E-Paper
WBState_Assembly_Elections_Lead0_04-05-26

ঘুম

পরে মা-র মুখে শুনেছি, দিদি সুশোভনদাকে ভালবাসত। সুশোভনদার বাড়ি জেঠুদের বাড়ির দুটো বাড়ির পরেই। সুশোভনদা ক্রিকেট খেলত। ফার্স্ট ডিভিশনে।

শৌভিক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২২
ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

সকালেই ফোন এল, “সুধাংশু আর নেই।”

সুধাংশু মিষ্টিদির বর। বিস্তর ভুগছিল। সকলের জানা ছিল কী পরিণতি হতে পারে। কসবা থেকে জেঠু নিজে ফোন করেছিল। এই বয়সে এসে নিজের জামাইয়ের মৃত্যুসংবাদ দিতে হচ্ছে জনে জনে। জীবন মানুষের পরীক্ষা নেয়। কখনও সে-সব বড় কঠিন হয়ে পড়ে। মিষ্টিদির যখন বিয়ে হল, আমি তখন ক্লাস সেভেন। আমার পরিষ্কার মনে আছে। জেঠিমার সব গয়না দিয়ে মিষ্টিদিকে সাজানো হয়েছিল। কী মিষ্টি লাগছিল ওকে! আমি নিতকনে হয়েছিলাম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব দেখছিলাম। মেয়েদের মধ্যে এই সব নিখুঁত ভাবে লক্ষ করার সহজাত ক্ষমতা থাকে। আমার বেশ পরিষ্কার মনে আছে, বিয়ের দিন মিষ্টিদি মাঝে মাঝেই কাঁদছিল। আমি ওর সঙ্গে সর্বক্ষণ ছিলাম।

জেঠিমা বোঝাচ্ছিল, “কী করবি বল। তোর বাবার ইচ্ছে। এত ভাল চাকরি!...” আরও কত কী।

পরে মা-র মুখে শুনেছি, দিদি সুশোভনদাকে ভালবাসত। সুশোভনদার বাড়ি জেঠুদের বাড়ির দুটো বাড়ির পরেই। সুশোভনদা ক্রিকেট খেলত। ফার্স্ট ডিভিশনে। মিষ্টিদিকে ইডেনের টিকিট জোগাড় করে দিত। মিষ্টিদির কলেজের দু’ব্যাচ সিনিয়র ছিল সুশোভনদা। এখনও মনে আছে, এক বার আমি আর মা বইমেলা গেছি, আমি তখন ক্লাস ফাইভ, তখন ময়দানে বইমেলা হত, হঠাৎ দেখি সুশোভনদা আর মিষ্টিদি। ডাকতে গেলাম, মা বাধা দিল। বড় হয়ে বুঝেছি, মা ঠিকই করেছিল।

মিষ্টিদির বিয়ের বয়স হলে জেঠু সুশোভনদাকে গ্রাহ্যের মধ্যেই আনল না। একে তখনও পর্যন্ত সুশোভনদা বেকার, তার উপর কসবায় যে বাড়িতে সুশোভনদা থাকত, আসলে সেটা ওর মামাবাড়ি। ওর বাবা-মায়ের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল। মিষ্টিদির বিয়ের আগে থেকেই সুশোভনদাকে আর পাড়ায় দেখা যেত না। সুশোভনদার যাতায়াত আমাদের পাড়াতেও ছিল। নেতাজি সংঘে রোজ বিকেলে প্র‍্যাকটিস করাতে আসত সুশোভনদা। শুনেছিলাম, সুশোভনদা কলকাতা ছেড়েছে। প্রেমে ধাক্কা খেয়ে, অপূর্ণ প্রেমের বেদনায় কি না জানি না! পরে অনেকটা বড় হওয়ার পরে বুঝেছি, প্রেমের পূর্ণতার সঙ্গে বিবাহের সম্পর্ক নামমাত্র। প্রেম বোধহয় একটা আপেক্ষিক বিষয়। স্থান কাল আর স্বয়ং পাত্রপাত্রীর উপরেই নির্ভর করে প্রেমের মেয়াদ।

এখন আমি পঁচিশ। আমি আর মিষ্টিদি বন্ধুর মতোই মিশি। এই তো ক’মাস আগে এক দিন মিষ্টিদিকে হঠাৎই জিজ্ঞেস করলাম, “তোর আর সুশোভনদাকে মনে পড়ে?”

আমার মুখে সরাসরি এমন প্রশ্ন শুনে মিষ্টিদি প্রথমে থমকে গিয়েছিল, তার পর খুব নিচু গলায় চোখ সরিয়ে বলেছিল, “রোজ!”

“তুই যাচ্ছিস তো?” আজ সকালের ফোনে জেঠু খুব নিচু স্বরে জানতে চেয়েছিল। আমার বাবা-জেঠুরা প্রত্যেকে এক-একটা মেগালোম্যানিয়াক ছিল। এখন বয়সের ভারে আর জীবনের পরীক্ষায় ডাহা ফেল মেরে ভিজে বিড়াল সেজে ঘুরে বেড়ায়। অফ টাইমে এরা জীবন নিয়ে খেলা করে এসেছে চিরকাল। অস্ত্র ছিল ফাঁপা পৌরুষের অহঙ্কার।

“হুম, আসছি!”

“আর অনির্বাণ?”

বললাম, “জানি না। আমি একাই আসছি। রাখো।”

জেঠু খুব ভাল করে জানে, আমার আর অনির্বাণের কক্ষপথ সম্পূর্ণ আলাদা। অনির্বাণ গত তিন দিন ধরে অফিস ট্যুরে ছিল, তখনও জানি না আজ ভোরে সে ফিরেছে। আমি কি জেঠুর সঙ্গে একটু বেশি রুক্ষ ব্যবহার করে ফেললাম? আসলে প্রায়ই মিষ্টিদির যন্ত্রণার অধ্যায়গুলো চোখের সামনে খুলে যায়। আর অভিভাবক হিসেবে মনের কাঠগড়ায় জেঠুকে দেখতে পাই, মনে পড়ে যায় তার সার্বিক অপদার্থতা এবং অক্ষম দাপট। কেন্দ্রীয় সরকারি চাকুরির লোভে সামান্য খোঁজখবরটুকু না করেই কুড়ি বছরের বড় এক জনের সঙ্গে মিষ্টিদির বিয়ে দিয়ে দিল! যুক্তি— “এমন পাত্র আর মিলবে না, মিষ্টি সুখে থাকবে।” পরে জানা গেল, একটা বেহেড মাতালের সঙ্গে মিষ্টিদির বিয়ে হয়েছে। প্রতিদিন মদ খেয়ে এসে বৌকে বেধড়ক মারে। লোকটা অফিস চলে গেলে মিষ্টিদি প্রায়ই আমাদের বাড়ি চলে আসত। আমার তখনও বিয়ে হয়নি। আমায় বলত, “মিলি, আমার মতো ভুল করিস না। রেজিস্ট্রি করে রাখ।”

আমি জেঠুর প্রতি রুক্ষ হতে চাই না। স্বতঃস্ফূর্ত বিরাগ থেকে রুক্ষতা এসে যায়। এক সময় আমার আর অনির্বাণের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তার পর খুব তাড়াতাড়ি আমাদের বিয়ে হয়ে যায়। আমরা আর একটু সময় চাইছিলাম।

“একে অপরকে বুঝতে গেলে আর কত সময় লাগে? বাকিটা বিয়ের পরেই বুঝো!” বাবা বলেছিল।

“ম্যাডাম, ওটিপিটা দেবেন!” অ্যাপ-ক্যাবের ড্রাইভার বলল। গাড়িতে উঠে বসে ওটিপি বললাম।

অনির্বাণ ফিরেছে বুঝতে পেরে বেরনোর আগে এক বার ওর রুমে নক করেছিলাম। ও অফিসের ল্যাপটপ খুলে কাজ করছে। ইতস্তত করেও বললাম জেঠু ফোন করেছিল, সুধাংশুদার খবর দিলাম।

“ইললিমিটেবল কনসাম্পশন অব লিকার রেজ়াল্টস ইন ডেথ! আই হ্যাভ নো ইন্টারেস্ট!” স্ক্রিন থেকে মুখ না তুলেই উত্তর দিল, যেমন দিয়ে থাকে। তবে জীবনে প্রথম বার অনির্বাণ এতগুলো স্পষ্ট কথা এক সঙ্গে বলল। ঠিকই তো বলেছে অনির্বাণ। জেঠু তার বিদেশি সওদাগরি অফিসের পোড়-খাওয়া বুদ্ধি নিয়ে একটা বেহেড মাতালের জীবনে মিষ্টিদিকে গেঁথে দিয়েছিল। এমনই রাশভারী ব্যক্তিত্ব ঝুলিয়ে রাখত যে, কেউ মুখের উপর কিছু বলতে পারত না। তবু এখন অনির্বাণের উত্তরটা কানে ভাল শোনাল না।

ড্রাইভার খুব জোরে ব্রেক কষল। কাল থেকে আমার পিরিয়ড স্টার্ট হয়েছে। তলপেটে ভীষণ ব্যথা। এই ব্যথাটা আমার সেই শুরু থেকেই। এক-দু’বার ডাক্তার দেখানো হয়েছিল। ডাক্তার বলেছিলেন, “বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে।”

আমার বিয়ে হয়েছে দু’বছর হল। ঠিক হয়নি।

“স্যরি দিদি। গত্ত ছিল।” আকস্মিক ব্রেক মারায় আমার যে অসুবিধে হয়েছে সেটা বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়ে নিল ড্রাইভার।

এখনও পরিষ্কার মনে পড়ে। এক দিন অনেক রাতে মিষ্টিদি এল। বিধ্বস্ত চেহারা। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। আমার তখন এইচ এস চলছে। মিষ্টিদি কনসিভ করেছিল। ওর বর নেশা করে ফিরে মারধর শুরু করে, “তোর পেটের বাচ্চা ফেলে দেব মেরে। আমার সুখ পাচ্ছি না মালটা আসার পর থেকে!”

তার পর মিষ্টিদির তলপেটে এলোপাথাড়ি লাথি চালায়। মিষ্টিদি আমার আড়ালে মাকে বলেছিল। শুনেছিলাম। মা রাগে ফুঁসে উঠে বলল, “ক্ষমার অযোগ্য!”

সেই রাতে মিষ্টিদির পেটে যন্ত্রণা হল, সঙ্গে ব্লিডিং। রাতেই ওকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল। মিষ্টিদির ওভারি এমন ভাবেই রাপচার্‌ড হয়ে গিয়েছিল যে, তার পর আর কখনও মা হওয়া হল না ওর। জেঠিমা সেদিন রুখে দাঁড়িয়েছিল, বলেছিল, “আমি আর ওকে ও বাড়ি পাঠাব না। মেয়েটা পড়ে পড়ে মার খাবে, আমি মা হয়ে কী করে সহ্য করব!”

জেঠু বলেছিল, “আমি সুধাংশুর সঙ্গে কথা বললাম। দেখলাম, খুব অনুতপ্ত। বলল, দ্যাট ওয়াজ় অ্যান অ্যাকসিডেন্ট, ও ইচ্ছে করে কিছু করেনি। বলল, সাউথ ইন্ডিয়া নিয়ে যাবে ট্রিটমেন্ট করাতে!”

দু’দিন পরে সাউথ কলকাতার একটা নার্সিংহোমে ওভারি বাদ দিয়ে দিতে হল মিষ্টিদির। তা ছাড়া নাকি উপায় ছিল না।

“আরে, ওভারি বাদ গেল মেয়েটার এই বয়সে! মেয়েটা আর মা হতে পারবে না!” কান্না চাপা গলায় বলেছিল জেঠিমা।

“বেশি ফ্যাচফ্যাচ কোরো না তো! অনেকেই মা হতে পারে না। দত্তক নেবে। না হলে ঘরে ডিভোর্সি মেয়ে নিয়ে বসে থাকো। আমি জানি না।” জেঠিমার কথায় বিরক্ত হয়ে জেঠু নাকি এ কথা বলেছিল। তার পর থেকে মিষ্টিদি কেমন চুপ করে গিয়েছিল। খুব কম কথা বলত।

সুধাংশুদার অদ্ভুত রুটিন ছিল। সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অফিস যেত। ফেরার পথে রোজ বারে বসে অসংখ্য ড্রিঙ্ক নিত। তার পর ট্যাক্সি করে টলতে টলতে, কখনও বমি করতে করতে ফিরত। লোকটার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় চাকরি ছিল। ঈর্ষণীয় বেতন ছিল। তবু মিষ্টিদি সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে যেত। ধার করত যত্রতত্র। বাড়িতে পাওনাদারও আসত। মিষ্টিদির গয়না যেতে থাকল। জেঠু চুপ করেই থাকল।

আমাদের ফ্যামিলির মেয়েরা ভিতু। তারা সিদ্ধান্ত নিতে শেখেনি। আসলে আশৈশব মেগালোম্যানিয়াক পুরুষদের ছায়ায় বেড়ে ওঠার মাশুল গুনতে হয়েছে এদের প্রত্যেককে। মিষ্টিদি আগে এক-আধ বার বলেছিল “আর না মিলি, আমি এ বার সব ছেড়ে বেরিয়ে আসব।”

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওর বরকে এ কথা বলেছে কি না!

বলেছিল, “বলেছি রে। ও খুব নোংরা কথা বলে। বিশ্রী কথা বলে সুশোভনকে নিয়ে।”

আমি অবাক হয়েছিলাম, জিজ্ঞেস করেছিলাম, “সুশোভনদার কথাটা এই লোকটা জানল কী করে?”

মিষ্টিদি আমায় আরও অবাক করে দিয়ে বলেছিল, “আমিই বলেছিলাম। প্রথমেই। অন্ধকারে রাখতে চাইনি। এখন উল্টো বিপত্তি হচ্ছে।”

“কী ঝামেলা হল বলুন তো দিদি!” মিছিলে গাড়ি আটকে যাওয়ায় ক্যাব ড্রাইভার বলল। রাস্তার মিছিলে জবাব চাইছে মানুষ, কোথাও ঘটে যাওয়া কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

কার কাছে জবাব চায় মানুষ? ঈশ্বরের কাছে? সমাজের কাছে? আইনের কাছে? পুলিশের কাছে? আমার মনে হয়, মানুষের নিজের কাছেও উত্তর চাওয়াটা দরকার।

মিষ্টিদিকে আমিও তো কত বার বলেছি, “পড়ে পড়ে মার খাস না! বেরিয়ে আয়!”

মিষ্টিদি শেষমেশ বেরিয়ে আসতে পারল না। বরং সারাটা জীবন জেঠুকে দুষতে থাকল, তাও প্রকাশ্যে নয়, আড়ালে। মিষ্টিদি আগামী দিনে নিজেকে দোষ দেবে। তার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে নিজে কিছু ব্যবস্থা নেয়নি। মাঝে যখন লোকটা অত্যধিক বাড়াবাড়ি করছিল, মিষ্টিদি এক দিন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। আমি বলেছিলাম, “থানায় একটা এফআইআর করে বেরিয়ে আয়। পুলিশ নাকে দড়ি পরিয়ে ঘোরাক। আমি তোর সঙ্গে আছি। এখনও সময় আছে, তুই সব কিছু নতুন করে শুরু করতে পারিস।”

“নাহ্! থানা-পুলিশ কেস-কাছারি করলে ও চাকরি থেকে সাসপেন্ডও হয়ে যেতে পারে। এমনিতে জমানো যা ছিল, সব শেষ করে ফেলেছে। তার মধ্যে যদি মাইনেও বন্ধ হয়ে যায়! ওর বাবা-মা তো কোনও অন্যায় করেনি, বল! ছাড়, আমার মার খেতে খেতে অভ্যেস হয়ে গেছে।”

আমার মুখে কথা জোগায়নি।

“দিদি, রেটিংটা একটু দেখে নেবেন প্লিজ!” ক্যাবের ছেলেটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে ওর পেশাগত আবদারটা করল। ছেলেটি ভাল।

একতলা বাড়ি। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। সামনের বারান্দার উপর মেঝেয় মৃতদেহ শোয়ানো। দু’-চার জন বিলাপ করে কেঁদে কেঁদে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে, লোকটা কত ভাল ছিল। এক জন মহিলা ফ্যাঁচ করে বলে উঠল, “মানুষটার সাত চড়ে রা ছিল না গো।”

