শুরুতে হোঁচট যতটা ছিল, পরে ক্রমশ তা কমেছে ধীরে ধীরে। কিন্তু তবু বর্ষপূর্তিতে ক্ষোভের হাত থেকে পুরোপুরি ছুটি পায়নি জিএসটি। শিল্পমহলের (বিশেষত ছোট শিল্পের) দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই কাঁচামাল কেনার সময়ে আগে মেটানো করের টাকা ফেরত পেতে (ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট) দফারফা হচ্ছে তাঁদের। টান পড়ছে পুঁজিতে। কর বিশেষজ্ঞরা অনেকে বলছেন, ‘এক দেশ-এক কর’ তো দূর অস্ত্‌, পুরো ব্যবস্থাকে অনলাইনের আওতাতেই আনা গেল না এখনও।

প্রায় দেড় যুগের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গত বছর ৩০ জুন মধ্যরাতে যাত্রা শুরু করেছিল জিএসটি। সাক্ষী ছিল সংসদের ঐতিহাসিক সেন্ট্রাল হল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দাবি ছিল, স্বাধীন ভারতে পরোক্ষ করে এত বড় সংস্কার কখনও হয়নি। ওই দিন বক্তৃতায় সর্দার বল্লভভাই পটেলের ভারত-জোড়ার প্রসঙ্গও টানেন তিনি। দাবি করেছিলেন, জিএসটিতে কপাল ফিরবে গরিবদের। ধাক্কা খাবে কালো টাকা। বছর পেরিয়ে বিরোধীদের প্রশ্ন, সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হল কোথায়? আর বিশেষজ্ঞদের জিজ্ঞাসা, এক করের বাঁধনে কোথায় সব পণ্য-পরিষেবাকে জুড়ল জিএসটি?

বিশেষজ্ঞ নারায়ণ জৈন বলছেন, ‘‘থাকার কথা একটি মাত্র কর। কিন্তু তা হয়নি। আওতায় আসেনি পেট্রল, ডিজেলই।’’ ক্যালকাটা চেম্বার অব ট্রেডের চেয়ারম্যান এমেরিটাস ফিরোজ আলি ও ফেডারেশন অব ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মহেশ সিঙ্ঘানিয়া বলেন, ‘‘জিএসটির সব কাজ অনলাইনে হওয়ার কথা।

সুবিধা যেখানে

• ২৭টি পরোক্ষ কর এবং ২৬টি সেসের বদলে একটিই কর: জিএসটি। বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন কর সংক্রান্ত আইন মানার ঝক্কি তাই তুলনায় কম।

• প্রতি রাজ্যে আলাদা রিটার্নের ফর্ম ভর্তির ঝক্কি নেই। তা জমাও দেওয়া যায় একই দফতর থেকে।

• চেক পোস্ট ব্যবস্থা উঠে যাওয়ায় পণ্য পরিবহণে গতি।

• গুনতে হচ্ছে না প্রবেশ করও।

• করের উপর কর না-চাপায় দাম কমেছে কিছু পণ্যের।

• কাঁচামাল কেনার ক্ষেত্রে আগে মেটানো কর ফেরত পাওয়ার (ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট) সুযোগ।

 

কিন্তু হোঁচট

• ‘এক দেশ-এক কর’ এখনও বহু দূর। একেই জিএসটির অনেকগুলি হার। সঙ্গে রয়েছে সেসও।

• বেশ কিছু পণ্য, পরিষেবা এখনও এর আওতার বাইরে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পেট্রল, ডিজেল। গণ্ডির বাইরে বিমান জ্বালানিও।

• পুরো ব্যবস্থা হওয়ার কথা মসৃণ। সব কাজ সারা যাওয়ার কথা অনলাইনেই। কিন্তু ই-ওয়ে বিলে তা হয়নি। ক্রেতা ও বিক্রেতার তথ্য (ইনভয়েস) মেলানোর বিষয়েও তা না হওয়ায়, এখনও চালু জিএসটিআর-৩বি ফর্ম।

• জিএসটি কর্তৃপক্ষের নির্দেশের বিরুদ্ধে আবেদন অনলাইনে করতে পারছেন না ডিলাররা। রিফান্ড পেতে রফতানিকারীরা নেটে হেঁটে আবেদন করতে পারছেন ঠিকই। কিন্তু বাকি প্রক্রিয়া আর সারা যাচ্ছে না সেখানে।

• কাঁচামাল কেনার ক্ষেত্রে আগে মেটানো কর ফেরত পেতে দেরি হচ্ছে ঢের। ছোট শিল্প ও রফতানিকারীদের অভিযোগ, এর দরুন টান পড়ছে তাদের পুঁজিতে।

• ২০ লক্ষ টাকার কম ব্যবসা করা সংস্থার জিএসটিতে নথিভুক্তি বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু তেমনই তাদের কাছে কেনা কাঁচামালে ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিটের সুবিধা মেলে না। তাই অনেক ক্ষেত্রে বরাতে টান ওই সংস্থাগুলির।

• জিএসটির অন্যতম উদ্দেশ্য কর ব্যবস্থার সরলিকরণ। কিন্তু অনেকেরই প্রশ্ন, এখনও তা ঠিকঠাক হল কোথায়?

• অভিযোগ উঠছে বিপুল কর ফাঁকির। দুর্বল পরিকাঠামোর সুযোগ নিয়ে রীতিমতো বিক্রি হচ্ছে ভুয়ো ইনভয়েস! তাই গরমিল রিটার্নেও। খোদ জিএসটি ইন্টেলিজেন্সের ডিজি-র মতেই, স্রেফ দু’মাসে কর ফাঁকির অঙ্ক অন্তত ২,০০০ কোটি টাকা। এবং তা নাকি হিমশৈলের চূড়া মাত্র!

কিন্তু হচ্ছে কোথায়?’’ যেমন, রিফান্ড পেতে শুধু আবেদনই  নেটে জমা দেওয়া যাচ্ছে। বাকি প্রক্রিয়ায় ইনভয়েস নিয়ে দৌড়তে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রবি সেহগল বলেন, ‘‘রিফান্ড আটকে থাকায় টান পড়ছে কার্যকরী মূলধনে।’’ মার্চেন্ট চেম্বারের কর্তা সঞ্জীব কোঠারি ও ছোট শিল্পের সংগঠন ফ্যাক্সির প্রেসিডেন্ট হিতাংশু গুহর দাবি, জিএসটিতে ছোট শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। রিফান্ড আটকে থাকার অভিযোগ তাঁদের গলাতেও।

মোদীর আশ্বাস ছিল,  জিএসটি হবে ‘গুড অ্যান্ড সিম্পল ট্যাক্স’। রাহুল গাঁধী কটাক্ষ করে তাকে তকমা দেন ‘গব্বর সিংহ ট্যাক্স’-এর। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, হয়তো অতটা নয়, কিন্তু পুরো ‘গুড অ্যান্ড সিম্পল’ হতে আরও পথ পাড়ি দিতে হবে জিএসটিকে।