E-Paper

‘সে তৈরি হয়েই এসেছিল’

অপুর সংসার-এর সময় ‘অপু’ চরিত্রটিকে নিয়ে দু’পৃষ্ঠার একটি নোট দেন সত্যজিৎ, যেটি বার বার পড়ে সৌমিত্র ‘অপু’ চরিত্রের একটি সাইকোবায়োগ্রাফি তৈরি করে ফেলেছিলেন।

শিলাদিত্য সেন

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:০২
পারস্পরিক: অরণ্যের দিনরাত্রি ছবির শুটিংয়ে সত্যজিৎ রায়, শর্মিলা ঠাকুর ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

পারস্পরিক: অরণ্যের দিনরাত্রি ছবির শুটিংয়ে সত্যজিৎ রায়, শর্মিলা ঠাকুর ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

আ কাউন্টেস ফ্রম হংকং পরিচালনার সময় চার্লি চ্যাপলিন যখন মার্লন ব্র্যান্ডোকে নির্বাচন করেন, এক সাংবাদিক ব্র্যান্ডোকে জিজ্ঞেস করেন: চিত্রনাট্য পড়েছেন? ব্র্যান্ডো অভিনয়ের আগে খুঁটিয়ে চিত্রনাট্য পড়তেন জেনেই ওই প্রশ্ন। উত্তরে ব্র্যান্ডো ‘না’ তো বলেইছিলেন, সঙ্গে এও: চ্যাপলিন যদি আমায় টেলিফোন ডিরেক্টরি দেখিয়ে বলেন ওটাই চিত্রনাট্য, তা হলেও অভিনয় করব।

সত্যজিৎ রায় সম্পর্কে নিজের মনোভাব বোঝাতে ঘটনাটি শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘ এক কথোপকথনে উল্লেখ করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। উদাহরণ হিসেবে বলেন শাখা-প্রশাখা-র কথা, সে-ছবির জন্য সত্যজিৎ তাঁকে নির্বাচনের পর বলেন, “যে চরিত্রটা, তার কিন্তু হার্ডলি ২৫টা কথা থাকবে, কিন্তু আমার খুব নির্ভরযোগ্য একজনকে চাই, কারণ ওর অভিনয়টা অন্য দিক থেকে খুব শক্ত... তুমি এটা করে দেবে?”

সঙ্ঘমিত্রা চক্রবর্তী সৌমিত্রের কর্মময় জীবনকে যে ভাবে দশটি বিভাগে সাজিয়ে তাঁর ৪৭৮ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি রচনা করেছেন, তাতে সবচেয়ে যত্নের ছাপ সত্যজিৎ-সৌমিত্রের এই অচ্ছেদ্য গ্রন্থি বিষয়ক অধ্যায়গুলিতে। বলেওছেন সে-কথা বইটির ভূমিকায়। কবি গদ্যকার সম্পাদক নাটককার নাট্যাভিনেতা আবৃত্তিকার ছবি-আঁকিয়ে— এ সব সত্তা ছাপিয়েও সৌমিত্র আদতে ‘অ্যান অ্যাক্টর অব ইন্টারন্যাশনাল রিনাউন, হি ওয়াজ় বেস্ট নোন ফর হিজ় কোলাবরেশন উইথ সত্যজিৎ রায়’। সৌমিত্রের জীবনের মতোই এই সৌমিত্র-জীবনীটিতেও ব্যাপ্ত হয়ে আছেন সত্যজিৎ, তাঁকে তৃতীয় চতুর্থ ও পঞ্চম বিভাগে বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদের সমাহারে ঘনত্ব দিয়েছেন লেখিকা।

অপুর সংসার-এর সময় ‘অপু’ চরিত্রটিকে নিয়ে দু’পৃষ্ঠার একটি নোট দেন সত্যজিৎ, যেটি বার বার পড়ে সৌমিত্র ‘অপু’ চরিত্রের একটি সাইকোবায়োগ্রাফি তৈরি করে ফেলেছিলেন। প্রথম ছবি থেকেই সত্যজিতের সঙ্গে একটা অদ্ভুত আন্তরিক বোঝাপড়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল, বা পর পর তাঁর ছবিতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন বলেই বোধহয় সৌমিত্র যেন নিজের স্বাভাবিক কল্পনাতেই বুঝতে পারতেন— কোন ছবির চরিত্রটা সত্যজিৎ ঠিক কী ভাবে ভেবেছেন, কোন দৃশ্যে চরিত্রটা কী ভাবে হাঁটবে, কোন ভঙ্গিতে কথা বলবে ইত্যাদি। এমন নানা ব্যাপারে দু’জনের ভাবনার আশ্চর্যজনক মিলের প্রসঙ্গটি বহু বার উত্থাপন করেছেন সৌমিত্র।

এ-বইয়ে সে-অধ্যায়গুলির শিরোনাম: ‘দ্য ম্যাজিক্যাল কেমিস্ট্রি’, ‘ওনলি মানিকদা গট মি’ ইত্যাদি। গ্রন্থপ্রণেতার মুনশিয়ানা এখানেই যে তিনি প্রসঙ্গটিকে প্রামাণ্য করে তুলেছেন উল্টো দিক থেকে, সত্যজিতের ভাবনার ভিত্তর দিয়ে। যেমন সত্যজিতের নিজস্ব ধরনে পরিমিত সংক্ষিপ্ত অথচ যথাযথ মন্তব্য: “আমার তরফ থেকে সৌমিত্রকে সার্টিফিকেট দেবার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।... তার প্রতি আমার নির্ভরশীলতা আমার শিল্পীজীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বজায় থাকবে এটা আমি জানি।” আর এক বার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন সাকুল্যে তিনটি বাক্য: “সে তৈরি হয়েই এসেছিল। তাকে খুব সামান্য কথাই বলতে হত। সৌমিত্র নিজের থেকেই বুঝতে পারত, আমি কী চাই।”

সত্যজিতের কর্মসঙ্গী সন্দীপ রায়ও প্রায় প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ দিয়েছেন যেন সঙ্ঘমিত্রাকে: “বাবাকে কক্ষনও বলতে শুনিনি যে, সৌমিত্র-নির্বাচনে ভুল হয়েছিল। ১৯৫৮ থেকে ’৯২, একটানা কাজ করে গিয়েছেন দু’জনে, এমন দীর্ঘমেয়াদি মিত্রতা বিরল, রীতিমতো অকল্পনীয়,” বলতে বলতে সন্দীপ দু’জনের মধ্যেকার নিশ্ছিদ্র নির্ভরতা বা বিশ্বাসের কথাও তোলেন, “পরস্পরের পরিপূরক ছিলেন ওঁরা, তাই এমন ধারাবাহিক সাফল্য।”

সৌমিত্র চ্যাটার্জি অ্যান্ড হিজ় ওয়ার্ল্ড

সঙ্ঘমিত্রা চক্রবর্তী

৯৯৯.০০

ভিন্টেজ বুকস (পেঙ্গুইন)

তপন সিংহ মনে করতেন, ফেলিনির যেমন সেকেন্ড ইগো মার্চেল্লো মাস্ত্রইয়ানি, আকিরা কুরোসাওয়ার তোশিরো মিফুনে, সত্যজিৎবাবুর তেমন সৌমিত্র। ইঙ্গমার বার্গম্যান ও ম্যাক্স ভন সিডো, মার্টিন স্করসেসি ও রবার্ট ডি নিরো— আরও দুই পরিচালক-অভিনেতাকে যোগ করেছেন লেখিকা। তবে তথ্যচিত্র-সহ চোদ্দোটি ছবিতে এক সঙ্গে কাজ করা, সত্যজিৎ-সৌমিত্রের এই অদ্বয় সম্ভবত সিনেমার ইতিহাসেই খুঁজে পাওয়া মুশকিল, সন্দীপও মানেন সে-কথা।

এই সূত্রে ‘উইন্ডস ফ্রম ওভারসিজ়’ পরিচ্ছেদে জীবনীকার খেয়াল করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৭৩-এ বার্লিন ফেস্টিভ্যালে সত্যজিতের অশনি সংকেত শ্রেষ্ঠ ছবি বিবেচিত হওয়ার জন্য ‘গোল্ডেন বেয়ার’ পাওয়ার পাশাপাশি সে-ছবিতে ‘গঙ্গাচরণ’ চরিত্রটি করার জন্য সৌমিত্রের সেরা অভিনেতার শিরোপা ‘সিলভার বেয়ার’ পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়েছিল, কিন্তু তিনি পাননি, কারণ একই ছবিকে দু’টি পুরস্কার দেওয়ার চল ছিল না তখন। ফলে সে বার কাউকেই সেরা অভিনেতার সম্মান দেওয়া হবে না, এমন সিদ্ধান্ত নেন ফেস্টিভ্যালের বিচারকমণ্ডলী। তবে সে বার জুরি-চেয়ারম্যান ছিলেন ব্রিটিশ চলচ্চিত্র আলোচক ডেভিড রবিনসন, তথ্যবিভ্রাটে ডেরেক ম্যালকম লেখা হয়েছে (পৃ ১৮৮)।

আন্তর্জাতিক পরিসরে সৌমিত্রের অভিনয় কতখানি আদৃত তাঁর চলচ্চিত্রাভিনয়ের জন্মলগ্ন থেকেই, সে খতিয়ান তৈরিতেও তন্নিষ্ঠ লেখিকা। ‘দ্য চিলড্রেন অব লাইট’, ‘দ্য স্প্লেনডিড সিক্সটিজ়’, ‘দ্য মাস্টারপিস’, ‘মেমোরেবল মেন’ ইত্যাদি অধ্যায়ে ইউরোপ ও আমেরিকার চলচ্চিত্রবেত্তারা তাঁদের শিল্পিত মনোনিবেশে কী ভাবে মূল্যায়ন করেছেন সত্যজিতের ছবির চরিত্রাদিতে সৌমিত্রের অভিনয়কে, সে-সবের বিস্তারিত একটা হদিস।

সত্যজিতের পাশাপাশি সে কাল-এ কাল মিলিয়ে বাংলা ছবির তিন প্রজন্মের প্রায় সব গুণী পরিচালকের সঙ্গেই কাজ করেছেন সৌমিত্র। এ নিয়ে একাধিক অধ্যায় ষষ্ঠ ও দশম বিভাগটিতে। গত শতকের শেষ পর্বে তাঁকে মহাপৃথিবী-তে অভিনয় করানোর পর মৃণাল সেনের মনে হয়েছিল, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়ের ব্যাপ্তিও বাড়ছে সৌমিত্রের। নতুন শতকে তাঁকে নিয়ে কাজ করার তেমনই অভিজ্ঞতা গৌতম ঘোষ (দেখা) সুমন ঘোষ (পদক্ষেপ) অনীক দত্ত (বরুণবাবুর বন্ধু) ও অতনু ঘোষের (ময়ূরাক্ষী)। অভিনয়ের পারঙ্গমতা অসাধারণ, মনে হয়েছে গৌতমের। অতনু মনে করেন, বয়সজনিত প্রাজ্ঞতা তাঁর নৈপুণ্যে যুক্ত হয়ে অভিনীত চরিত্রকে আরও প্রামাণ্য করে তুলেছে।

সিনেমায় সম্পৃক্ত হওয়ার আগে ও পরে সৌমিত্রের সংবেদনশীল মনে বাঙালি সংস্কৃতির পাশাপাশি ভারতীয়তা ও বিশ্ববোধের আত্তীকরণ ঘটেছিল কী ভাবে, তার রূপরেখাও আদ্যন্ত গোটা বইটি জুড়ে। তাঁর মনের নির্মাণে ক্রমশই জুড়ে জুড়ে গিয়েছিল... আশৈশব বড় হয়ে ওঠার মফস্‌সল শহর কৃষ্ণনগরে অন্য ধর্মাবলম্বীদের শ্রদ্ধা করার শিক্ষা, শিক্ষিত বাঙালি পরিবারে জন্মানোর সুবাদে সাহিত্যপাঠ শিল্পচর্চা ও দেশাত্মবোধ, আকৈশোর রবীন্দ্রনাথ পড়ার ভিতর দিয়ে মনের যাবতীয় অচলায়তন ভেঙে ফেলা, কলকাতা শহরে এসে মানবমুক্তির দিশা মার্ক্সপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাস, শিশিরকুমার ভাদুড়ির সান্নিধ্যে নাটক ও অভিনয় নিয়ে পড়াশোনার গভীর উদ্যোগ... এমন বিবিধ বিন্যাসে বার বার নিজেকে আত্মসমীক্ষণের দিকে নিয়ে গিয়েছেন সৌমিত্র, আর তা থেকেই জন্ম নিয়েছে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি। মধ্যবিত্ত অস্তিত্ব থেকে মুক্তির জন্য লিখতেন কবিতা, নিরানন্দ অন্ধ কারাগার থেকে মনটাকে বার করে আনার জন্যে আঁকতেন ছবি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশভাগ পেরিয়ে আধুনিক জীবন ও সমকালীন যন্ত্রণাকে তুলে আনার জন্যে ভিনদেশি নাটকের স্বদেশি রূপান্তরে ব্রতী হতেন।

গ্রন্থনির্মাণে শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় (ও রঞ্জন মিত্র) সম্পাদিত সৌমিত্রের গদ্যসংগ্রহ এবং অনসূয়া রায়চৌধুরী কৃত সৌমিত্রের সাক্ষাৎকার-গ্রন্থ কতখানি সহায়ক হয়েছিল তা উল্লেখ করেছেন সঙ্ঘমিত্রা ভূমিকায়, সেখানেই জানিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাঁর এই বই, এবং ‘প্যান-ইন্ডিয়া অডিয়েন্স’-এর জন্যও। খেদ একটাই, এমন বইতে নির্ঘণ্ট/বর্ণানুক্রমিক সূচি (ইন্ডেক্স) নেই।

অনবদ্য মুখবন্ধ শর্মিলা ঠাকুরের, তাতে সৌমিত্র সম্পর্কে লাবণ্যময় গদ্যের ভিতরে অমোঘ দু’টি বাক্য: “হি ওয়াজ় দ্য মোস্ট আনকনভেনশনাল মুভি স্টার আই হ্যাভ কাম অ্যাক্রস,” আর “হি ওয়াজ় অ্যান্ড উইল বি মাই অপু— অলওয়েজ়।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

soumitra chatterjee Satyajit Ray

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy