Advertisement
E-Paper

ছোট-মাঝারি শিল্পকে সাহায্যের সংস্থাও কার্যত গোটাচ্ছে রাজ্য

ছোট ও মাঝারি শিল্পকে উৎসাহ দিতে আলাদা নীতি তৈরি করেছে রাজ্য। যার কথা হামেশাই ফলাও করে বলে তারা। ওই ক্ষেত্রে লগ্নি টানতে আয়োজন করা হয়েছে সম্মেলনও (সিনার্জি-এমএসএমই)।

গার্গী গুহঠাকুরতা

শেষ আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০১৫ ০২:১৯

ছোট ও মাঝারি শিল্পকে উৎসাহ দিতে আলাদা নীতি তৈরি করেছে রাজ্য। যার কথা হামেশাই ফলাও করে বলে তারা। ওই ক্ষেত্রে লগ্নি টানতে আয়োজন করা হয়েছে সম্মেলনও (সিনার্জি-এমএসএমই)। অথচ সেই রাজ্য সরকারই সম্প্রতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেন্ট্রাল ইঞ্জিনিয়ারিং অর্গানাইজেশন (সিইও) এবং মডার্ন মিনি টুল রুম অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (এমএমটিআরটিসি)-কে মিশিয়ে উৎকর্ষ কেন্দ্র তৈরির। অথচ তার কাজ আদৌ কী হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন কেউ। কার্যত একে সংস্থা গোটানোর সামিল বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।

সেপ্টেম্বরে ছোট ও মাঝারি শিল্প দফতরের অধীন সংস্থা সিইও ‘বন্ধ করা’র সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য, যার মূল কাজই ছিল ছোট ও মাঝারি শিল্পকে প্রযুক্তি, বিপণন কৌশল এবং প্রয়োজনে টাকা জুগিয়ে সাহায্য করা। তার জেরে পাততাড়ি গুটোতে বাধ্য হচ্ছে ওই সংস্থার উপর নির্ভরশীল ১২টি ছোট-মাঝারি কারখানা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে রুজি-রুটি হারাবেন প্রায় ১,০০০ জন। বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে হাওড়ার দাসনগরে একই চত্বরের আর এক সংস্থা মডার্ন মিনি টুল রুম অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (এমএমটিআরটিসি) ঝাঁপও। সিইও-র কর্মীদের তা-ও অন্যত্র নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় সংস্থাটির সেই সুযোগও নেই। কারণ, সেখানে সব কর্মী চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত। ফলে চাকরি খোয়াতে বসেছেন ১৬ জন কর্মী।

ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত শিল্পমহলের প্রশ্ন, রাজ্যে বড় শিল্পে লগ্নি প্রায় নেই বললেই চলে। সেই পরিস্থিতিতে ছোট ও মাঝারি শিল্পে জোর দেওয়ার কথা বারবার বলে সরকার। কিন্তু তার এই নমুনা হলে, শিল্পায়ন আর এগোবে কোন পথে? জাতীয় স্তরের এক বণিকসভার কর্তা বলেন, ‘‘এক দিকে ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য আলাদা নীতি তৈরি করেছে রাজ্য। অথচ অন্য দিকে, সেই নীতি কার্যকর করার রাস্তাই বন্ধ করে দিচ্ছে তারা।’’

রাজ্যের দাবি, সিইও এবং এমএমটিআরটিসি-র তেমন কাজ নেই। কিন্তু সিইও-র কর্মীদের অভিযোগ, পরিকল্পিত ভাবেই ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আধিকারিক জানান, মার্চে যে-সব বরাত এসেছিল, কোনও কারণ না-দেখিয়েই সেগুলি বাতিল করে দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বাতিল করা হয়েছে এক কোটি টাকারও বেশি বরাত। ফলে কর্মীদের প্রশ্ন, ব্যবসা করতে না-দিয়ে সংস্থার গায়ে রুগ্‌ণ তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে কোন যুক্তিতে? হিসেবের খাতা অনুযায়ীও ২০১৩-’১৪ সালে ব্যবসার অঙ্ক ছিল প্রায় পাঁচ কোটি।

রাজ্যের যুক্তি, সংস্থা দু’টিকে চাঙ্গা করার রাস্তা খুঁজতে উপদেষ্টা সংস্থা ডেলয়েটকে নিয়োগ করা হয়। তাদের পরামর্শেই উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ার এই ব্যবস্থা।

সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সংস্থা দু’টিকে সংযুক্ত করে কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দফতরের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তৈরি হবে উৎকর্ষ কেন্দ্র। নাম ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর প্রিসিশন মেশিনিং অ্যান্ড ট্রেনিং’। কিন্তু নাম গালভরা হলেও, সেখানে আদতে কাজ কতটা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সরকারি মহলেই। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলির আধিকারিকদেরই ধারণা নেই যে, ওই কেন্দ্র থেকে ছোট ও মাঝারি শিল্প আদৌ কোনও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাবে কি না।

তবে ওই প্রস্তাবিত উৎকর্ষ কেন্দ্র যে সিইও-র উপর নির্ভরশীল সংস্থাগুলির কাজে আসবে না, সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রায় সকলেই। পঞ্চাশের দশকে তৈরি সরকারি সংস্থাটির হয়ে এক সময়ে কাজ করত প্রায় ৫০টি ছোট ও মাঝারি সংস্থা। এখন সেই সংখ্যা ঠেকেছে ১২টিতে। গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স, রাজ্য পরিবহণ নিগম বা সরকারি হাসপাতালের মতো জায়গায় বরাত পেতে সিইও-র ব্যানারের উপরই নির্ভর করত তারা। পেত বিভিন্ন সংস্থায় মালপত্র সরবরাহ থেকে শুরু করে হাসপাতালে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের মতো বিভিন্ন কাজ। আর বরাত পাওয়া থেকে শুরু করে পণ্য সরবরাহ— এই পুরো প্রক্রিয়ায় আর্থিক, বিপণন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিত সেন্ট্রাল ইঞ্জিনিয়ারিং।

উল্লেখ্য, ১৯৫৪-’৫৫ সালে ছোট ও মাঝারি সংস্থাগুলিকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার জন্যই সিইও তৈরি করেছিল রাজ্য। উদ্যোগী হয়েছিলেন তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়। হাওড়ার দাসনগর এলাকা যাঁর নামে তৈরি, সেই আলামোহন দাসের ‘এশিয়ান ড্রাগ’ কারখানাটিকে অধিগ্রহণ করেছিল রাজ্য। নতুন নামও রাখা হয় (সেন্ট্রাল ইঞ্জিনিয়ারিং অর্গানাইজেশন) তার পরেই।

ছোট-মাঝারি শিল্পের এত দিনের সহায়ক সংস্থাকে এ ভাবে গোটানোয় ক্ষুব্ধ শিল্পমহল। তাঁদের অভিযোগ, চেন্নাই, গুড়গাঁওয়ের মতো গাড়ি শিল্পের হাত ধরে ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের রমরমা এ রাজ্যে নেই। আর শিবরাত্রির সলতের মতো ছোট-মাঝারি শিল্প যেটুকু রয়েছে, সেখান থেকেও সাহায্যের হাত সরিয়ে নিচ্ছে রাজ্য। এক শিল্প-কর্তার আক্ষেপ, ‘‘বড় লগ্নি নেই। তার উপর তুলে দেওয়া হচ্ছে ছোট-মাঝারি শিল্পের সহায়ক সংস্থা। এর পরেও এ রাজ্যের শিল্পায়ন আদৌ সম্ভব?’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy