মাস তিনেক আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলায় লগ্নির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্বরাজ পল। কথা হয়েছিল ছোট গাড়ি তৈরির। কিন্তু আচমকা প্রায় দেউলিয়া দশা সেই তাঁর ইস্পাত ব্যবসার।
ব্রিটেনে ধনীদের তালিকায় পল প্রথম পঞ্চাশে। ভারতের স্বাধীনতার পরে রানির দেশে প্রথম ‘লর্ড’ খেতাব তাঁর ঝুলিতে। ব্রিটিশ রাজনীতি এবং শিক্ষাজগতেও এই ভারতীয় বংশোদ্ভূতের যথেষ্ট প্রতিপত্তি। এ হেন স্বরাজ পলের হাতেগড়া সংস্থা ক্যাপারো ইন্ডাস্ট্রিজের হাল এখন সঙ্গিন। ধুঁকছে কুড়িটির মধ্যে ষোলোটি ব্যবসা। এতটাই যে, ক্যাপারোকে পাঠাতে হয়েছে ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর হেফাজতে।
ব্রিটেনে কোনও সংস্থা বিপুল লোকসান করলে এবং সেই দরুন সময়ে ধার মেটাতে খাবি খেলে, তখন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দ্বারস্থ হতে পারে তারা। অনেকটা ভারতের বিআইএফআরের মতো। এ ক্ষেত্রে যেমন ক্যাপারোর দায়িত্ব বর্তেছে উপদেষ্টা সংস্থা পিডব্লিউসি-র উপর। তাদের কাজ, সংস্থার পাশাপাশি ঋণদাতাদের স্বার্থও দেখা। খুঁজে বার করা যে, কোন পথে হাঁটলে সংস্থাকে (কিংবা নিদেন পক্ষে তার কিছু ব্যবসাকে) ঘুরিয়ে দাঁড় করানো সম্ভব। তত দিন সাধারণত ধার ও কর মেটানোর বিষয়টি মুলতুবি রাখার (মোরাটোরিয়াম) সুবিধা পায় সংস্থা। পিডব্লিউসি-র দাবি, এ যাত্রা হয়তো ‘বেঁচে যেতে’ পারে ক্যাপারো। কারণ, তাদের যে সমস্ত ব্যবসার হাল বেশ খারাপ, সেগুলি কিনতেও আগ্রহ দেখাচ্ছে অনেক সংস্থা।
কিন্তু এই দাবিতে মোটেই আশ্বস্ত হতে পারছে না ব্রিটেন। বরং পলের সংস্থার বেহাল দশায় প্রমাদ গুনছে তারা। কারণ, আজ অনেক দিন থেকেই পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছে ব্রিটিশ ইস্পাত শিল্প। সম্প্রতি কারখানা গুটিয়েছে প্রায় শতাব্দীপ্রাচীন রেডকার স্টিলওয়ার্কস। চাকরি গিয়েছে ২,২০০ জনের। স্কানথর্প এবং স্কটল্যান্ডে ১,২০০ জনকে ছাঁটাইয়ের কথা জানিয়েছে টাটা স্টিল। এবং এই সব কিছুর উপর এ বার ক্যাপারোর দরজাও বন্ধ হলে, কাজ খোয়াবেন অন্তত আরও ১,৭০০ কর্মী। ফলে ইস্পাত শিল্পকে বাঁচানোর উপায় খুঁজতে ইতিমধ্যেই প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সরকারের উপর। বৃহত্তম ব্রিটিশ কর্মী সংগঠন ইউনাইট-এর অ্যালেক্স ফিনের কথায়, ‘‘আমরা সরকারি পদক্ষেপ চাই। এখনই।’’
বেজিং অলিম্পিক পর্যন্ত চিনে ইস্পাতের চাহিদা ছিল তুঙ্গে। তার পর থেকে সেই চাহিদা কমেছে ক্রমাগত। আর চিনে ইস্পাতের চাহিদা কমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে তার দাম কমেছে হুড়মুড়িয়ে। তার প্রকোপ থেকে বাদ পড়েনি ব্রিটেনের মাটির ইস্পাত সংস্থাগুলিও।
তার উপর সেখানকার ইস্পাত শিল্পের অভিযোগ, নিজেদের তৈরির খরচের থেকেও কম দামে ইংল্যান্ডে ইস্পাত বেচছে (ডাম্পিং) চিনা সংস্থাগুলি। ফলে দামের লড়াইয়ে পাল্লা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাদের সঙ্গে। তার উপর রয়েছে বিদ্যুতের চড়া দর। ফলে ধুঁকছে ব্রিটিশ ইস্পাত শিল্প।
এখন আবার ব্রিটেন সফরে গিয়েছেন চিনের প্রেসিডেন্ট জাই জিনপিং। ব্রিটিশ শিল্পমহলের দাবি, তাঁর সামনে ডাম্পিংয়ের অভিযোগ অবশ্যই তুলুন ক্যামেরন। হিল্লে করা হোক বাকি সমস্যাগুলিরও।
পঞ্জাবের জালন্ধরের ছেলে স্বরাজ পলের এত দিনের উড়ান ব্রিটেনে প্রায় রূপকথার মতো। বাবা ইস্পাতেরই ছোট ব্যবসা করতেন। ১৯৬৬ সালে ব্রিটেনে গিয়েছিলেন মেয়ে অম্বিকার ক্যানসারের চিকিৎসা করাতে। মেয়ে সুস্থ হয়ে ফেরেনি। কিন্তু আর ফিরে তাকাতে হয়নি পলকেও।
১৯৬৮ সালে মাত্র ৫ হাজার পাউন্ড ধার নিয়ে ব্রিটেনে ব্যবসা শুরু। সংস্থার নাম ন্যাচরাল গ্যাস টিউবস। প্রথম বছরে বিক্রি ১৪,০০০ পাউন্ড। সেখান থেকে ক্যাপারো ইন্ডাস্ট্রিজের বিভিন্ন দিকে (ইস্পাত, গাড়ির যন্ত্রাংশ, ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি) ছড়ানো ব্যবসা। ব্যবসার অঙ্ক ৩৭ কোটি পাউন্ড (প্রায় ৩,৮০০ কোটি টাকা)।
তা ছাড়া শুধু তো শিল্পপতি নয়, ব্রিটেন স্বরাজ পলকে এক ডাকে চেনে তাঁর ‘লর্ড’ উপাধির জন্য, রাজনৈতিক মহলের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ হিসেবে। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বিজনেস স্কুলের দেওয়ালে তাঁর ছবির দেখা মিলবে। সব থেকে বড় কথা, চরম সঙ্কটের মুহূর্তে ১০ লক্ষ পাউন্ড খরচ করে লন্ডনের বিখ্যাত চিড়িয়াখানাকে (লন্ডন জু) এক সময়ে ‘বাঁচিয়েছেন’ তিনি। সেখানে প্রতি বছর পার্টিও দেন মেয়ে অম্বিকার স্মৃতিতে। তাঁর তৈরি যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে জাগুয়ার, ল্যান্ড রোভার, নিসান, বিএমডব্লিউ, এমনকী রোলস রয়েসের মতো গাড়ি ব্র্যান্ড। এ হেন পলের সংস্থার এমন বেহাল দশা তাই কিছুটা হকচকিয়ে দিয়েছে ব্রিটেনকে।
হালফিলে ২৫ লক্ষ পাউন্ড লোকসান করেছে ক্যাপারোর ব্রিটেনের ব্যবসা। অথচ গত বছরেও সেখানে লাভ হয়েছিল ১৭ লক্ষ পাউন্ড। আর সেই কারণেই পলের সংস্থার এই ঘোষণায় এত তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্রিটেনে। দাবি উঠেছে, আর সামান্যতম দেরিও না-করে ইস্পাত শিল্পকে বাঁচাতে পদক্ষেপ করুক সরকার। চিনের বিষয়ে কড়া হোক। স্থানীয় শিল্পকে অক্সিজেন জোগাতে প্রয়োজনে দেওয়া হোক করছাড়। নইলে আরও বহু চাকরি যাবে, আশঙ্কার প্রহর গুনছে ব্রিটেন।