কুড়িটি গল্পের সঙ্কলন আখ্যান বিংশতি। গল্পগুলি গত দু’বছরে লেখা। কুড়িটি গল্পের মধ্যে চোদ্দোটি বর্তমান সময়ের, বাকি ছ’টি ইতিহাস ও পুরাণ-কালের। তবে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে কালগত দূরত্ব থাকলেও তারা সম্পর্কহীন নয়। বর্তমানের মধ্যে যেমন অতীতের কিছু উপাদান থেকে যায়, যেমনই অতীতের মধ্যে বর্তমানের অংশবিশেষ রক্ষিত থাকে। কবীর জোলা তাঁতঘরে বসে সময়ের সুতোয় কাপড় বুনতে বুনতে বলেছিলেন, বটগাছের যেমন বীজ থাকে তেমন সে বীজের ভিতরে ফল ফুল আর ছায়া থাকে। কবীরের দোঁহার সূত্র ধরে বলতে পারি, অতীতের বিছনে আমাদের বর্তমান শুয়ে-বসে ছিল।
সন্মাত্রানন্দের গল্পে বিষয়গত নানা বৈচিত্র আছে। প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, বৈরাগ্য, খুন থেকে শুরু করে তথাগতের দর্শন-অভিলাষী ক্ষৌরকার উপালি, অসমাপ্ত প্রাচীন পুঁথি ইত্যাদি বিষয় তাঁর গল্পে জায়গা করে নিয়েছে। গল্পের প্রেক্ষিতও বেশ বিস্তৃত। গ্রাম, নগর, মহানগরের পাশাপাশি পটভূমি হয়ে উঠেছে দূর অতীতের বনভূমি ও জনপদ। বর্ণনার গুণে অধিকাংশ গল্প সহজেই পাঠকের মন টানে। পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা তাঁর কাহিনি বিবরণের বৈশিষ্ট্য। এই বিবরণ থেকে এক ধরনের দৃশ্যময়তা তৈরি হয়। ‘খণ্ডিত পুথি’ গল্পে রয়েছে, “প্রদীপের ম্লান আলো পুথির হলুদ হয়ে যাওয়া ভূর্জপত্রের ওপর তির্যকভাবে এসে পড়ছিল। অপরিচিত সিদ্ধমাতৃকা লিপির সব বিবর্ণ অক্ষর। থাইমল, মেন্থল আর অনেকটা ভেজা মাটির গন্ধ যেন পুথির পাতায় পাতায়।” এ বিবরণ শুধু চোখ টানে না, অন্য ইন্দ্রিয়গুলিকেও সজাগ করে। বুঝিয়ে দেওয়া কথাকারের কাজ নয়। ভ্রমণ সহায়কের মতো প্রাচীন প্রাসাদে ঢুকে অতীতে পৌঁছে দিতে হয়, শুনিয়ে দিতে হয় জলসাঘরের নর্তকীর পায়েলের শব্দ ।
গল্পগুলির অন্য একটি বৈশিষ্ট্য হল প্রকৃতির আকর্ষণীয় বর্ণনা। বাংলা সাহিত্যে যা এখন খুব কমই মেলে। শহর এবং গ্রামে এখন গাছপালা ও জলাভূমি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। কথাসাহিত্য থেকেও প্রকৃতি ক্রমশ অবলুপ্ত হচ্ছে। এমন এক পরিবেশ-আকাল সময়ে সন্মাত্রানন্দ মানুষের কথার পাশাপাশি গাছ ফুল ফল, আকাশ মেঘ বৃষ্টি, পশুপাখি ও পতঙ্গের বিবরণ দিয়েছেন। মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত সম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন। যেমন ‘বিদুর প্রামাণিকের পরিণাম’ গল্পে অগোছালো গেরস্তালির বারান্দার জং-ধরা গ্রিলের ফাঁক দিয়ে আমগাছের ডাল ঢুকে পড়েছে। ‘রূপান্তর’ গল্পে আকাশপথে উড়ে যাওয়া পাখিদের টিহিটি টিহিটি ডাক নেমে আসছে পৃথিবীর উপর। ‘নিগূঢ় রুকাইয়া’ গল্পে নদীর স্রোতের বুকে চাঁদের কিরণ রুপোর পাতের মতো চকচক করে। ‘উপনিষদের কবি’ গল্পে নগরীর প্রাকার পেরোলে চোখে পড়ে খেত মাঠ নদী ঘাট গ্রাম আর ‘সবুজ আঁধার করা সব মায়াবী বনভূমি’। মাতলা নদীর স্রোতে ভেসে চলা নৌকা থেকে বর্ণনা করা হয়েছে আকাশ ও দু’পাশের দৃশ্য, ‘মাটির গন্ধ’ গল্পে। সেখানে বিস্তৃত বর্ণনার একটি বাক্য হল, “আকাশ পরিষ্কার নীল, তাতে অপরাহ্নের অস্তরাগ— যেন খড়মাটি দিয়ে মাজা তামার কলস।”
আর একটি বিষয়ও সন্মাত্রানন্দের নানা গল্পে আসা-যাওয়া করে। সেটি হল জীবনজিজ্ঞাসা। উনিশ ও বিশ শতকে বঙ্কিমচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র এবং পরবর্তী সময়ে বিভূতিভূষণ তারাশঙ্কর ও মানিককে ভাবিয়েছিল— এই জীবনকে নিয়ে কী করতে হয়। বিগত সাত-আট দশকে, নানা সমস্যার কারণে, বাঁচার চেয়ে টিকে থাকার সমস্যা বেশি ভাবিয়েছে। কথাসাহিত্যও নিত্যদিনের সমস্যা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থেকেছে। আখ্যান বিংশতি-র লেখক যৌবনে নাম ও পোশাক বদলে বড় জীবনের স্বপ্নে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তার টানেই হয়তো নানা কাহিনিতে অল্প সুখের পরিবর্তে বৃহৎ আনন্দের কথা এসেছে। ‘উপালি’ গল্পের উপালি, ‘খণ্ডিত পুথি’ গল্পের ত্রিবেদী ব্রাহ্মণ মঞ্জুবাক, ‘রূপান্তর’ গল্পের ময়ূরাক্ষী, ‘উপনিষদের কবি’ গল্পের স্রোতাক্ষী সন্ধান করেছে বড় কিছুর। সততা ও শ্রমকে অবলম্বন করে পেয়েছেও। পুরাণ ও ইতিহাসনির্ভর এ ধরনের গল্পে সন্মাত্রানন্দ বিশেষ সফলও। এর বিপরীতে এই সময়ের যে-সব সামাজিক গল্প সেখানে তিনি কিছুটা সরল ও একমাত্রিক, হয়তো পারিবারিক ও সামাজিক জীবন থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকার কারণে।
আখ্যান বিংশতি, শ্রীগদ্যশরীর
সন্মাত্রানন্দ
৩৭৫.০০, ৩৫০.০০
ধানসিড়ি
শ্রীগদ্যশরীর কুড়িটি প্রবন্ধের সঙ্কলন। সাহিত্য ইতিহাস দর্শন লোককথা ও মহাজীবন, এই পাঁচটি বিষয়কে কেন্দ্র করে চারটি করে লেখা। প্রথম লেখাটিতে আছে ত্রিপুরার একটি মঠে সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করার সময় তিনি কেমন ভাবে অতীশ দীপঙ্করের জীবনের রহস্যে আলোড়িত হন আর কী ভাবে নানা তথ্য ও সত্যের সন্ধান পান। এ সবের উপর ভিত্তি করেই লেখেন নাস্তিক পণ্ডিতের ভিটা উপন্যাসটি। পরের লেখা ‘ত্রিপুরেশ্বরী ও ত্রিপুরার মন্দির’। এখানে ত্রিপুরার শ-আষ্টেক বছরের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের প্রাথমিক পরিচয় মেলে। একই সঙ্গে জানা যায় আলুলায়িতকুন্তলা এক বিগ্রহের ত্রিপুরেশ্বরী হিসেবে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কথা। ‘সত্যকাম’ লেখাটিতে রয়েছে বালক সত্যকামের জীবন ও জগৎ-সত্য উপলব্ধির প্রসঙ্গ; ‘চর্যাপদে কৃষিজীবনের চিহ্ন’-এ সাধারণ কৃষকদের যাপনচিত্র।
দ্বিতীয় প্রবন্ধগুচ্ছের প্রথমটিতে আলোচনা করেছেন ভারতের তিন অবক্ষয়ের কালে রামচন্দ্র, গৌতম বুদ্ধ ও শ্রীচৈতন্য আবির্ভূত হয়ে কেমন ভাবে মানুষকে আত্ম-জাগরণের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন। দ্বিতীয় প্রবন্ধ জীবনানন্দ দাশের ‘কমলালেবু’ কবিতার নিবিড় পাঠ। পরের লেখা ‘গদ্যের গল্পগাথা’তে প্রশ্ন রেখেছেন, প্রকৃত ভাল লেখা বিশেষ কিছু বলার তাড়া থেকে তৈরি হতে পারে কি না! তাঁর মত, ‘আমি’র যে বিচিত্র পরিচয় তাঁকে আবিষ্কারই লেখকের প্রকৃত কাজ। পরের প্রবন্ধ ‘মৈত্রেয় জাতক: পুনর্মননজাত অনুভব’। নামেই আলোচ্য বিষয়টি বোঝা যায়। তথাগত জীবনের শেষ সময়ে বলেছিলেন, পাঁচ হাজার বছর পরে মৈত্রেয় জাতক নামে আবার এক জন বুদ্ধ আসবেন। সন্মাত্রানন্দ লিখেছেন, অনাগত কালের সেই মৈত্রেয় জাতক বা মৈত্রেয়ী জাতিকার অপেক্ষায় আমরা নিষ্পলক চেয়ে থাকি।
তৃতীয় পর্বের চারটি প্রবন্ধের প্রথমটিতে ছোট কবিতার ঐশ্বর্য বিষয়ে জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে, শঙ্খ ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জয় গোস্বামী, ভাস্কর চক্রবর্তী প্রমুখের কবিতার আলোচনা রয়েছে। বাংলা ভাষার রূপান্তর বিষয়ে দ্বিতীয় প্রবন্ধটি। রবীন্দ্রনাথের ‘সুভা’ গল্পটিকে কেন্দ্র করে শব্দের সীমা ও নৈঃশব্দ্যের অসীমতা নিয়ে লিখেছেন পরের লেখাটি। চতুর্থ প্রবন্ধের বিষয় ১৮৯৬ সালে নিউ ইয়র্কে বুদ্ধকে নিয়ে মঞ্চস্থ ফরাসি নাটক ইৎশীল। চতুর্থ ও পঞ্চম পর্বের আলোচনায় জীবনানন্দের ছায়াশরীরিণী নায়িকা, বিভূতিভূষণের ইতিহাস-কেন্দ্রিক আখ্যান ইত্যাদি বিষয় এবং সারদা দেবী, সান্টা ক্লজ়, জোসিয়া জন গুডউইন প্রমুখ ব্যক্তিত্বের প্রসঙ্গ এসেছে। কোনও লেখায় সাহিত্যের সংবেদী পাঠ মিলেছে, কোথাও বিশিষ্ট কিছু ব্যক্তিত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
কুড়িটি প্রবন্ধের সবগুলি সমান মাপের নয়, সমান মানেরও নয়। কিন্তু প্রতিটি লেখার মধ্যে যুক্তির পরম্পরা আছে, আর লেখকের নিজের বিশ্বাস মিশে রয়েছে আলোচিত বিষয়ের মধ্যে। সব ভাবনার সঙ্গে একমত হয়তো হওয়া যাবে না, কিন্তু লেখার প্রসাদগুণে সবগুলি প্রবন্ধই স্বচ্ছন্দে শেষ পর্যন্ত পড়ে ফেলা যায়। পাঠক হিসেবে এও তো কম প্রাপ্তি নয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)