সোনা কিনতে চান। অথচ ভাবছেন গয়না কিনলে ন’মাসে-ছ’মাসে এক বার পরা ছাড়া বারই করা হবে না। উল্টে রাখা সমস্যা। আবার বন্ধুবান্ধব বলছেন, পাকা সোনা কিনে রেখে দিতে, যাতে পরে ভাঙিয়ে গয়না করা অথবা বেচে মুনাফা তোলা যায়। কিন্তু আপনার মাথায় ঘুরছে লকারের বন্দোবস্ত করার চিন্তা। তা হলে আপনার জন্য রয়েছে কাগুজে সোনা।

ইতিমধ্যেই সোনা কেনার এই পদ্ধতি সাধারণ মানুষের কাছে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কারণ, ধাতব সোনায় যে সুবিধা পাওয়া যায়, তার সবই মেলে কাগুজে সোনায়। পাশাপাশি মেলে সুরক্ষা, কিছু ক্ষেত্রে নিশ্চিত রিটার্নের মতো বাড়তি কিছুও।

সাধারণ লগ্নিকারীরা যাতে কম খরচে এবং নিরাপদে সোনায় লগ্নি করতে পারেন, সে জন্য গত কয়েক বছরে বাজারে এসেছে নানা প্রকল্প। যার মধ্যে গোল্ড বন্ড, গোল্ড ফান্ড, গোল্ড ইটিএফ তো আছেই। এ ছাড়াও গোল্ড মনিটাইজেশন স্কিমে বাড়িতে থাকা সোনা লগ্নি করে সুদ পাওয়ার সুবিধাও রয়েছে। চলুন দেখে নিই প্রকল্পগুলির খুঁটিনাটি। শুরু করব স্বর্ণ বন্ড দিয়ে।

 

গোল্ড বন্ড কী?

এতে বন্ড বা ঋণপত্র কেনার মাধ্যমে ঘরে আসবে কাগুজে সোনা। ধরা যাক লগ্নির জন্য ২০ গ্রাম সোনা কিনতে চান। এ ক্ষেত্রে ওই ওজনের দাম দিয়েই বন্ড কেনা যাবে। তবে এই প্রকল্প শুধু ভারতীয় নাগরিক ও সংস্থার জন্য।

সুবিধা

• বাড়িতে সোনা রাখার ঝুঁকি বা লকারে রাখার ঝামেলা নেই।

• লাগবে না লকার ভাড়াও।

• সুরক্ষা বেশি। গয়না বা পাকা সোনা চুরির ভয় নেই।

• নথিভুক্তির পরে বন্ড লেনদেন করা যাবে শেয়ার বাজারেও।

• বন্ড ভাঙানোর সময়ে সুদ তো পাওয়া যাবেই। তখন সোনার দাম বাড়লে বাড়তি মুনাফাও হবে।

গোড়ার কথা

• বন্ড কেনাবেচায় ইন্ডিয়ান বুলিয়ন জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের ঘোষণা করা দাম গ্রাহ্য হবে।

• যাঁরা ইস্যু চলাকালীন আবেদন করেছেন, তাঁরাই সেই দাম দেবেন। বাকিদের বাজারের দর মেনেই বন্ড কেনাবেচা করতে হবে।

• ন্যূনতম ১ গ্রাম সোনা কিনতে হবে। অর্থবর্ষে সর্বোচ্চ সীমা ৪ কেজি। ব্যক্তি ও অবিভক্ত হিন্দু পরিবারের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে।

• একাধিক নামেও কেনা যাবে। তখন লগ্নি ধরা হবে প্রথম আবেদনকারীর নামে।

• ব্যাঙ্কের কাছে বন্ড বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া যাবে।

কী ভাবে কিনব?

• ব্যাঙ্ক ও ডাকঘরে বন্ড বিক্রি হয়। এ ছাড়াও স্টক হোল্ডিং কর্পোরেশন, ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ-সহ বড় এক্সচেঞ্জগুলির মাধ্যমেও তা কেনা যায়।

• এ জন্য জিরো ব্যালেন্স অ্যাকাউন্ট খুলতে কেওয়াইসি দিতে হবে। ঠিকানা ও পরিচয়ের প্রমাণপত্র হিসেবে লাগবে আধার, প্যান, পাসপোর্টের ইত্যাদির প্রতিলিপি।

• লগ্নি করা যাবে জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে। নাবালকের নামে টাকা ঢালতে পারবেন অভিভাবকও।

• প্রকল্পের ফর্ম ভরে ব্যাঙ্ক বা ডাকঘরে জমা দিতে হবে।

• চাইলে ইন্টারনেটে আর্জি জানানো যায়। অথবা ফোন, ই-মেল মারফত বা মিউচুয়াল ফান্ড, শেয়ার ব্রোকারের সাহায্যে এতে আবেদন করতে হবে।

• যাঁরা গোল্ড বন্ডে লগ্নি করতে চান, কিন্তু শেয়ার কেনা-বেচা করেন না, তাঁরা ব্রোকার সংস্থার মাধ্যমে টাকা ঢালতে পারবেন।

• ওই অ্যাকাউন্টে টাকাও বন্ডের জন্য জমা দিতে হবে।

• বন্ডের জন্য হোল্ডিং সার্টিফিকেট মঞ্জুর হবে।

• বাজারে বন্ড লেনদেন করতে চাইলে, ডি-ম্যাট অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তা নিতে হবে। সে কথা প্রথমেই জানাতে হবে বা সার্টিফিকেট পাওয়ার পরেও তা ডি-ম্যাট করা যেতে পারে। এ জন্য ডিপজিটরি পার্টিসিপেন্টের কাছে ডি-ম্যাট অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে।

মেয়াদ

• এমনিতে আট বছর। তবে ৫ বছর পর থেকেই তা ভাঙানো যাবে।

• চাইলে তার আগে সেটি বিক্রি করা যায়। সে ক্ষেত্রে বন্ডের ক্রেতাই হবেন তার নতুন মালিক।

সুদ

• বছরে ২.৫০% সুদ মেলে।

• এই বন্ড এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয়। তাই ভাঙানোর সময়ে দাম বাড়লে বাড়তি লাভ।

করছাড়

• সুদ করযোগ্য।

• ব্যক্তির ক্ষেত্রে মেয়াদ শেষে পাওয়া মুনাফায় মূলধনী লাভকর নেই।

• মেয়াদের আগে বন্ড বেচে লাভ হলে অবশ্য কর দিতে হবে। ৩ বছরের আগে বিক্রি করলে স্বল্পমেয়াদি মূলধনী লাভকর আর পরে হলে দীর্ঘমেয়াদি মুলধনী লাভকর লাগবে।

• অন্য সূত্র থেকে আয় নেই, অথচ গোল্ড বন্ড থেকে মুনাফা আয়কর ছাড়ের সীমার চেয়ে বেশি হলে কর দিতে হবে।

 

গোল্ড ইটিএফ

• পুরো নাম গোল্ড এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ)।

• এই ফান্ডে লগ্নি করা টাকা সরাসরি সোনায় খাটানো হয়।

• গোল্ড ইটিএফের তহবিল দিয়ে সংশ্লিষ্ট ফান্ড সোনা কেনে।

• সোনার দামের ওঠাপড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইউনিটের বাড়ে-কমে।

• প্রথম বার ফান্ড সংস্থার থেকে, পরে শেয়ার বাজারে কেনাবেচা করতে হয়। তাই এতে ডি-ম্যাট অ্যাকাউন্ট লাগে।

• যত টাকা দেবেন এবং তা দিয়ে যতটা সোনা কেনা হবে, তার ভিত্তিতেই ইটিএফের ইউনিট পাবেন। সাধারণত প্রতিটি ইউনিট ১ গ্রাম সোনার হয়। তবে তা বদলাতে পারে।

 

গোল্ড ফান্ড

যে সব মিউচুয়াল ফান্ড মূলত সোনায় টাকা ঢালে, তারা গোল্ড ফান্ড নামে পরিচিত। সুবিধা হল—

• মাসে ৫০০ টাকাও ঢালা যায়। অর্থাৎ, পাকা বা গয়না সোনার মতো এক লপ্তে বড় অঙ্ক ঢালতে হয় না।

• পাকা বা গয়না সোনা বেচা ঝক্কির। ফান্ড সহজেই কেনাবেচা যায়।

• নির্দিষ্ট সময়ের আগে বিক্রি করলে বাড়তি চার্জ লাগতে পারে। তবে সাধারণত তার পরে বেচলে লাগে না।

• নির্দিষ্ট সময়ের পর বিক্রি করলে মূলধনী লাভকরে সুবিধা মেলে। 

 

খেয়াল রাখুন

গোল্ড ইটিএফ ও গোল্ড ফান্ড কিন্তু এক নয়। বিভিন্ন ফান্ড সংস্থা বাজারে গোল্ড ফান্ড ছাড়ে। সেগুলির তহবিল সোনা ও তার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে লগ্নি করা হয়। এরই মধ্যে যারা সরাসরি সোনায় টাকা খাটায় এবং যার ইউনিট স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন হয়, তারাই হল গোল্ড ইটিএফ।

 

গোল্ড মনিটাইজেশন

ঘরে বা লকারে পড়ে থাকা সোনা ব্যাঙ্কে রেখে নিখরচায় সুদ খাতে সোনা আয় করার প্রকল্প। এতে— 

• ওই সোনা কোনও ব্যাঙ্কে জমা রেখে সুদ মিলবে।

• সেই সুদ দেওয়া হবে সোনায়। 

• সুদ স্থির হবে মেয়াদের ভিত্তিতে।

• জমা দেওয়া সোনা ওই আকারেই ফেরত মিলবে না। কারণ, সেটি গলিয়ে সম্পূর্ণ ভাবে খাঁটি সোনা (২৪ ক্যারাট বা ৯৯৫ ফাইননেস) বার করে নেওয়া হবে।

• সেই খাঁটি সোনার ওজনের ভিত্তিতেই হিসেব হবে জমা সোনার পরিমাণ, যার উপর নির্ধারিত হারে সোনা সুদ পাওয়া যাবে।

• স্বল্প মেয়াদের ক্ষেত্রে সুদ-সহ সোনা বা চাইলে তার দামের সমমূল্যের টাকা মিলবে। কোনটা নেবেন, অ্যাকাউন্ট খোলার সময়েই তা জানাতে হবে।

• মাঝারি ও দীর্ঘ মেয়াদে শুধু টাকাই মিলবে।

• এই প্রকল্পের সার্টিফিকেট বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়া যাবে।

কাদের জন্য

• ভারতীয় ব্যক্তি, অবিভক্ত হিন্দু পরিবার, ট্রাস্ট ও সেবি নথিভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ড ও এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ইটিএফ)।

• রাখা যাবে জয়েন্ট অ্যাকাউন্টেও। ব্যাঙ্কে জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার সময়ে যে-পদ্ধতি মানা হয়, এখানে তা-ই মেনে চলা হয়।

• রয়েছে নমিনির সুবিধাও।

জমা কতটা

• কমপক্ষে ৩০ গ্রাম পাকা (২৪ ক্যারাট) সোনা জমা রাখতে হবে। ঊর্ধ্বসীমা নেই।

কী ভাবে রাখব

• এ জন্য প্রথমে ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। দিতে হবে নো ইয়োর কাস্টমার (কেওয়াইসি) নথি।

• ব্যাঙ্কই বলে দেবে খাঁটি সোনার হিসাব করতে কোন হলমার্ক কেন্দ্রে যেতে হবে।

• এর খরচ দেবে ব্যাঙ্ক। তবে হলমার্ক কেন্দ্র থেকে সোনা জমা না-দিয়ে চলে এলে, ফি দিতে হবে।

• কেন্দ্রে প্রাথমিক পরীক্ষায় জানতে পারবেন তাতে কত ক্যারাটের সোনা রয়েছে।

• অনুমতি দিলে গয়না থেকে মিনা, গালা, ময়লা ইত্যাদি বাদ দেওয়া হবে। ফের তা ওজন করে তার পরে গলানো হবে।

• গলানো সোনা থেকে টুকরো নিয়ে চূড়ান্ত পরীক্ষা করা হবে। দেখা হবে খাঁটি সোনা কতটা।

• সায় দিলে হলমার্ক কেন্দ্র ওই সোনা জমা নেবে। বদলে সার্টিফিকেট দেবে।

• ওই সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে ব্যাঙ্ক সোনা জমার চূড়ান্ত সার্টিফিকেট  মঞ্জুর করবে।

• কেন্দ্র সোনা জমা নিয়ে নিলে পরে আর কোনও কিছু নিয়ে (ওজন ও ক্যারাট) কেউই আপত্তি তুলতে পারবেন না।

• হলমার্ক কেন্দ্রই সোনার যাবতীয় তথ্য ব্যাঙ্কের কাছে পাঠাবে। 

মেয়াদ

• স্বল্প: ১ থেকে ৩ বছর।

• মাঝারি: ৫ থেকে ৭ বছর।

• দীর্ঘ: ১২ থেকে ১৫ বছর।

সুদের হার

• ১ থেকে ৩ বছর: সুদ স্থির করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক।

• ৫ থেকে ৭ বছর: ২.২৫%।

• ১২ থেকে ১৫ বছর: ২.৫০%।

আগে ভাঙালে

• সোনা জমা দেওয়ার পরে কমপক্ষে এক বছর রাখতেই হবে।

• এক বছর পরে অথচ মেয়াদ শেষের আগে তা ভাঙালে দিতে হবে জরিমানা। সেই অঙ্ক ব্যাঙ্ক স্থির করবে।

সুদ শুরু কবে থেকে?

• সোনা কতটা খাঁটি, তা যাচাইয়ের পরে ব্যাঙ্কে জমা পড়বে। ব্যাঙ্ক বদলে সার্টিফিকেট দেবে। ওই সার্টিফিকেট পাওয়া বা হলমার্ক কেন্দ্রে সোনা দিয়ে আসার ৩০ দিন (যে-সময়টা কম) পর থেকেই সুদ মিলবে। 

করছাড়

• এতে টাকা রেখে লাভ হলে মূলধনী লাভকর ও আয়করে ছাড় রয়েছে।

 

লেখক: ব্যাঙ্কবাজার ডট কমের সিইও

(মতামত ব্যক্তিগত)