সপ্তাহ শেষে ছোট্ট সফরের চাহিদা বাড়ছে আধুনিক ব্যস্ত জীবনযাত্রায়। আর, তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে ঢুকে পড়ছে শখের মাছ ধরাকে ঘিরে পর্যটন। পাহাড়ি নদী বা সমুদ্রে নয়, সমতলে। বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, মুম্বইয়ের সঙ্গে সেই ব্যবসার দৌড়ে এ বার সামিল পশ্চিমবঙ্গও।
পাহাড়ের খরস্রোতা নদী বা সমুদ্রে প্রথাগত মেছো-পর্যটনের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হল বেড়ানোর সময় ও খরচ, দুটিই বেশি। পাশাপাশি সেখানে অভিজ্ঞ ‘অ্যাঙ্গলার’ (যাঁরা শখের মাছ ধরেন) ছাড়া অনভিজ্ঞ বা ছোটদের এই শখ মেটানো সহজ নয়। কিন্তু সপ্তাহ শেষে শহরের অদূরে এক দিন বা দু’দিনের সফরে সেই শখ মেটাতে পারলে রথ দেখা আর কলা বেচার মতো সবই সম্ভব হয় বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির।
পাহাড় থেকে মেছো পর্যটনকে যে সব সংস্থা সমতলে আনছে তাদের অন্যতম ‘রোগ অ্যাঙ্গলার্স’। বজবজের কাছে ‘বাওয়ালি প্রচেষ্টা’ সংস্থা পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত। সেখানকার দুটি পুকুরে এই সফর চালুর জন্য তাদের সঙ্গে চুক্তি করে ‘রোগ অ্যাঙ্গলার্স কার্প ডেন’ বলে একটি প্রকল্প শুরু করেছে ‘রোগ অ্যাঙ্গলার্স। সংস্থা-কর্তা চন্দন গুপ্তর মতে, সপ্তাহ শেষের ছুটির তালিকায় মেছো-পর্যটন যুক্ত হলে কম খরচে বেড়ানো ও এই শখ মেটানো সম্ভব। ছোটরাও পুকুরে এই শখের হাতেখড়ি করতে পারবে। বাওয়ালি-প্রচেষ্টার প্রেসিডেন্ট অরূপ চট্টোপাধ্যায় জানান, মেছো-পর্যটনের হাতছানিতে ব্যবসা হচ্ছে তাঁরও।
বেড়াতে গিয়ে মাছ ধরা বা মাছ ধরার জন্য বেড়াতে যাওয়া— এ দেশে এই প্রথার সূত্রপাত ব্রিটিশদের হাত ধরে। ১৮৭৩ সালে মাহশির ধরার প্রচলন করেন তাঁরা। তাঁদের হাত ধরেই জনপ্রিয় হয় ‘স্পোর্টস ফিশিং’। শুরু হয় ট্রাউট চাষ। কিন্তু তা মূলত বিদেশিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বছর কয়েক হল ভারতীয়দের মধ্যেও এ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। পর্যটন শিল্প সূত্রের খবর, ইউরোপে বিনোদনের জন্য মাছ ধরেন প্রায় আড়াই কোটি মানুষ। খরচ করেন ২.১৭ লক্ষ কোটি টাকা। ইউরোপিয়ান অ্যাঙ্গলার্স অ্যালায়েন্স ও ইউরোপিয়ান ফিশিং ট্যাকল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশেনের হিসেবে, মাছ ধরার উপকরণ তৈরি করে ২,৯০০টি সংস্থা। আমেরিকাতেও স্পোর্টস ফিশিংয়ে যুক্ত ৪.৪ কোটি মানুষ বছরে খরচ করেন ২.৭০ লক্ষ কোটি টাকা। অল ইন্ডিয়া গেম ফিশিং অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম ট্রাস্টি সদস্য ডেরেক ডি’সুজার দাবি, ভারতেও অ্যাঙ্গলার-এর সংখ্যা ১০ লক্ষের বেশি। উত্তর ভারতে মেছো-পর্যটন ব্যবসা এখন ৬০ লক্ষ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।
দক্ষিণ ভারতে সমতল কেন্দ্রিক মেছো-পর্যটনে যুক্ত ডি’সুজা জানাচ্ছেন, বেঙ্গালুরু থেকে ২০ এবং ৮০ কিলোমিটার দূরে দুটি জায়গায় এ ধরনের সাপ্তাহিক মেছো-পর্যটন শুরু হয়েছে। সপ্তাহে গড়ে তিন-চারটি পরিবার থেকে সফরের চাহিদা আসছে। চেন্নাইয়ের তিরোপুর এবং মুম্বইয়ের পোয়াই লেকেও শুরু হয়েছে এই সফর।
মেছো-পর্যটন প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষারও বার্তা দেয়, দাবি চন্দনবাবুর মতোই প্রবীণ অ্যাঙ্গলার তথা বিবাদি বাগ অ্যাঙ্গলার্স অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সুজিত কুমার চক্রবর্তীর। কারণ, সাধারণ পুকুরে যে মাছ ধরা ও প্রতিযোগিতার চল আছে, সেখানে মাছ খেয়ে নেওয়াই রীতি। কিন্তু মেছো-পর্যটনে তা সেই জলেই ছেড়ে দিতে হয়।