নরম আলোয় রকিং চেয়ারটায় ভূতের মতো বসে আছেন অয়নেন্দ্র। ইদানীং রাতে ভাল ঘুম হয় না। কাল রাতেও হয়নি। ভোরের কিছু আগে এ পাশ-ও পাশ করে শেষটায় উঠেই পড়লেন। বারান্দায় তাঁর প্রিয় চেয়ারটায় বসে হালকা দোল খেতে খেতে ঝিমোচ্ছিলেন। খোলা রয়েছে রেডিয়ো। পান্নালাল গাইছেন, ‘দোষ কারও নয় গো মা, আমি স্বখাতসলিলে ডুবে মরি...’
হঠাৎ গাছের ডালপালা নড়ার শব্দে সচকিত হয়ে ওঠেন। কান খাড়া করে বোঝার চেষ্টা করেন, আওয়াজটা ঠিক কোন দিক থেকে আসছে। খুব ভুল না করলে এ নির্ঘাত কোনও ফুলচোরের প্রভাতী অভিযান।
এই এক হয়েছে! ঠিক ভোরবেলা যত রাজ্যের উটকো ঝামেলা। কাঁহাতক সামলানো যায়! অনেকে তো আবার ফুল ছিঁড়তে গিয়ে ডালসুদ্ধ ভেঙে ফেলে। এতটুকু মায়াদয়া নেই! অয়নবাবুর রাগ, বিরক্তি সবই হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, তিনি নিজেই রক্তাক্ত হচ্ছেন...
এ পাড়ায় ভদ্রলোকের বাস। কিছু বলাও যায় না। তবে মাঝে মাঝে ফুলচোরদের অন্তরটিপুনি দিয়ে কিঞ্চিত আত্মপ্রসাদলাভে যে তার রুচি নেই, এমনটা বলা যাবে না। পুষ্প যত দিন ছিল, কাউকে কিছু বলতে গেলে হাঁ-হাঁ করে উঠত। এখন...
নাহ্, এক বার দেখা দরকার। উসখুস করতে করতে উঠে পড়েন অয়ন। মেজেনাইন ফ্লোরের ঘর থেকে পাঁচিলের ওদিকটা স্পষ্ট দেখা যায়। পুষ্প ওটাকে দেড়তলার ঘর বলত। যাই হোক, উঠে গিয়ে দেখলেন তরফদার গিন্নি। আঁকশি বাগিয়ে যুদ্ধ চালাচ্ছেন। শিকার গুলঞ্চ। যা ভেবেছেন তা-ই। অনেকগুলো কুঁড়িসুদ্ধ একগোছা ফুলের ডাল ভেঙে ফেলেছেন। খুব রাগ হল। রাতে ভাল ঘুম না হওয়ায় মেজাজটা টকে আছে। মনে হল, শরসন্ধান করা যাক। নরম গলায় বললেন, “ও কী করছেন?”
এ পাশ-ও পাশ তাকিয়ে এক সময় তরফদার গিন্নি জানলায় অয়নেন্দ্রকে আবিষ্কার করলেন। খোদ মালিকের চোখে পড়ে যাওয়ায় একটু অপ্রস্তুত হলেও অপ্রতিভ হলেন না।
“আপনি ভাল আছেন? এই পুজোর একটু ফুল নিচ্ছিলাম।”
কায়দা দেখো! করছে চুরি। কুশল জিজ্ঞাসা করে সেটাকে আবার লঘু করার চেষ্টা!
“নেবেন না।”
“নেব না?”
তরফদার গিন্নির ভারী শরীর। ফুল তোলার কসরতে সাত সকালেই ঘেমেনেয়ে একশা। অয়নেন্দ্রর কথা একটু বেসুরো ঠেকল। ফের তাকালেন তাঁর দিকে। অয়নেন্দ্র ফের বলেন, “আপনি তো ফুল নিয়েই নিয়েছেন। ওই নেওয়ার কথা বলছি না। কিন্তু আপনার ঠাকুর ও ফুল নেবেন না।”
“নেবেন না... মানে?”
“চুরির মাল ঠাকুরের সহ্য হবে?”
হারার পাত্রী নন তরফদার গিন্নি। হাসতে হাসতে বললেন, “আপনি যে কী বলেন না অয়নদা! আমার গোপাল নিজেই তো ননীচোরা।”
“অ। ভক্ত আর ভগবান মিলে তো বেশ ভালই...”
“অমন বলবেন না! পড়েননি, পুষ্প আপনার জন্য ফোটে না...”
“সে তো বুঝলাম। তৱফদার গিন্নি সাতসকালে পুষ্পচয়ন করবেন বলে ফোটে! কিন্তু এ-ও পড়েছি, পরের দ্রব্য না বলিয়া লইলে...”
“দেখুন, পুষ্পদি কিন্তু কখনও আমাকে এমন কথা বলতেন না।”
“আপনার পুষ্পদি তো ছুটি নিয়ে হাওয়া। তা ছাড়া সে কখনও বাগান করেনি। পরিশ্রমটা বরাবর আমাকেই করতে হয়েছে। আপনাদের বাড়িতে তো অনেকটা জায়গা। সেখানে কিছু ফুলের গাছ-টাছ লাগান না কেন!”
“ও তো ফলের গাছেই ভর্তি।”
“হ্যাঁ। ফুল তো খাওয়া যায় না। ফুল গাছ লাগিয়ে কী হবে! ওটা অন্যের বাড়ি থেকে ম্যানেজ হলেই ভাল। কী বলেন?”
“আপনার কী হয়েছে বলুন তো!”
“কিচ্ছু না। শুধু বোঝাবার চেষ্টা করছি, ফুল তো মনে মনেও নিবেদন করা যায়! যদি গোপালকে বলেন, আজ তোমাকে অমুক গাছের সবচেয়ে সুন্দর ফুলটা নিবেদন করলাম, তা হলে কি উনি নেবেন না?”
“চা খেয়েছেন? আপনার মাথাটা আজ বেশ গরম দেখছি। আমি যাই। অনেক কাজ পড়ে আছে।”
তত ক্ষণে অনেক ক’টা ফুল সাজিতে তুলে ফেলেছেন। অতএব চটি ফটফটিয়ে রওনা দিলেন। অয়নেন্দ্র মনে মনে ভাবেন, তরফদার গিন্নি কি আদৌ তাঁর কথার কোনও মূল্য দেবেন!
বছর দশেক আগে, অবসরের পর শহর থেকে অনেকটা দূরে এই মফস্সলে সস্তায় বেশ খানিকটা জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন। কারণ ফ্ল্যাটবাড়ি তাঁর পছন্দ নয়। তার পর চার পাশটা ভরে দিয়েছিলেন রকমারি ফুলের গাছে। এমন ভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন, যেন সারা বছর কোনও না কোনও ফুল ফুটে তার বাড়িটাকে সাজিয়ে রাখে। এমনকি, বাড়ির বাইরেও রাস্তার ধারে ধারে রোপণ করেছিলেন স্বর্ণচাঁপা, বকুল, জারুল, হিমঝুরি, অমলতাস, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, ছাতিম, অশোকের মতো বড় বড় গাছ। আর এ বাড়ির ভিতরের পাঁচিলের ধার বরাবর কামিনী, গন্ধরাজ, ম্যাগনোলিয়া আর গেটের উপরে আর্চে মাধবীলতা, ও দিকটায় ঝুমকোলতা, লতানে জুঁই, অলকানন্দা ইত্যাদি। কোনওটা গন্ধে, কোনওটা বাহারে মন ভরিয়ে দেয়।
পুষ্প বলেছিল দু’-একটা ফলের গাছ লাগাতে। এখানকার মাটি সরেস। এ পাড়ায় অনেকের বাড়িতেই আম-কাঁঠাল-জাম-জামরুলের গাছ। অয়নেন্দ্র শোনেননি। ফলের গাছ মানেই তো আজ এ ঢিল ছুড়বে, রাতে ছিঁচকে চোর হানা দেবে। তার চেয়ে চোখের শান্তি, মনের আরাম এই ফুলগাছই ভাল। কিন্তু তা আর হল কোথায়! এতেও সকাল থেকে সন্ধে নানা উৎপাত।
কিছুটা দূরেই কলেজ। দুপুর থেকে সন্ধে, এ গলিতে কপোত-কপোতীদের হাঁটার যেন বিরাম নেই। কত কথা, মান-অভিমান, মন দেওয়া-নেওয়ার কত যে কবিতা, গান এই সরণিতে লেখা হয়, তার ইয়ত্তা নেই। অয়নেন্দ্রর হাতযশে এক দশকেই দু’পাশে ফুলের গাছে সাজানো এই গলিটার নাম হয়েছে লাভারস’ লেন। কখনও কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়ার লাল-হলুদ গালিচা তো কখনও ঝরা ছাতিম কিংবা বকুলের মিহি মসলিন হয়ে ওঠে বাড়ির সামনের এক ফালি পথ।
সেদিন বিকেলে তনিমা আর কবীর হাঁটছিল সেই পথে। কবীর সেকেন্ড ইয়ারের ইংলিশ অনার্স, আর তনিমা সদ্য ভর্তি হয়েছে কলেজে। ওর বিষয় ফিজ়িক্স। সম্প্রতি অ্যানুয়াল ডিবেটে কবীরের তীব্র যুক্তিজালে নিবদ্ধ ধারালো বক্তৃতায় মেধাবিনীর মন প্রেমসমুদ্রের পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ‘আর এক বার ঠেলিলেই পড়িব’ গোছের অবস্থা। সেই ঠেলা খেতেই আজ ওরা লাভারস’ লেনে।
“আচ্ছা কবীরদা, তুমি তো জিজ্ঞেস করলে না কেন তোমাকে এখানে ডেকে আনলাম!”
“সেটা তো আমার জানার কথা নয়। তুমি বলবে সেটা। তবে...”
“তবে কী?”
“না, কিছু না।”
“আহা, বলো না!”
কথা বলতে বলতে অয়নের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটছে ওরা দু’জন। আর, এ পাশে একতলার ঘরে ধ্যানী বকের মতো অয়ন বসে আছেন খাটে। পুষ্পর ভারী পছন্দ ছিল পাঁচিল-ঘেঁষা একতলার এই ঘরটা। দুপুরের পর অনেক ক্ষণ এই ঘরে বসে গল্পের বই পড়তেন পুষ্প। অনেক পরে বুঝেছেন অয়নেন্দ্র, তাঁর স্ত্রীরত্নটি আসলে এ ঘরে বসে বসে উৎকর্ণ হয়ে থাকতেন পাঁচিলের ও ধারে পৃথিবীর বিপুল প্রণয়তরঙ্গে অনুরণিত হতে। জারিত হতেন প্রেমসুধারসে।
পুষ্পর জীবনে প্রেম এসেছিল খুব অল্প বয়সে। তখনও স্কুলের গণ্ডি পেরোননি। দূর থেকে ভাল লাগত উদ্দীপ্তদাকে। ক্লাস ইলেভেনের উদ্দীপ্তদা চলনে বলনে চৌকস, দুর্দান্ত ফুটবলার। সে বার ওদের বাজিতপুর হাই স্কুলের সঙ্গে আদর্শগড় হাই স্কুলের ফুটবল ম্যাচের দিন কী যে কাণ্ড হল! এক গোলে জিতেছিল ওদের স্কুল। আর সেই গোলটা করেছিল উদ্দীপ্তদা। এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। মাঠ ঘিরে সেদিন ছাত্রছাত্রীর ভিড়। সেই ভিড়ে মিশেছিলেন পুষ্পও। কিন্তু উদ্দীপ্তদার নজর এড়ায়নি। খেলতে খেলতেই দু’-এক বার দৃষ্টিবিনিময়। মনের ভিতরটা ঝনঝন করে উঠেছিল পুষ্পর। বেড়ে গিয়েছিল হৃৎস্পন্দন। লজ্জায়, ভাল লাগায় আকুলিবিকুলি পুষ্প টের পেয়েছিলেন, তিনি ঘেমে উঠছেন। পাছে কেউ বুঝে ফেলে, তাই চোখ নামিয়ে নিয়েছিলেন।
কিন্তু এটা কী করল উদ্দীপ্তদা! গোলটা করেই তীব্রগতিতে ছুটে এসে নিলডাউনের ভঙ্গিতে বৃষ্টিভেজা হালকা পিচ্ছিল মাঠে স্লিপ খেয়ে এগিয়ে এসেছিল ওদের দিকে। আলিঙ্গনের আর্তিতে দু’হাত ছিল প্রসারিত। যেন গোলটা তাকেই উৎসর্গ করল। ভাগ্যিস ভিড় ছিল, তাই নির্দিষ্ট করে বোঝা যায়নি জনারণ্যের মাঝে নিভৃত নিবেদন কার উদ্দেশে। নইলে যে কী হত!
হয়েছিল। মনে তুমুল তোলপাড়। বাড়ি গিয়ে ধুম জ্বরে পড়েছিলেন। দু’দিন স্কুলে যেতে পারেননি।
কিন্তু জীবনটা তো গল্প নয়। যেমন ভাবা যায়, সে পথে এগোয় না। উদ্দীপ্তদার প্রতি তীব্র অনুরাগ বুকের মধ্যে নিয়েই বাজিতপুর ছাড়তে হয়েছিল পুষ্পকে। কারণ বাবার ছিল বদলির চাকরি। কিন্তু সেদিনের সেই উদ্দীপনাটুকু আজীবন বুকে আগলে বেড়িয়েছেন পুষ্প। বলেছিলেন শুধু ঠাকুমাকে। অয়নেন্দ্রর সঙ্গে বিয়ের দিনকয়েক আগে কষ্টের কথা জানাতে অশীতিপর সুরবালা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। ফোকলা দাঁতে ম্লান হেসে প্রিয় নাতনিটিকে বলেছিলেন, “এ তোর গোপন রত্ন রে দিদিভাই। কাউকে দেখাস না। নাতজামাইকেও না। এর কদর অন্যে বোঝে না।”
কথা রেখেছিলেন পুষ্প। অয়নেন্দ্রর সামনেও কোনও দিন সেই অনুরাগের যন্ত্রণা মেলে ধরেননি। সঙ্গে নিয়ে চলে গিয়েছেন পরপারে।
অয়নেন্দ্র অল্প বয়সেই জীবিকার সন্ধান পেয়েছিলেন। পাকা চাকরি, ভদ্রস্থ বেতন। বাবা-মা দেখেশুনে দ্রুত বিয়ে দিয়েছিলেন। একটি মেয়েকে ভাল লাগত বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে প্রবল ব্যক্তিত্বশালী বাবার দাপটে কুঁড়িতেই ঝরে গিয়েছিল সেই ভাল লাগা। সেই কুঁড়িকেই তো তিনি আজীবন সৃজন করে চলেছেন পরম মমতায়। তার গাছে গাছে যখন ফুল ফোটে, তখন মনে পড়ে অদিতির কথা। তার খোঁপাতেই সাজিয়ে তোলেন পুষ্পরাগ। সেই স্মৃতি থেকেই বাড়ির নাম রাখেন পুষ্প নিকেতন। আবার তাঁর স্ত্রীর নামই পুষ্প। ফলে এ বাড়ির নাম যখন পুষ্প নিকেতন রেখেছিলেন অয়নেন্দ্র, তখন সকলেই ভেবেছিল আহা, কী পত্নীপ্রেম! শুধু অয়ন জানেন সত্য-মিথ্যা!
তবু পুষ্প চলে যাওয়ার পর থেকে দিনগুলো বিস্বাদ। আজ ওর কথা মনে পড়ছে বার বার। সেটা কি লুকিয়ে পুষ্পর মতো কপোত-কপোতীর কথা শুনছেন বলে!
এক দিকে কবীর-তনিমা। অন্য দিকে অয়নেন্দ্র। মাঝে অনুচ্চ পাঁচিল। তবে শোনা সবটাই যাচ্ছে। এ দিকের ফুলগাছ পাঁচিল টপকে ও ধারে গন্ধ বিলোচ্ছে। শেষ বিকেলের নিবু-নিবু রোদ্দুরে সবে একটা-দুটো করে পাপড়ি মেলছে গন্ধরাজ।
“এই, একটা ফুল পেড়ে দেবে?”
“কেউ আছে বোধহয়!”
“তা আছে বইকি!” প্রায় স্বগতোক্তির ঢঙে কবীরের কথায় উত্তরটা দিলেন সত্তরোর্ধ্ব অয়ন। খানিকটা অন্যমনস্ক কবীর খেয়াল করল না, সেটা ভিতর থেকে এসেছে। সেও প্রত্যুত্তরে বলে, “তা হলে?”
“তা হলে আর কী, হবে না...” ফের অয়নের উত্তর।
সম্বিৎ ফেরে কবীরের। প্রবল অস্বস্তিতে তত ক্ষণে তনিমা কবীরের হাতখানা ধরে ফেলেছে শক্ত করে। তখনই তনিমার মনে হয়, কবীরদার হাতটা ভীষণ নরম। বাড়িতে কোনও কাজ করে না বোধ হয়। আর কবীর অনুভব করে, মেয়েদের তুলনায় তনিমার হাতটা যেন বড্ড বেশি কড়া। বাস্কেটবল খেলে বলেই হয়তো... যা-ই হোক, তনিমার চুলে ফুল গুঁজে দেওয়ার রোম্যান্টিকতা চটকে যায়। ওরা দ্রুত সেখান থেকে চলে যায়।
কিন্তু যুগলের দ্রুতপায়ে চলে যাওয়ার অস্ফুট শব্দও বুকের ভিতর হাতুড়ি পিটতে থাকে অয়নের। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না! দিয়েছেন বেশ একটা ধাক্কা। কাজও হয়েছে। তাও মনে মেঘ জমছে কেন!
তিনি তো গাছে গাছে ফুটে থাকা সম্পদকে আঁকড়ে ধরে থাকতেই চেয়েছিলেন। পেরেওছেন অনেকটাই। বিকেলে খেলার শেষে যে বাচ্চাগুলো আগে ফুল ছিঁড়ত আগে, তারা তো আসে না। কারণ তিনি তাদের ডেকে ডেকে বোঝাতেন, কেন ফুল ছিঁড়তে নেই। লালবাড়ির বাপান, ভটচাজদের গোগোল, বোসদের জিকো— সবাইকে এক দিন বুঝিয়েছিলেন, ওই ফুলগুলো মায়ের কোলে খেলা করা শিশুর মতোই। যদি কেউ ছিঁড়ে নিয়ে যায় তবে ওদের মা কষ্ট পাবে। ফুলদানিতে কি কেউ শিশুদের কাটা মুন্ডু সাজিয়ে রাখে! ফুলেরা তেমনই। এই ক’বছরে ছেলেপুলেগুলো অনেকটা বড় হয়েছে। শিখেছে, ফুল ছিঁড়তে নেই। অনেকে বাড়িতে ফুলের গাছ লাগানোও শিখেছে।
তবু আজ বিকেলের ঘটনাটা তাঁকে বড্ড আঘাত দিয়ে গেল। মনে হল, এই পৃথিবীর সুন্দরতম এক দৃশ্য রচনায় তিনি যেন মূর্তিমান স্বার্থপর দৈত্য। তরুণ-তরুণীকে তিনি চেনেন না। বাইরে বেরিয়ে দেখলেন, ওরা পথের বাঁকে মিলিয়ে গিয়েছে।
ধাক্কাটা পেড়ে ফেলল তাকে। ঠিক করলেন, কাল ভোরে তিনি নিজে ফুল তুলে তরফদার গিন্নিকে দিয়ে আসবেন। আর কোনও প্রেমিক-প্রেমিকাকে বাধা দেবেন না। ভাবতে ভাবতে মনটা তার ভারী প্রসন্ন হয়ে ওঠে। সযত্নলালিত জেদের গুহা থেকে বেরিয়ে তিনি যেন চলেছেন অন্য পৃথিবীর পথে। মনে হয়, পৃথিবীতে বেঁচে থাকাটা বড় সুন্দর।
পরদিন কাজের লোক এসে দাদুর সাড়া না পেয়ে পাড়ার লোক জড়ো করল। দরজা ভেঙে ঢুকে দেখা গেল, বারান্দার চেয়ারে চোখ বুজে আধশোয়া অয়নেন্দ্র। বুকে ধরা একগুচ্ছ ফুল। রেডিয়ো চলছে। তাতে সাগর সেন গেয়ে চলেছেন, ‘পুষ্পবনে পুষ্প নাহি, আছে অন্তরে/ পরানে বসন্ত এল কার অন্তরে...’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)