E-Paper

কবিতায় চিন্তার পূর্ণাঙ্গ শরীর

নিঃশব্দের তর্জনী-র ভূমিকায় শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, “কবিতা হিসেবে আস্বাদনের জন্যে আমরা অপেক্ষা করি তার রূপের, তার প্রকাশের।”

অভিরূপ মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০৬

সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন রাহুল পুরকায়স্থ। তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ লেখাগুলি আমাকেই বলে-র ৭ নং কবিতায় রাহুল লিখছেন, “তোমার শরীরাভাসে সারি সারি গ্রন্থ শুয়ে আছে”। অজস্র গ্রন্থ যে শরীরে ভাসমান, সে কার শরীর? এক জন কবির? দেহ-ধারণাকে যদি বিস্তৃতি দিই, দেখব, এক জন লেখকের রচনার সমগ্রতাই আসলে তাঁর চিন্তার পূর্ণাঙ্গ শরীর! কবিতাটি জানায়, “শোনো, গোপনে বইয়ের তাকে/ কীটনাশকের পাশে/ আমার সরল মতি সতর্কে রেখেছি/… তাকে তুমি নশ্বরতা দিয়ো, দিয়ো হিমস্রোত, প্রণয়তাম্বুল/ শহরতলিতে দিয়ো গ্রামের শোলক/ দিয়ো বাঘনখ/ পুস্তক নিরীহ অতি, তাকে দিয়ো অগোচর/ ভয়ের মুখোশ, দিয়ো পুত্রশোক”। এখানে গুরুত্বপূর্ণ, ‘আমার সরল মতি’ লাইনটি। নশ্বরতা, প্রণয়তাম্বুল, শহরে গ্রামের শোলক, বাঘনখ— জীবন যে যে অনুভূতির মধ্যে দিয়ে হেঁটে এসেছে, কবির ‘সরল মতি’ তাকেই মনে করে নিচ্ছে আর এক বার! সঙ্গে রাখছে, ‘অগোচর’ অর্থাৎ প্রচ্ছন্নতার স্বাধীনতাকে। জীবনের শেষ সাক্ষাৎকারে রাহুল স্বীকার করেছিলেন, “আমি সংকেতের সঙ্গে ঘর করতে ভালবাসি।” সেই সঙ্কেতধর্মকে সঙ্গে নিয়ে কবিতাটি সম্পূর্ণ হল ‘পুত্রশোক’ শব্দটির কাছে পৌঁছে। ৮ নং কবিতায় রাহুল লিখছেন, “ছেলে চলে গেছে দূরে/ তার গন্ধখানি ফেলে গেছে/ সেই গন্ধ খেয়ে বেঁচে আছি!”

লেখাগুলি আমাকেই বলে

রাহুল পুরকায়স্থ

১৭৫.০০

মাস্তুল

অনেক আশ্চর্য কবিতা-পঙ্‌ক্তিতে এ-বই পরিপূর্ণ। যেমন, “সময় আহত পক্ষী, মাথার ভিতরে আজ ভয় খুঁটে খায়”, “আমার সময় বেশি নেই/ ইঁদুর কেটেছে কিছু, খানিকটা নেশা/ ভালবেসে বেসে আমি খেয়েছি কিছুটা”। ৩৫ সংখ্যক কবিতার সাতটি অংশে বারংবার ‘আনোয়ার’ নামক এক চরিত্রের সঙ্গে ব্যক্তিগত সংলাপ। যেমন, “আমি তো লিখতে চেয়েছিলাম জলে, আর সেই জল এখন মিশে যাচ্ছে আমারই রক্তে। আমি কি আমার রক্তে, জলরক্তে, রক্তজলে সাঁতার কাটব আনোয়ার!” একটি সাক্ষাৎকারে রাহুল বলেছিলেন, “আনোয়ার আমার সত্তার দ্বিখণ্ডিত অংশ, যাকে নগ্ন সত্যিগুলি বলতে চাই।” সেই সাক্ষাৎকারেই বলেছিলেন, “আমার প্রত্যেক সপ্তাহে ডায়লেসিস হয়। আমার রক্তে জল মিশে আছে। সেই রক্তজল আমার লেখায় ঢুকেছে।” আজীবন মিশ্রকলাবৃত্ত ছন্দ, রাহুল পুরকায়স্থের চিন্তাস্বর সর্বাধিক ধারণ করেছিল, এ-বইও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বীকারোক্তিময় ও সঙ্কেতধর্মী কবিতার পথ থেকে কখনও বিচ্যুত হননি রাহুল, লেখাগুলি আমাকেই বলে তার শেষ আলোকোজ্জ্বল উদাহরণ!

খিদে হাতে হেঁটেছি অনেক

অভীক মজুমদার

২০০.০০

দে’জ়

নিঃশব্দের তর্জনী-র ভূমিকায় শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, “কবিতা হিসেবে আস্বাদনের জন্যে আমরা অপেক্ষা করি তার রূপের, তার প্রকাশের।” অভীক মজুমদারের খিদে হাতে হেঁটেছি অনেক কবিতাগ্রন্থটি তেমনই একটি বই, যা পড়ার পাশাপাশি, বিস্মিত হয়ে দেখতেও হয়। পাগলের সঙ্গ করো, শান্তিনিকেতন, আগুনের রোয়াব এই কাব্যগ্রন্থগুলিতেও আঙ্গিক সম্পর্কে পরীক্ষা-ভাবুক অভীককে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু পূর্বের সমস্ত বইয়ের থেকে ভিন্ন পথে, বিপুল ভাঙচুর নিয়ে উপস্থিত হয়েছে এই কাব্যগ্রন্থ। ‘আত্মপক্ষ’-এ অভীক জানাচ্ছেন, “এই সংকলনের বেশ কয়েকটি কবিতায় সরাসরি প্রবেশ করেছে অন্যান্য রচনা। সচেতনে-অবচেতনে।” যেমন, ২২ সংখ্যক কবিতাটি শুরুতেই জানায়, “অপমান ভাবলে শুধু রবি ঠাকুরের একা চেয়ে থাকা।” কবির নিজস্ব চিন্তার সঙ্গেই কবিতাটির সপ্তম ও অষ্টম লাইনের মধ্য বিভাজন-রেখার ভিতর অভীক ডেকে এনেছেন রবীন্দ্রনাথের এই পত্র-বক্তব্য, “…বাংলাদেশে আমাকে অপমানিত করা যত নিরাপদ এমন আর কাউকে দেখি না।” এর পর আবার চলতে থাকছে কবিতা। ফলে, ধসে পড়ছে কাব্যের প্রচলিত ভাষা ও রূপ। এবং রবীন্দ্রনাথের অভিজ্ঞতার যৌথ সম্মিলনে তৈরি হয়ে উঠছে নতুন এক কবিতাচিত্র। ৬০ সংখ্যক কবিতার “বারংবার বারংবার, জড়িয়ে ধরে অন্ধকার/ হিরণ্ময়/ যদি হঠাৎ উধাও ছাত শূন্যজুড়ে তারাপ্রপাত/ ম্যাজিক হয়” লাইনটিতে ‘বারংবার’, ‘বারংবার’, ‘অন্ধকার’ এবং ‘হঠাৎ’, ‘ছাত’, ‘তারাপ্রপাত’-এর ‘র’ ধ্বনি ও ‘ত’ ধ্বনির আছড়ে পড়া শব্দ-ঝংকারকে ধরে রাখছে ‘হিরণ্ময়’ ও ‘ম্যাজিক হয়’ কথাগুলি। কবিতার সূক্ষ্ম আঙ্গিক সম্পর্কে লাইনগুলির পাশেই রেখা-বিভাজনে রয়েছে এই গদ্য, “‘বক্রোক্তিজীবিত’ গ্রন্থে বলা আছে অর্থ আর ধ্বনিরূপ যেন দুই মহারথীর খড়্গপাশ পরস্পর স্পর্ধিত, একে-অন্যকে পরাভূত করতে মত্ত।”

শ্রেষ্ঠ কবিতা

অগ্নি রায়

৩৯৯.০০

দে’জ়

এ-বইয়ে লালন, শঙ্খ ঘোষ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়-সহ আরও অনেকের রচনা কবির চিন্তাগন্তব্যের সহযোগী হয়ে উঠেছে। কবিতার ছন্দোরূপ, প্রকৃতি এবং প্রবন্ধের ভাষা এ-কাব্যগ্রন্থে একাকার করে দিয়েছেন অভীক। ১৯ সংখ্যক কবিতায় নিজেই বলেছেন, “রেখেছি মনের মধ্যে/ কিছু গদ্যে কিছু পদ্যে/ আলতুফালতু কথা”। এই ‘আলতুফালতু কথা’-ই নতুন এক ভাষা-জগৎ, খিদে হাতে হেঁটেছি অনেক গ্রন্থে যা ঝড়ের গতিতে ভেঙে দিতে চায় বাংলা কবিতার সমস্ত পরিচিত অবয়বকে।

নব্বই দশক থেকে কবিতা লিখছেন অগ্নি রায়। তাঁর কবিতা একই সঙ্গে তীক্ষ্ণ অথচ সহজ ভাষার পক্ষপাতী। কিন্তু সেই সহজ-শব্দ-সুড়ঙ্গে লুকিয়ে থাকে বর্ণনাতীত অনুভূতি। তাঁর সূর্যাস্তের সঙ্গদোষ-এর ‘ওয়াগন ব্রেকার’ কবিতাটি জানায়, “বাজপড়া ঘাস আঁকড়ে/ নিরক্ষর বিরহীর মতো/ ছন্নছাড়া ভাবে/ যে ওয়াগনটি দাঁড়িয়ে আছে/ তার কাছে গিয়ে/ দুঃসংবাদগুলি জেনে আসা যায়/ যেসব সমাচার দিনের আলোয়/ হেলাফেলায় পড়ে থাকে।” রাতে একা দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াগন ব্রেকারের সঙ্গে নিরক্ষর বিরহীর তুলনা আশ্চর্য করে দেয়। জর্দা বসন্ত-এর ‘মল্লার’ কবিতার ৩ নং অংশে অগ্নি লিখছেন, “একটির সঙ্গে অন্য বিদ্যুৎরেখার ভাবভালবাসা হয় না কোনওদিন। অথচ একই আকাশে তাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং ফুরিয়ে যাওয়া”। ‘প্রেম’ কথাটিকে না রেখে ‘ভাবভালবাসা’ কথাটিকে রাখলেন অগ্নি, তাঁর ফলে ‘বিদ্যুৎ’ কথাটির আকাশগরিমা যেন নেমে এল আমাদের দৈনন্দিন বাঁচার ভিতর! শিস কাটছে অহিফেন বইয়ের একটি কবিতায় রয়েছে এই মুহূর্ত-গল্প, “দোকানে গিয়ে মেয়েটি দাম জানতে চাইল। ছেলেটি জানতে চাইল ভঙ্গুরতার কথা। বিস্মিত দোকানি জানায়, ভাঙবে না, এতই টেঁকসই! শুনে ওরা যুগপৎ বেরিয়ে আসে। কাচের চুড়ির দোকানটিতে একটুকরো হাসি কিছুক্ষণ লেগে থাকে শেষ বিকেলের আলোর মতো”। দেখার অভিনবত্ব, অগ্নি রায়ের কবিতার সম্পদ। সেই সম্পদের ধারাবাহিক স্রোত খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা-র বইটিতে।

কবিতাসমগ্র

প্রত্যুষপ্রসূন ঘোষ

৫০০.০০

আলোপৃথিবী

জলছবি, বৃত্তে বাঁধো ক্রীতদাসী, সুজাতা ও ফিঙ্গারফিশ, মেগালোপলিসের পাখি, পোড়া তামাকের গন্ধ, বৃহন্নলা জাগো, অস্তসূর্য রুবিক কিউব— সাতটি বই ও কিছু অগ্রন্থিত কবিতা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রত্যুষপ্রসূন ঘোষের কবিতাসমগ্র। ষাটের দশক থেকে কবিতা লিখছেন প্রত্যুষপ্রসূন। একটি কবিতায় লিখছেন, “মেঘলা দিনে হঠাৎ শুকিয়ে যাওয়া শাড়ির মতো/ শার্টের ইস্ত্রির মতো সোজা মন।” সেই সোজাসহজ মনের প্রত্যক্ষ কবিতাদৃষ্টি এ-গ্রন্থে ধরে রেখেছে এক দীর্ঘ সময়চিত্র। তাঁর মতো প্রবীণ কবির কবিতাসমগ্র প্রকাশের জন্য প্রকাশকের কৃতজ্ঞতা প্রাপ্য!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Poem book review

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy