বারো বছরে ভারতে এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) বাজার বেড়েছে প্রায় ১২ গুণ। কিন্তু এখনও তা সে ভাবে জনপ্রিয় হয়নি সাধারণ ছোট লগ্নিকারীদের কাছে। তাই আগামী দিনেও ওই বাজার বাড়ানোর জন্য মূলত বিভিন্ন আর্থিক সংস্থার বিনিয়োগের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে এই শিল্প। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের আশা, খুচরো লগ্নিকারীদের মধ্যে সাড়া না-ফেলার ছবি এ বার শেষমেশ বদলাতে শুরু করতে পারে ইটিএফে কর্মী প্রভিডেন্ট ফান্ডের (ইপিএফও) লগ্নির দৌলতে।
ইটিএফ সম্পর্কে অধিকাংশ ছোট লগ্নিকারীর ধারণা এখনও তেমন স্বচ্ছ নয়। তার উপর কমিশন না-থাকায় তা বেচতে তেমন আগ্রহ দেখান না ব্রোকাররা। প্রায়শই তা বাদ পড়ে বিনিয়োগ উপদেষ্টাদের বাতলানো দাওয়াই থেকে। কিন্তু সেবি চেয়ারম্যান ইউ কে সিন্হার দাবি, ইটিএফের এখনও কিছুটা দুয়োরানি হয়ে থাকার এই ছবি এ বার বদলাতে পারে তিনটি ঘটনার হাত ধরে:—
(১) শেয়ার বাজারে এই প্রথম কর্মী প্রভিডেন্ট ফান্ডের (ইপিএফও) পা রাখা।
(২) একগুচ্ছ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণ।
(৩) ইটিএফের হাত ধরে বিমা সংস্থাগুলির শেয়ারে লগ্নির প্রতিশ্রুতি।
মূলত এই তিনের দৌলতেই আগামী দিনে ইটিএফের ছবি বদলাবে বলে সিন্হার আশা। মুম্বইয়ে সম্প্রতি ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (এনএসই) আয়োজিত এক আলোচনায় সিন্হা বলেন, গত ১২ বছরে ইটিএফের বাজার বেড়েছে প্রায় ১২ গুণ। কিন্তু এ বার তার আসল দৌড় শুরু হওয়ার পালা। কারণ, ইপিএফও প্রথম বার বাজারে পা রাখছে ইটিএফেরই মাধ্যমে। ফলে আগামী দিনে শুধু যে ওই তহবিল থেকে বিপুল অঙ্ক ইটিএফ মারফত বাজারে আসবে তা-ই নয়, বদলে যেতে পারে তার সম্পর্কে আমজনতার মনোভাবও। ইটিএফের পথ ঘুরে কষ্টের সঞ্চয় বাজারে ঢালতে আগ্রহী হতে পারেন অনেক বেশি মানুষ। লগ্নিতে আগ্রহী হতে পারে দেশের অন্য পেনশন ফান্ডগুলি।
তা ছাড়া, এখন অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বেচতেই ইটিএফের হাত ধরছে কেন্দ্র। ২০১৪ সালে এই রাস্তায় হেঁটে শেয়ারে লগ্নির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিমা নিয়ন্ত্রক আইআরডিএ-ও। সেই সঙ্গে রয়েছে খুশি মতো ভাঙিয়ে নেওয়ার এবং কর সংক্রান্ত সুবিধা। এই সব কারণেও ইটিএফের রমরমা বাড়বে বলে মনে করছেন এনএসই-র এমডি এবং সিইও চিত্রা রামকৃষ্ণ।
একই মতের শরিক রিলায়্যান্স ক্যাপিটাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রেসিডেন্ট ও সিইও সন্দীপ সিক্কা, কোটাক মহীন্দ্রা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের এমডি নীলেশ শাহও। সিক্কার যুক্তি, ‘‘১০-১২ বছর আগে শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ডে টাকা ঢালতেন ক’জন? অথচ এখন সেখানে লগ্নি করেন বহু মধ্যবিত্ত। বছর কয়েকের মধ্যে একই ভাবে জনপ্রিয় হবে ইটিএফে বিনিয়োগও।’’
এ দেশে এখন ইটিএফে টাকা ঢালে মূলত বিভিন্ন আর্থিক সংস্থা। ছোট, খুচরো লগ্নিকারীদের মধ্যে তা নিয়ে সাড়া এখনও বেশ কম। কিন্তু সিন্হার বিশ্বাস, আরও বেশি করে সরল-সোজা ইটিএফ বাজারে এলে, প্রয়োজন মতো তা দ্রুত ভাঙানো গেলে এবং নিয়ন্ত্রকের কড়া নজর তার উপর থাকলে, টাকা ঢালার আগ্রহ বাড়বে। এমনকী এ জন্য সংশ্লিষ্ট মহল সেবির কাছে কী কী বিষয়ে স্বচ্ছতা চায়, তা-ও জানতে চেয়েছেন তিনি।
ইটিএফজিআইয়ের ম্যানেজিং পার্টনার এবং আন্তর্জাতিক ইটিএফ বিশেষজ্ঞ ডেবোরা ফারের মতে, ‘‘আগামী দিনে লগ্নির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অনেক বেশি করে প্রযুক্তির উপর নির্ভর করবেন মানুষ। এখন মোবাইলে রাস্তা বা রেস্তোরাঁ খোঁজার চল হয়েছে। এর পর সে ভাবেই ফোনের কাছে বিনিয়োগের সেরা রাস্তাও জানতে চাইবেন অনেকে।’’ এখানে ইঙ্গিত স্পষ্ট, ব্রোকার বা বিনিয়োগ উপদেষ্টার ইটিএফের নাম না-করার অসুবিধা তখন হয়তো আর অতটা পোহাতে হবে না।
আবার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কের এমডি এবং এ দেশে তাদের ওয়েল্থ ম্যানেজমেন্ট ব্যবসার প্রধান বিশাল কপূরের মতে, ইটিএফের সাফল্য নির্ভর করবে তার সঠিক বিপণন আর লগ্নি উপদেষ্টাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার উপরে। তাঁর মতে, ছোট লগ্নিকারীদের কাছে ইটিএফের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিরও এটিই চাবিকাঠি।