। ফের নাকচ। সপ্তাহখানেকের মাথায়, জেলের ডাক্তারের এন্ডোস্কোপিতে ধরা পড়ল পাকযন্ত্রের ক্যান্সার। আরও সপ্তাহ খানেক ভোগান্তির পরে সরকার-বাহাদুরের খানিক দয়া হল। আট ঘণ্টার ছুটি মঞ্জুর হল, হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করার জন্য। জানা গেল, ক্যান্সার প্রায় শেষ পর্যায়ে; ছায়া ফেলেছে গোটা পাকযন্ত্রেই। কিন্তু ছাড় পাওয়া গেল না তাতেও। ২০২০-র নভেম্বরে কেমো দেওয়া হল প্রথম বার, ওই আট ঘণ্টা ছুটির অবকাশে।
কেটে গেল ২০২০। ডাক্তাররা জবাব দিয়ে দিয়েছেন, কেমো দিয়ে আর কোনও লাভ নেই। তত দিনে আইশিমা পুরোপুরি চলৎশক্তিরহিত।
অনড়, অমানবিক বিচারব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ, হতাশ আইনজীবী গাও তাকাদা তবু হাল ছাড়লেন না।
২০২১-এর ৪ ফেব্রুয়ারি, নবম বারের বার জামিন আবেদন অবশেষে মঞ্জুর হল। এগারো মাস পর জেলের বাইরে এসে খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিলেন মুমূর্ষু আইশিমা।
আর জামিন পাওয়ার তিন দিনের মাথায়, ৭ ফেব্রুয়ারি, শিজ়ুও আইশিমা মারা গেলেন। বছর-দেড়েক আগে থেকে মাউন্ট ফুজির পাদদেশে স্বপ্নের কুটির তৈরি করবেন বলে সরঞ্জাম কিনতে শুরু করেছিলেন তিনি। মাউন্ট ফুজির পাদদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রইল সে সব।
জানতে পারলেন না, আর মাস পাঁচেক বাদেই, মামলা কোর্টে ওঠার মাত্র চার দিন আগে সমস্ত অভিযোগ তুলে নেবে সরকারি কৌঁসুলি। নির্লজ্জের মতো জানাবে, “নতুন করে তদন্ত করে আমাদের মনে হয়েছে, রফতানির নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ধারাগুলি এ ক্ষেত্রে হয়তো ঠিকঠাক প্রযোজ্য নয়। এ সব কথা আমরা বিচারককে ঠিক করে বোঝাতে পারব না। তিনি হয়তো ভুল বুঝতে পারেন, ভাবতে পারেন আমরা ইচ্ছাকৃত ভাবে আইনের অপব্যবহার করেছি!”
গল্পটা এখানেও শেষ হতেই পারত। হাজার হোক, নির্লজ্জ উদাসীন ‘সিস্টেম’-এর শীতল লাশকাটা ঘরে শিজ়ুও আইশিমার মতো আরও কোটি-কোটি মৃতদেহ পড়ে আছে। হল না, স্রেফ আইশিমার পরিবারের নাছোড়বান্দা জেদে।
ক্ষতিপূরণ চেয়ে তাঁরা মামলা করে বসলেন খোদ সরকারের বিরুদ্ধেই। সেই মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসে (জুলাই, ২০২৩) সরকারি কৌঁসুলি জোর গলায় দাবি করলেন, তদন্ত পরিচালনায় তাঁর কোনও ভুল ছিল না। আবার সুযোগ পেলে, তিনি আবার একই সিদ্ধান্ত নিতেন।
আইশিমার স্ত্রী চোয়াল চেপে শান্তস্বরে শুধু বললেন, “ওদের আমার স্বামীর কবরের সামনে এসে ক্ষমা চাইতে হবে এক দিন। হবেই।”
২০২৩-এর ডিসেম্বর, এক তদন্তকারী অফিসার আদালতের সামনে স্বীকার করলেন, তদন্তে ব্যাপক কারসাজি ছিল। ঘুরপথে ফাঁসানোর জন্যই...
আদালত নির্দেশ জারি করলেন, এক মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে আইশিমার পরিবারকে।
আইশিমার স্ত্রী শান্তস্বরে পুনরাবৃত্তি করলেন, “ওদের আমার স্বামীর কবরের সামনে এসে ক্ষমা চাইতে হবে।”
দীর্ঘ দু’বছরের নানা টালবাহানা, উচ্চ-আদালতে আপিল, সরকারি দীর্ঘসূত্রতা ও শীতল উপেক্ষা এক সময় নতিস্বীকার করল, করতে বাধ্য হল ন্যায়বিচারকামী দৃঢ়চেতা এক পরিবারের অনমনীয় লড়াইয়ের কাছে, তীব্র বিরুদ্ধ-জনমতের কাছে।
গত ২৫ অগস্ট ২০২৫, সরকারি কৌঁসুলি, পুলিশের বড়কর্তা-সহ উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিকরা সমবেত হলেন মাউন্ট ফুজির পাদদেশে। সারা পৃথিবীর তাবড়-তাবড় সংবাদমাধ্যম এসে তুলল সেই ছবি; দাবানলের মতো সেই খবর, ছবি ছড়িয়ে পড়ল আন্তর্জাতিক সংবাদ-মাধ্যমে, আন্তর্জালে। জনৈক মধ্যবিত্ত শিজ়ুও আইশিমা, যার নাম কিছু মাস আগেও গুগলে খুঁজে পাওয়া যেত না, সেই নাম-না-জানা মানুষটির সমাধির কাছে মাথা নিচু করে ক্ষমা চাইতে এসেছে প্রবল প্রতাপান্বিত ‘সিস্টেম’!
আইশিমার স্ত্রী ‘ট্রিবিউন’-এর সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে দৃঢ়স্বরে শুধু বললেন, “ওঁরা ক্ষমা চেয়েছেন, আমি শান্তি পেয়েছি। কিন্তু আমি ওঁদের ক্ষমা করব না।”
শিজ়ুও আইশিমার গল্প নিছক বিয়োগান্তক মৃত্যুর গল্প নয়, ‘সিস্টেম’-এর কাছে এক অসহায় নাগরিকের হেরে যাওয়ার গল্প নয়, এ গল্প রূপকথার, সত্যের জয় ও মিথ্যার পরাজয়ের। কিছু দিন আগে, আমাদের ঘরের কাছেই, এই কলকাতায়— ‘সরকার বনাম স্বপন কুমার মণ্ডল’ মামলায় রায় দিতে গিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের মহামান্য বিচারপতি বলেছেন: “রাইট টু স্পিডি ট্রায়াল ইজ় নট জাস্ট আ টুইঙ্কলিং স্টার ইন দ্য হাই হেভ্নস ওনলি টু বি প্রোভাইডেড লিপ সার্ভিস, বাট আ মিনিংফুল প্রোটেকটিভ প্রভিশন।”
সুবিচারের অধিকার শুধু অভিযোগকারীর নয়, অভিযুক্তেরও। আর বিলম্বিত বিচার, তা কারও পক্ষেই সুবিচার নয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)