জাস্ট তিন মাস আগের কথা। তখনও লোকটার লিভার ক্যান্সার ধরা পড়েনি। মিষ্টিদি এক বিকেলে আমাদের বাড়ি এসেছিল। মুখের এক দিক ভীষণ ভাবে ফুলে আছে। শুনলাম, আগের রাতে দিদির মুখে লাথি মেরেছে। দিদি পারত না লোকটার বিকৃত চাহিদা মেটাতে। না পারলেই বেধড়ক মার। আমি সে বারও থানায় যেতে চেয়েছিলাম। মিষ্টিদি কিছুতেই রাজি হল না, “নাহ্‌! ছেড়ে দে। মা-বাবা কষ্ট পাবে!”

আমি বললাম, “লোকটা একটা পারভার্ট, জানোয়ার! ওর জেল হওয়া উচিত! আর তুই-ই বা এগুলো সহ্য করিস কী করে!”

মেঝেয় শোয়ানো মৃতদেহটা চাদরে ঢাকা। জরাজীর্ণ চেহারাটা চাদরের তলায় মিশে আছে। কে বলবে, এই লোকটা ক’দিন আগে পর্যন্ত যৎপরোনাস্তি অত্যাচার করেছে মিষ্টিদির উপর! যখন ও নিয়মিত লোকটার জন্য হাসপাতাল-ঘর করত, শেষ কয়েকটা দিন যখন পুরোপুরি বিছানায় পড়ে গেছে, তখনও মিষ্টিদিকে নিয়মিত গালাগালি করত। বলত, “তোর মতো পাপী দুশ্চরিত্র বাঁজা মেয়েছেলে বিয়ে করেই এই রোগ হল আমার। ইচ্ছে করে লাথি মেরে বের করে দিই!”

আমি মিষ্টিদিকে বলতাম, “তুই এখনও... এখনও লোকটার জন্য প্রাণপাত করবি?”

“ডাক্তার বলেছে ওর শরীরের অবস্থা ভাল নয়, তাই আর কিছু...”

মিষ্টিদির শ্বশুর-শাশুড়িও কেমন যেন থমথমে হয়ে আছে। পুত্র যেমনই হোক না কেন, পুত্রশোকের ভার সব সময়ই অসহনীয়।

একটা আটাশ-তিরিশ বছরের ছেলে বিলাপ করে বলল, “কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল!” বাড়ির ভিতরে যেতে যেতে কথাটা শুনে তাকালাম। ছেলেটার মুখ চিনি। ফেসবুকে মিউচুয়াল ফ্রেন্ডে দেখেছি। মিষ্টিদির ননদের ছেলে। মামার চরিত্র হাড়ে হাড়ে জানে। এখন শোকের বাড়ির বাঁধা বুলি আওড়াচ্ছে। শুনতে পেলাম, দুর্গাপুরের ছোড়দি আর মালদহ থেকে বুড়িমাসি এলে ডেডবডি নিয়ে বেরনো হবে।

কেউ এক জন উৎকণ্ঠা প্রকাশ করল, “কাল রাত্রে এক্সপায়ার করেছে। এত ক্ষণ এ ভাবে...”

আমি এদের চিনি না। চিনতে চাইও না। আমি মিষ্টিদিকে খুঁজছি। বাকি কারও প্রতি আমি আগ্রহী নই। দেখলাম, জেঠিমা বসে আছে। এগিয়ে এসে হালকা চাপা স্বরে বলল, “মিষ্টি ওর ঘরে আছে। আমিই পাঠালাম। কাল রাত থেকে এখানেই বসেছিল।”

দোতলায় মিষ্টিদির ঘরের দরজা ঠেললাম। মিষ্টিদি আলুথালু ভাবে শুয়ে আছে। এসি চলছে। চোখ বন্ধ। কাছে গেলাম। ফুরফুর করে আওয়াজ হচ্ছে। চোখে-মুখে সেই কবেকার কৈশোরের প্রশান্তি। মিষ্টিদির সারা মুখ জুড়ে ছড়িয়ে আছে চিন্তাহীন, নিরুদ্বেগ ঘুম। মিষ্টিদি ঘুমোচ্ছে।

মনে হল, এমন একটা ঘুমদরকার আমারও।

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Short Story Short story

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy