হিমালয়ের কোনও উঁচু শৃঙ্গ জয়ে বিরাট আনন্দ হয়। কিন্তু সেখানে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। পতাকা তুলে দ্রুত নেমে আসতে হয়। বেশি উচ্চতায় যে-কোনও সময়ে আবহাওয়া খারাপ হতে পারে, আসতে পারে তুষারঝড়, আশঙ্কা থাকে ধসের মুখে পড়ার। একই পরিস্থিতি হতে পারে, যখন শেয়ার সূচক সর্বকালীন উচ্চতার শৃঙ্গ জয় করে।
সম্প্রতি সেনসেক্স ও নিফ্টি আগের সব উচ্চতা ভেঙে গড়েছে নতুন নজির। এতটা উচ্চতায় বিক্রির চাপ আসবেই। সঙ্গে আছে আবহাওয়া সঙ্কট। পণ্যমূল্য আরও বাড়ার আশঙ্কা। ফলে কমার বদলে সুদ বাড়ার সম্ভাবনা। এই সব কথা মাথায় রেখে নয়া শৃঙ্গ জয়ের পর শুক্রবার সূচক সটান নেমে এসেছে ১৮৮ পয়েন্ট। অবশ্য সেনসেক্সের অবস্থান এখনও ভাল জায়গায়। এখন ভাল-মন্দের দোলাচলে দাঁড়িয়ে মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই বাজারে ক্রেতা হিসাবে প্রবেশ করা কতটা যুক্তিযুক্ত। না কি হাতের লক্ষ্মী পায়ে না ঠেলে লাটাই গুটিয়ে নেওয়াই ভাল।
বাজার মহলের ধারণা, নানা প্রতিকূল শর্তকে উপেক্ষা করে সূচকের এতটা উত্থানে ‘মোদী মলম’ বড় ভূমিকা নিয়েছে। মোদীর দলে বিশ্বখ্যাত জাদুকর থাকলেও ঝুঁকে পড়া অর্থনীতিকে কিন্তু রাতারাতি পাল্টে দেওয়া সম্ভব নয়। লক্ষণ দেখে যা মনে হচ্ছে, কেন্দ্রে মোদী সরকার এলে তা বিদেশি লগ্নিকারী এবং দেশের শিল্পপতিদের একটি বড় অংশের সমর্থন পেতে পারে। অর্থাৎ নির্বাচনের ফল বাজারের মনমতো হলে অল্প সময়ে বড় পতন হয়তো হবে না। ১৬ মে এবং তার কিছু দিন পর পর্যন্ত রাজনীতিই নিয়ন্ত্রণ করবে বাজারের ভাগ্য। তার পর ‘ব্যাটন’ যাবে অর্থনীতির হাতে। সেটাই হবে নয়া সরকারের কঠিন পরীক্ষা। যে দলই দিল্লির তখ্তে বসুক, তাদের এগোনোর পথ যে কুসুমাস্তীর্ণ থাকবে না, তা নিশ্চিত।
ফিরে আসা যাক বর্তমানে। কিছু সংস্থার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে গত সপ্তাহে। মোটের ওপর ভালই। তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির পর ভাল ফল করেছে প্রথম সারির বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলিও। অর্থবর্ষের শেষ ৩ মাসে এইচডিএফসি ব্যাঙ্কের নিট মুনাফা ১৮৯০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩২৭ কোটি। ব্যাঙ্কের এনপিএ কমে হয়েছে ০.৯৭%। ব্যাঙ্ক প্রতিটি ২ টাকার শেয়ারে ডিভিডেন্ড দেবে ৬.৮৫ টাকা করে। ১৮.৪৭% বেড়ে অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের নিট মুনাফা ছাড়িয়েছে ১৮৪২ কোটি টাকা। ব্যাঙ্কের প্রতিটি ১০ টাকার শেয়ারের বাজারদর ১৫০০ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় (১৫৩৪ টাকা) কর্তৃপক্ষ প্রতিটি ১০ টাকার শেয়ারকে ২ টাকার ৫টি শেয়ারে ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে অ্যাক্সিস শেয়ার ছোট লগ্নিকারীদের নাগালের মধ্যে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলাফলে উন্নতি ঘটিয়েছে আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কও। শেষ ৩ মাসে ব্যাঙ্কের নিট লাভ ১৫% বেড়ে ছুঁয়েছে ২৬৫০ কোটি টাকা। ভাল ফলাফলে ভর করে ব্যাঙ্কের শেয়ারের দর গত সপ্তাহে পৌঁছেছিল সর্বকালীন উচ্চতায়। ব্যাঙ্ক ডিভিডেন্ড দেবে শেয়ারে ২৩ টাকা। ইয়েস ব্যাঙ্কের লাভ ৩৬২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৩০ কোটি। শেয়ারে ৮ টাকা ডিভিডেন্ড দেবে তারা।
অন্য দিকে, তেল শোধন কোম্পানি কেয়ার্ন ইন্ডিয়া-র লাভ ১৮% বেড়ে পৌঁছেছে ৩০১৪ কোটি টাকায়। তবে খারাপ ফলাফলে প্রথম নজর কেড়েছে মারুতি সুজুকি। শেষ ত্রৈমাসিকে তাদের লাভ ৩৫.৪৬% কমে ৮০০.০৫ কোটিতে নেমেছে। বিক্রি কমেছে ৯.৫%। মরসুমের প্রথম দিকে বেরোয় ভাল ফলগুলি। অর্থাৎ এখনই উল্লসিত হওয়ার সময় আসেনি। ফল প্রকাশ পর্ব চলবে মে-র শেষ পর্যন্ত। এর আগেই গঠিত হয়ে যাবে নয়া সরকার। আবার আগামী দিনে মোদী হাওয়ার থেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে আবহাওয়ার খবর। এ সব মিলেই ঠিক করবে বাজারের গতিপথ। এ কথা মাথায় রেখে ও কোম্পানি ফলাফল বিচার করে শেয়ার ও মিউচুয়াল ইউনিট রাখা না-রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।