টাকা তোলার জন্য ব্যাঙ্কে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়ানোর অবসান ঘটিয়ে ব্যাঙ্কিং দুনিয়ায় বিপ্লব এনে দিয়েছিল ডেবিট কার্ড (সাধারণের কাছে যা এটিএম কার্ড নামেই বেশি পরিচিত)। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর নোট বাতিলের পর থেকে রকেট গতিতে বেড়েছে পেমেন্টস অ্যাপ। কিন্তু তার পরেও নগদ টাকা তোলার ক্ষেত্রে ডেবিট কার্ড অব্যর্থ এবং বিকল্প কিছু তৈরি হয়নি। কিন্তু এ বার সেই ডেবিট কার্ডই বাতিল করতে চলেছে স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই)। ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান রজনীশ কুমারের এই সিদ্ধান্তের ঘোষণার পরই দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। যদিও রজনীশ কুমারের দাবি, ডিজিটাল লেনদেন আরও বাড়াতেই এই সিদ্ধান্ত।

ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কিং অ্যাসোসিয়েশন (আইবিএ) এবং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছরই ব্যাঙ্কিং কনক্লেভ ‘ফাইব্যাক’-এর আয়োজন করা হয়। সোমবার মুম্বইয়ে এ বছরের সেই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন রজনীশ কুমার। সেখানেই এসবিআই চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘... আমরা ডেবিট কার্ড তুলে দিতে চাই। এবং আমরা নিশ্চিত যে সেটা তুলে দিতে পারব।’’ তাঁর আরও বক্তব্য, আগামী পাঁচ বছরে পকেটে ডেবিট কার্ড রাখার প্রয়োজনই পড়বে না। অর্থাৎ নোট বাতিলের মতো এক লহমায় যে বিষয়টি কার্যকর হবে না, বরং ধীরে ধীরে এই পথে এগনো হবে, রজনীশ কুমারের কথাতেই তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

তবু এই ঘোষণার পরই কার্যত তোলপাড় শুরু হয়েছে ব্যাঙ্কিং মহল এবং গ্রাহকদের মধ্যে। বর্তমানে এসবিআই-এর এটিএম কার্ডধারী অ্যাকাউন্টের সংখ্যা প্রায় ৯০ কোটি। ক্রেডিট কার্ড রয়েছে প্রায় তিন কোটি গ্রাহকের। কী ভাবে নগদ টাকা পাওয়া যাবে, তাই নিয়েই বিরাট দুশ্চিন্তায় পড়েছেন গ্রাহকরা। বর্তমানে যে এটিএম কাউন্টার রয়েছে, সেগুলির কী হবে? আবার কি ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকা তোলার লাইনে দাঁড়াতে হবে? এমন হাজারও প্রশ্ন ভিড় করছে বিরাট অংশের গ্রাহকের মধ্যে। অন্য বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলিও নজর রাখছে এসবিআই-এর এই সিদ্ধান্ত এবং তার প্রতিক্রিয়ার উপর।

কিন্তু কার্ড বাতিল হলে বিকল্প কী ব্যবস্থা করবে এসবিআই? কী  ভাবে মিলবে নগদ টাকা? চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, ‘ইওনো’ প্রযুক্তি ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া হবে— ইতিমধ্যেই যা চালু রয়েছে। ইওনো প্রযুক্তি তাহলে কী? এটি আসলে কার্ডলেস লেনদেনের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। যার মাধ্যমে এক দিকে যেমন কেনাকাটা থেকে শুরু করে যে কোনও পেমেন্ট বা মানি ট্রান্সফার করা যায়, তেমনই নগদ টাকাও তোলা যায়।

আরও পড়ুন: সাড়ে তিনশো কোটির ব্যাঙ্ক ঋণ দুর্নীতির অভিযোগ, গ্রেফতার কমল নাথের ভাইপো

এই অ্যাপের মাধ্যমে টাকা তুলতে হলে যেতে হবে ইওনো পয়েন্টে। অ্যাপের মাধ্যমেই পর পর কয়েকটি ধাপে নির্দেশিকা পাঠাতে হয়। শেষ ধাপে গিয়ে টাকা তোলার জন্য ইওনো পয়েন্ট সিলেক্ট করতে হয়। সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে টাকা। বর্তমানে সারা দেশে ৬৮ হাজার ইওনো পয়েন্ট রয়েছে এসবিআই-এর। আগামী ১৮ মাসেই সেই সংখ্যা ১০ লক্ষে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে ব্যাঙ্ক, জানিয়েছেন রজনীশ কুমার। তিনি বলেন, ব্যাপক হারে ইওনো পয়েন্ট বাড়িয়ে ডেবিট কার্ডের বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাবে এসবিআই। একই সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডের চাহিদাও কমবে, কারণ ইওনো-তেই থাকবে ক্রেডিট কার্ডের মতো সুবিধা। কেনাকাটা করা যাবে ধারে।

চেয়ারম্যান যত সহজ হিসেবে দেখছেন, বিষয়টি অবশ্য ততটা  ‘জলবৎ তরলং’ নয় বলেই মনে করছেন ব্যাঙ্কিং বিশেষজ্ঞরা। কারণ, নিম্নবিত্ত, দারিদ্রসীমার নীচে থাকা গ্রাহকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এই এসবিআই-এরই রয়েছে। এবং সেই সংখ্যাটাও বিপুল। একটা বড় অংশের গ্রাহক এখনও এটিএম ব্যবহারই করতে পারেন না। তাঁদের কাছে ‘ইওনো’ও প্রায় না বোঝার মতোই। এই শ্রেণির গ্রাহককে কী ভাবে ইওনোর সুবিধা দেওয়া যাবে তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই।

আরও পড়ুন: ২৯ দিনের পথ পেরিয়ে চাঁদের কক্ষপথে ঢুকে পড়ল চন্দ্রযান-২

ডেবিট কার্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, শুধু নিজস্ব ব্যাঙ্ক নয়, যে কোনও ব্যাঙ্কের এটিএম থেকেই টাকা তোলা যায়। ফলে টাকা তোলার জন্য হাতের কাছে সব সময় কোনও না কোনও এটিএম পাওয়া যায়। কিন্তু ইওনোর ক্ষেত্রে ইওনো পয়েন্ট ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। অর্থাৎ নগদ টাকা তোলার জন্য এসবিআই-এর উপর এবং আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ইওনো পয়েন্টের উপর নির্ভর করা ছাড়া কোনও বিকল্প থাকবে না। সেই বিপুল চাপ কী ভাবে সামলাবে এসবিআই তা, নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাঙ্কিং বিশারদদের একটা বড় অংশ। সেক্ষেত্রে ইওনো পয়েন্টগুলিতে বিরাট বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ইওনো ব্যবহারের জন্য মোবাইলে ইন্টারনেট অপরিহার্য। অন্যান্য যে কোনও অ্যাপের মতোই ইন্টারনেট ছাড়া এই ব্যবহার সম্ভবই নয়। পরিষেবা থাকলেও গ্রামাঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও স্মার্ট ফোন-ইন্টারনেটের ব্যবহারে সড়গড় নন। তাঁদের ক্ষেত্রেও বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে এসবিআই কর্তৃপক্ষকে।