E-Paper

স্মৃতিকথায় পূর্ব-পশ্চিম বন্ধনের মিষ্টি সুর

আবার এ দিকে বিপ্লবী সময় এসে বালিকা কোতিয়া ও তার পরিবারের জীবনকে একেবারে ওলট-পালট করে দিল।

সুনন্দন রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:২০
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

রাশিয়া খবরের শিরোনামে আজ একশোরও বেশি বছর। ১৯১৭ সালের রাশিয়ায় ভ্লাদিমির লেনিনের জ্বালাময়ী ভাষণ এবং ক্ষুরধার পরিকল্পনা যখন বিপ্লব নিয়ে এল, তখনকার এক ইহুদি পরিবারের বারো বছরের এক কিশোরীকে দিয়ে এই বইয়ের গল্পের শুরু। শেষটা যদিও অনেক বছর পরে— বিপ্লবদীর্ণ মস্কো থেকে বহুদূরে, প্রকৃতিঘেরা শান্তিনিকেতনে। রুশ ইহুদি মেয়ে কোতিয়া বাংলার জীবনে হয়ে গিয়েছিলেন কেতকী।

কোতিয়া জোনাসের জন্ম ১৯০৭ সালে, মস্কোতে। তাঁর বাবা ছিলেন মস্কো শহরের সফল উকিল। তাঁর বিশাল পসার ছিল সে সময়ে। কিন্তু পেশাগত রমরমা ভাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, শরীরের উপরেও চাপ পড়ছিল। ডাক্তারদের পরামর্শে তাই তিনি সুইৎ‌জ়ারল্যান্ডে একটা ছোট গ্রাম-শহরে একটা পুরনো কনভেন্ট কেনেন এবং সেটাকে ক্রমে একটা বিশাল বাগানবাড়িতে রূপান্তরিত করেন।

আবার এ দিকে বিপ্লবী সময় এসে বালিকা কোতিয়া ও তার পরিবারের জীবনকে একেবারে ওলট-পালট করে দিল। কোতিয়ার বাবা স্থির করলেন, মস্কো ছেড়ে চলে যেতে হবে। প্রায় এক কাপড়ে পুরো পরিবারকে প্রথমে যেতে হয় লিথুয়ানিয়া, এবং তারও পরে অনেক দেশ পেরিয়ে ইউরোপের অন্য এক প্রান্তে সুইৎজ়ারল্যান্ডে এসে পৌঁছন তাঁরা। সেখানেই আরও বেশ কয়েক বছর পর কোতিয়ার পরিচয় হয় এক বাঙালি ছাত্রের সঙ্গে— চিকিৎসাবিদ্যা পড়ছিল সে।

কোতিয়া লিখছেন তাঁর স্মৃতিকথায়— তাঁর বাবার প্রিয়তম লেখক-দার্শনিকের মধ্যে ছিলেন কার্ল মার্ক্স। তা বলে মার্ক্সবাদী বলশেভিক পার্টির বিপ্লবের আগুন তাঁকে ছাড় দেয়নি। যা হোক, এ-ও ঠিক, বিপ্লব হল বলেই হয়তো সুইৎজ়ারল্যান্ডে এক নতুন জীবন শুরু হল রুশ মেয়েটির। আর সেই জীবনেরই একটা অ-দেখা বাঁকে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওই বাঙালি ডাক্তার যুবকটি।

১৯২০-র দশকে, মানে আজ থেকে একশো বছর আগে এক বাঙালি ছাত্র ডাক্তারি পড়তে গিয়েছিলেন, সুইৎজ়ারল্যান্ডের জেনিভাতে। তাঁর নাম নিতাই দে সরকার। আর তত দিনে সুইৎজ়ারল্যান্ডের গ্রামের বিশাল বাগানবাড়ি বিক্রি করে কোতিয়ার মা-বাবাও চলে এসেছিলেন জেনিভাতে। সেখানেই দেখা হয় কোতিয়া আর নিতাইয়ের। নিতাই এর মধ্যে তাঁর চিকিৎসাবিদ্যার পড়াশোনা শেষ করে একটা চাকরিও পেলেন ওর্সিয়ের নামক এক ছোট্ট জায়গায়। যাঁরা সুইৎজ়ারল্যান্ড গেছেন বা সিনেমায় দেখেছেন তাঁরা জানেন, সমগ্র সুইৎজ়ারল্যান্ডই ছোট ছোট সুন্দর গ্রাম-শহরের এক সমাহার। এবং সুইৎজারল্যান্ড চালিত হয় ক্যান্টন নামের গ্রামসভা দিয়ে।

কোতিয়া টু কেতকী: অ্যাট হোম অ্যাওয়ে ফ্রম হোম

কেতকী সরকার, চন্দনা দে

৮০০.০০

রাইটারস’ ওয়ার্কশপ

জেনিভা-ই হোক আর ওর্সিয়ের, কোতিয়া কিন্তু তত দিনে স্থির করে ফেলেছেন, তাঁর জীবনের পরের বড় ‘স্টপ’ হবে কলকাতা। ১৯৩০-এর ১৭ জুলাই— কোতিয়া আর নিতাইকে বিবাহবন্ধনে বেঁধে দেন সুইস দেশেরই এক বিবাহ-নিবন্ধক। কোতিয়া আগে ফেলে এসেছিলেন বিপ্লবদীর্ণ রুশ দেশ, আবার অচিরেই ছেড়ে চলে যাবেন যুদ্ধ-উন্মত্ত ইউরোপকেও। তাঁর নতুন ঠিকানা হয়ে উঠবে কলকাতা মহানগর আর তার অদূরে যুদ্ধদীর্ণ পৃথিবীতে এক কবির কারখানা— বীরভূমের মাটিতে শান্তিনিকেতন।

বিয়ের পর নিতাই আর কোতিয়া অবশ্য সুইস গ্রাম-শহর ওর্সিয়ে-তে দু’বছর বেশ ভালই ছিলেন। তার মধ্যে ইটালিও গিয়েছিলেন, মধুচন্দ্রিমা যাপনে। সুন্দর চলছিল জীবন। কিন্তু মাঝখান থেকে বাদ সাধল সুইস সরকার। কর্তৃপক্ষ সন্দিগ্ধ হলেন, এক ভারতীয় ডাক্তার কেন সুইস গ্রামের চিকিৎসক? ব্রিটিশ চর নয়তো? সুইৎজ়ারল্যান্ডের সরকারের আপত্তিতে বাঙালি ডাক্তার নিতাই দে সরকার আর তাঁর স্ত্রী কোতিয়াকে আবারও ‘দেশ’ ছাড়তে হল। স্বামীর সঙ্গে কোতিয়া পাড়ি দিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘দ্বিতীয় শহর’ কলকাতায়।

আলোচ্য বইটিতে কোতিয়ার স্মৃতিচারণে গত শতাব্দীর ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের কলকাতার টুকরো নানান ছবি উঠে এসেছে। আমরা দেখতে পাই, সে-সময়ের কলকাতাকে শুধু ইংরেজরাই নন, ইউরোপের অন্যান্য দেশ যেমন সুইডেন বা নরওয়ের মানুষও ‘নিজেদের শহর’ করে তুলেছিলেন। কোতিয়া ও নিতাই সে যুগের কলকাতায় ডোভার লেনে মাত্র পঁয়তাল্লিশ টাকায় একটা বাড়ি ভাড়া নেন। রুশ মেয়ের স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে সেই ব্রিটিশ যুগে ক্রমশ জোরালো হয়ে ওঠা ভরাতের স্বাধীনতা আন্দোলনের কথা, মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে আইন অমান্য আন্দোলন এবং পরে ’৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের স্মৃতি। ১৯৪৬-এর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গাও কোতিয়ার শান্ত মনকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল।

কলকাতার অশান্ত সময় থেকে দূরে এক নীড় খুঁজে পেয়েছিলেন কোতিয়া ও নিতাই, শান্তিনিকেতনে তাঁদের নতুন গড়ে ওঠা বাড়ি ‘আকন্দ’র গাছগাছালির মধ্যে। কোতিয়া তাঁর হারানো সুইৎজ়ারল্যান্ডের বাগানবাড়ির খানিক ছায়া নিশ্চয়ই পেয়েছিলেন সেখানে। বইয়ের দ্বিতীয় অংশে কেতকী দে সরকারের নাতনি চন্দনা দে দীর্ঘ এক পরিশিষ্টে ইউরোপ, ইহুদি সমাজ, বিভিন্ন বিখ্যাত ইহুদি পরিবার ও তাদের সঙ্গে কোতিয়ার পরিবারের যোগাযোগ তুলে ধরেছেন। অন্য দিকে, শান্তিনিকেতন ও কলকাতার সমাজের ছবিও এঁকেছেন। দুটো ছবিই খুব বেশি সমাজতাত্ত্বিক; তত্ত্ব ও তথ্যে ভারাক্রান্ত। কোতিয়ার জীবনের, বিশেষ করে বাংলার অংশে যদি ব্যক্তি কেতকীকে, রুশ মেয়ের বাংলার জীবনে নারী-যাপন’সহ নানা মাত্রায় কেতকীর মনকে টুকরো ছবিতে ধরার চেষ্টা করতেন, তা বরং অন্য এক মন-দিগন্ত খুলে দিত। রাজনৈতিক-সামাজিক তথ্যবহুল নিবন্ধে সময় বোঝা যায় নিশ্চয়ই, কিন্তু মানুষের মন অধরা থেকে যায়।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

book review

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy