ছোট বাজেটের সিনেমার পেটেই এখন ব্যবসার বড় সম্ভাবনা খুঁজে পাচ্ছে বাজার। ঝুঁকি তুলনায় কম। অথচ ফেলনা নয় মুনাফার হার। ফলে ভিড় বাড়ছে কর্পোরেট লগ্নির। ব্যবসার কৌশল হিসেবে স্বল্প দৈর্ঘ্যের সিনেমা (শর্ট ফিল্ম) তৈরিতেও পিছপা হচ্ছে না তারা। মার্কিন মুলুক-সহ পশ্চিমী দুনিয়ায় পুরোদস্তুর বইতে শুরু করা এই ঢেউ এ বার আছড়ে পড়ছে ভারতের বিনোদন বাজারে।
৩৬টি দেশে ব্যবসা করা উপদেষ্টা সংস্থা অরেঞ্জ কর্প যেমন জানাচ্ছে, চার বছরে ভারতে ১১০ কোটি টাকা ফিল্ম ব্যবসায় ঢালবে তারা। উত্তর আমেরিকা, লাতিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সংস্থার দায়িত্বে থাকা দেবাশিস দত্ত জানান, শর্ট ফিল্মের জন্য তাঁদের বাজেট ৮ থেকে ১০ লক্ষ টাকা। বড় ছবির জন্য ১৫-২০ কোটি। তাঁর দাবি, চলচ্চিত্র শিল্পের খুঁটিনাটি বিচার করে এবং সম্ভাব্য মুনাফার হিসেব কষেই এই নতুন ব্যবসায় ঝাঁপাচ্ছেন তাঁরা। অরেঞ্জের লগ্নি লাভের মুখ দেখলে, আরও অনেক সংস্থাই এই কাজে এগিয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।
দুনিয়া জুড়ে বিভিন্ন শিল্পে পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করে অরেঞ্জ কর্প। বিএমডব্লিউ থেকে মার্সিডিজ— বহু সেরা ব্র্যান্ডের গাড়ির সুরক্ষা প্রযুক্তির চাবি তাদের হাতে। অথচ এই সংস্থাই কি না এ দেশে টাকা ঢালছে সিনেমা তৈরিতে! যার মধ্যে আছে শর্ট ফিল্মও।
দেবাশিসবাবুর যুক্তি, নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে ছবি তৈরি করতে পারলে ক্ষতির আশঙ্কা কম। তা ছাড়া, এখন লগ্নির টাকা উসুল করতে শুধু দেশে সিনেমা হলে টিকিট বিক্রির ভরসায় বসে থাকতে হয় না। ধরা যায় আন্তর্জাতিক বাজারও। সেই সঙ্গে রয়েছে ডিভিডি স্বত্ব, স্যাটেলাইট স্বত্ব, বিমান পরিবহণ সংস্থায় এয়ারটাইম বিক্রির মতো ক্ষেত্র থেকে অন্তত ৩০ কোটি টাকা আয়ের সুযোগ। ফলে ছবি তৈরির খরচ তুলে ফেলা তেমন শক্ত হবে না বলে আশাবাদী তাঁরা।
হিন্দি কিংবা আঞ্চলিক ভাষা— লাভজনক সিনেমা করতে হলেই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালতে হবে, এই ধারণা বদলাচ্ছে দ্রুত। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই চটজলদি লাভের মুখও দেখছে কম বাজেটের সিনেমা। যেমন, হালফিলের ওপেনটি বায়োস্কোপ। কোটি টাকা ঢেলে তৈরির পরে শুধু হল থেকেই লাভ অন্তত ২০ লক্ষ। একই কথা প্রযোজ্য ভূতের ভবিষ্যৎ-এর ক্ষেত্রে। ভাল ব্যবসা করছে বেলাশেষে-ও। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বাংলা ছাড়াও এই মডেল জনপ্রিয় হচ্ছে অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায়। এমনকী বলিউডের সিনেমাতেও। লগ্নির ক্ষেত্রে আপাতত অবশ্য হিন্দি ভাষাই বাছছে অরেঞ্জ কর্প। তাদের দাবি, বাজারের মাপ বড় হওয়ায় দেশে-বিদেশে ছবির স্বত্ব বেচে লগ্নির টাকা তোলা ও লাভ করা সহজ হবে।
কম খরচে সিনেমা তৈরি করে মুনাফার মুখ দেখতে অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠছে শর্ট ফিল্মও। দম বন্ধ ব্যস্ততায় সিনেমা হলে গিয়ে লম্বা ছবি দেখার ফুরসত সব সময় মেলে না। তার উপর গেরো মাল্টিপ্লেক্সে টিকিটের চড়া দাম। এই প্রজন্মের কাছে তাই দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে ১৫-২০ মিনিটের ‘শর্ট ফিল্ম’। চাইলেই নিজের সুবিধা মতো সময়ে যা দেখে ফেলা যায় হাতে ধরা মোবাইল কিংবা ট্যাবলেটে। এই বিপুল সম্ভাবনা আঁচ করেই এ রকম ছবি তৈরিতে পিছপা হচ্ছেন না অনুরাগ কাশ্যপ, সুধীর মিশ্র, সুজয় ঘোষের মতো তারকা পরিচালকরা। এক দিকে, ইউ টিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের ছবি দেখার উৎসাহ। অন্য দিকে শর্ট ফিল্ম তৈরিতে নামী পরিচালকদের আগ্রহ। এই দু’দিক মেপেই এই নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছে কর্পোরেট মহল।
পরিচালক অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীর মতে, নতুন প্রজন্মের দর্শক আর পরিচালকের মধ্যে নির্ভরযোগ্য সেতু হয়ে উঠছে শর্ট ফিল্ম। আর সেই সেতু পোক্ত করতে পুঁজির অভাব হবে না। তাঁর দাবি, ‘‘নিজেদের ব্র্যান্ড-নাম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এ ধরনের ফিল্মকে মাধ্যম করতে এগিয়ে আসবেন বিজ্ঞাপনদাতারা। বিদেশে এই ধারা আগেই শুরু হয়েছে। এ বার হচ্ছে এখানেও। দর্শকদের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করতে পারলে, লগ্নি পেতেও অসুবিধা হবে না।’’
দেবাশিসবাবু যেমন জানাচ্ছেন, ইতিমধ্যেই তাঁদের টাকায় তৈরি একটি শর্ট ফিল্ম কান চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে। ফলে সহজ হয়েছে তার বিপণন। এ ধরনের ছবির স্বত্ব কিনতে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতার অভাব নেই, দাবি তাঁর।
এ দেশে সিনেমা তৈরিতে কর্পোরেট সংস্থার টাকা ঢালা নতুন নয়। যেমন, অনিল অম্বানীর বিগ পিকচার্স, মহীন্দ্রা গোষ্ঠীর মুম্বই মন্ত্র। তবে অরেঞ্জের সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট যে, এ বার কর্পোরেট দুনিয়া ঝুঁকছে কম বাজেটের লাভজনক সিনেমা তৈরিতে। যার মধ্যে রয়েছে শর্ট ফিল্মও। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, লাভের টাকা ঘরে উঠলে, আরও সংস্থা এই পথে হাঁটবে।