Advertisement
২০ মার্চ ২০২৩
book review

বিচারে এত ফারাক হয় কী করে

‘নয়েজ়’ মানে কী? নয়েজ়-এর চলিত অর্থ কোলাহল বা শব্দ হলেও, আলোচ্য বইয়ে যে অর্থে কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি হল পেশাদার বিচারে অবাঞ্ছিত তারতম্য।

পুনর্জিৎ রায়চৌধুরী
শেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২২ ০৬:৫৫
Share: Save:

নয়েজ়: আ ফ্ল ইন হিউম্যান জাজমেন্ট

Advertisement

ড্যানিয়েল কানেমান, অলিভিয়ার সিবোনি,

ক্যাস আর সানস্টেন

৬৯৯.০০

Advertisement

উইলিয়াম কলিন্স

মাসখানেক আগের কথা। বাজার করে ফেরার সময়, মেজোমামা বাড়ির সামনে পড়ে গিয়ে কাঁধে চোট পেলেন। রাতে ব্যথা বাড়ল। পরের দিনই শহরের এক বিখ্যাত অর্থোপেডিক ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেন। এক্স-রে রিপোর্ট দেখে ডাক্তারবাবুর নিদান— শোল্ডার ডিসলোকেশন, সার্জারি না করালেই নয়। শুনে মেজোমামা সোজা বাড়ি। মানুষটি এমনিতেই ভিতু, তার উপর এই কোভিড পরিস্থিতিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াটাও ঝুঁকিপূর্ণ। এ দিকে ব্যথাও তো আর সহ্য করা যায় না। তাই দিন তিনেক বাদে শরণাপন্ন হলেন আর এক ডাক্তারবাবুর। তিনি একই এক্স-রে রিপোর্ট পরীক্ষা করে দেখলেন। তার পর দুটো ওষুধ প্রেসক্রাইব করে আর বাহুতে শোল্ডার-স্লিং পরিয়ে দিয়ে বললেন, এতেই ব্যথা কমে যাওয়া উচিত। দ্বিতীয় ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মতো চলে সপ্তাহ দুয়েকে ব্যথা প্রায় উধাও। সে দিন ফোনে কেমন আছেন জানতে চাওয়ায় মেজোমামা বললেন, “এখন তো দিব্যি আছি। কিন্তু একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারছি না। দু’জন ডাক্তার— একই রিপোর্ট দেখলেন, তা-ও তাঁদের পেশাদার বিচারে এত তফাত হয় কী করে?”

প্রশ্নটা মেজোমামার হলেও, উত্তরটা জানার আগ্রহ আমাদের অনেকেরই, কারণ এ রকম অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই কখনও না কখনও হয়েছে। তাঁদের নতুন বইয়ে সেই উত্তরেরই সন্ধান করেছেন নোবেলজয়ী মনস্তত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল কানেমান এবং তাঁর দুই সহলেখক অলিভিয়ার সিবোনি ও ক্যাস আর সানস্টেন।

‘নয়েজ়’ মানে কী? নয়েজ়-এর চলিত অর্থ কোলাহল বা শব্দ হলেও, আলোচ্য বইয়ে যে অর্থে কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে, সেটি হল পেশাদার বিচারে অবাঞ্ছিত তারতম্য। অতএব, মেজোমামার ক্ষেত্রে যা হয়েছে, তা নয়েজ়-এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সমাজে এই রকম তারতম্য বা বিভিন্নতা অনেক সময়ই উপেক্ষিত থেকে যায়, যদিও তা সর্বব্যাপী এবং সামাজিক বিপর্যয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠতে পারে। বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য বই থেকে দু’টি উদাহরণ দেওয়া যাক।

১৯৮১ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায় যে, ১৬টি বিভিন্ন মামলার অপরাধীদের জন্য আমেরিকার ২০৮ জন বিচারকের প্রত্যেককে যখন উপযুক্ত সাজা নির্ধারণ করতে বলা হয়, প্রত্যেকটি মামলার ক্ষেত্রেই তাঁদের বিচারে চোখে পড়ার মতো তারতম্য লক্ষ করা যায়। হিসাব করে দেখা যায়, একই অপরাধের জন্য ‘র‌্যান্ডমলি সিলেক্টেড’ বা যদৃচ্ছ ভাবে নির্বাচিত দু’জন বিচারকের নির্ধারিত গড় সাজার মধ্যে পার্থক্য সাড়ে তিন বছরেরও বেশি! বলা বাহুল্য, এই ধরনের নয়েজ় বিচার ব্যবস্থাকেই বড়সড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

দ্বিতীয় উদাহরণটি বিমা শিল্পে নয়েজ় সম্পর্কিত। মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বিগ্ন একটি নামী বিমা কোম্পানি সেখানে কর্মরত আন্ডাররাইটারদের (যাঁরা ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিমার প্রিমিয়াম নির্ধারণ করেন) যখন নির্দেশ দেয় একই ধরনের বিভিন্ন কেসের জন্য প্রিমিয়াম নির্ধারণ করতে, তখন দেখা যায় যে, বিভিন্ন আন্ডাররাইটারের নির্ধারিত প্রিমিয়ামের মধ্যে প্রচুর ফারাক। এক জন আন্ডাররাইটারের নির্ধারিত প্রিমিয়াম যদি হয় ৯,৫০০ ডলার, তো তাঁর সহকর্মীর নির্ধারিত প্রিমিয়াম ১৬,৭০০ ডলার! এই ধরনের নয়েজ় যে কোনও বিমা কোম্পানিকেই আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। কারণ, এর দরুন যেমন কিছু ভোক্তাকে নিজেদের ক্ষতি করেই বিমা বিক্রয় করে ফেলতে পারে বিমা কোম্পানি, কিছু ভোক্তাকে তারা হারাতেও পারে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম ধার্য করার ফলে।

নয়েজ় কী, এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ তা তো বোঝা গেল। কিন্তু নয়েজ়-এর উৎস কোথায়? লেখকদের মতে, নয়েজ়-এর অন্যতম উৎস নানা ধরনের মনস্তাত্ত্বিক অসঙ্গতি। একটি উদাহরণ দিই। আমরা প্রথম সাক্ষাতেই অনেকের সম্পর্কে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি করে ফেলি প্রায় কিছু না জেনেই (মনস্তাত্ত্বিক এই অসঙ্গতিকে ‘এক্সেসিভ কোহিয়ারেন্স’ বলা হয়)। কিন্তু আপনার তৈরি হওয়া ধারণার সঙ্গে আমার তৈরি হওয়া ধারণা মিলবে, তার কোনও মানে নেই। ফলত, একই মানুষ সম্পর্কে আপনার পেশাদার বিচারের সঙ্গে আমার পেশাদার বিচারে অবাঞ্ছিত ফারাক ঘটবেই, কারণ পেশাদার বিচার অনেকাংশেই নির্ধারণ করে আমাদের প্রাথমিক ধারণা। ফলে সৃষ্টি হয় নয়েজ়।

আলোচ্য বইটিতে নয়েজ়-এর সামাজিক তাৎপর্য আলোচনা করতে গিয়ে লেখকেরা দেখিয়েছেন, গোষ্ঠী বা দল নয়েজ়-এর বিপুল বৃদ্ধিতে আশ্চর্য ভাবে সহায়ক হয়ে উঠতে পারে। ধরুন, আপনি অফিসে একটি মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করছেন। সেখানে আলোচনার মাধ্যমে স্থির হওয়ার কথা, শূন্য একটি পদে কোনও এক জন চাকরিপ্রার্থীকে নিয়োগ করা হবে কি না। যিনি প্রথম বক্তা, তিনি হয়তো জানালেন যে, তিনি সেই চাকরিপ্রার্থীকে নিয়োগ করার পক্ষে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে অনেক সময়েই ভাবনাচিন্তা না করেই আমরা অন্যের সিদ্ধান্তে সমর্থন জানিয়ে ফেলি, যদি তিনি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য হন এবং তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি আমাদের সাধারণত আস্থা থাকে। এই ক্ষেত্রেও ধরে নিন যে, প্রথম বক্তা যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য হিসাবে পরিচিত। অতএব আপনি এবং আপনার বেশির ভাগ সহকর্মী তাঁর সিদ্ধান্তে সমর্থন জানালেন। ফলত, যিনি চাকরিপ্রার্থী তিনি চাকরিটা পেয়ে গেলেন।

কিন্তু যিনি প্রথম বক্তা, তাঁর পরিবর্তে যদি অন্য কোনও ব্যক্তি (ইনিও নির্ভরযোগ্য হিসাবে পরিচিত) প্রথম বক্তা হতেন, এবং তিনি সেই একই চাকরিপ্রার্থীকে নিয়োগের বিপক্ষে মত দিতেন (কারণ চাকরিপ্রার্থীকে তাঁর যথেষ্ট পরিশ্রমী মনে হয়নি বলে)? আপনি এবং আপনার সহকর্মীরা কিন্তু সেই সিদ্ধান্তটিকেও সমর্থন করে বসতেন! অর্থাৎ, দু’জন মানুষের পেশাদার বিচারে যে সম্ভাব্য তারতম্য, সেই তারতম্য একটি গোটা গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তে অবাঞ্ছিত তারতম্য ঘটাতে পারে।

কী ভাবে নয়েজ় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? লেখকদের মতে, প্রথমে একাধিক ব্যক্তিকে স্বাধীন ভাবে বিচার করতে দেওয়া, এবং সেই সমস্ত বিচার একত্রিত করে তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়েজ় হ্রাস করার একটি উপায়। সুস্পষ্ট নির্দেশিকা বা গাইডলাইন, যা আমাদের স্বজ্ঞা, অনুমান ও যদৃচ্ছ পছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তা-ও নয়েজ় নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা নিতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, চাকরির ইন্টারভিউয়ে যাঁরা সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাঁদের প্রত্যেকে যদি চাকরিপ্রার্থীদের একই প্রশ্ন একই ক্রমে জিজ্ঞেস করেন, তা হলে কাকে নিয়োগ করা হবে তা নিয়ে মতপার্থক্য কম হয়।

নয়েজ় যে-হেতু মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসঙ্গতি থেকে সৃষ্টি হয়, তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যদি মানুষের বদলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) উপর নির্ভর করি, তা হলে নয়েজ় নিয়ন্ত্রণ করা নিশ্চয়ই সম্ভব? লেখকেরা কিন্তু এ বিষয়ে খুব আশাবাদী নন। তাঁদের মতে, যে সব ক্ষেত্রে মানুষের পেশাদার বিচারের প্রয়োজন, সেই সব ক্ষেত্রে বিচারের জন্য এআই এখনও প্রস্তুত নয়। আপাতত তাই মানুষের বিচার-বিবেচনাকে উন্নত করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে ভুলচুক কমানোটাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। বিচারের ভার এআই-এর উপর ছেড়ে দেওয়া নয়।

দশ বছর আগে প্রকাশিত থিঙ্কিং, ফাস্ট অ্যান্ড স্লো বইটি পড়ে অধ্যাপক কানেমানের ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। নয়েজ় পড়ে আবারও কুর্নিশ জানাতেই হল তাঁকে এবং তাঁর সহলেখকদের, এ রকম একটি সর্বব্যাপী অথচ অনালোচিত সমস্যার উপর আলোকপাত করার জন্য। বইটির ভাষা সহজ, তাই পড়তে অসুবিধা হয় না। কিন্তু প্রচুর উদাহরণ এবং কেস স্টাডি ব্যবহারের (কখনও অযথা) ফলে বইটিকে একটু শ্লথ এবং পুনরাবৃত্তিমূলক বলে মনে হতে পারে। সেটুকু খামতি বাদ দিলে বলতেই হয়, মনোবিজ্ঞান ও আচরণমূলক অর্থনীতির গবেষণায় নয়েজ় গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোজন।

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তেফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ

Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.