E-Paper

মেয়েদের মন আর মনের স্বাস্থ্য

খেপি, পাগলি, উন্মাদ, ডাইনি— কত নামেই না ডাকা হয়েছিল মেয়েটিকে। ডেকেছে বাইরের কৌতূহলী ভিড়, একা মেয়ের যুক্তিহীন আচরণ যাদের এনে জড়ো করেছে। কিন্তু প্রিয়জন যাঁরা, তাঁরাও কি সব সময় এই মেয়েদের বোঝেন?

পৌলমী দাস চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ ০৭:২৩

তাজমহলের বাইরের দরজায় দাঁড়িয়েছিল মেয়েটি। দৃষ্টি আনত, চোখ-উপচে নামা জলে ধুয়ে যাচ্ছে মুখ। তাকে ঘিরে ধরা কৌতূহলী মানুষদের বৃত্তটি ছুড়ে দিচ্ছিল টুকরো মন্তব্য, হাসছিল, বেপরোয়া কয়েক জন রাস্তা থেকে পাথরের টুকরো কুড়িয়ে তার দিকে তাকও করছিল। তখনই লম্বা, সম্ভ্রান্ত চেহারার মানুষটি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া মেয়েটিকে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, সে কাঁদছে কেন।

অনুরাধা সোভানি অনূদিত, কমলা বিষ্ণু টিলকের ‘তাজমহল’ গল্পটি এর পর অন্য বাঁক নেয়। রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকা অপরিচিতাকে দেখে যে সমাজ নীরব উপেক্ষা, তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ, লোভাতুর চাউনি ছুড়ে দিতেই অভ্যস্ত, সেখানে সেই মানুষটি শুধু এগিয়েই আসেননি, মেয়েটি তাজমহল দেখতে চায় কিন্তু একা ঢুকতে পারছে না জেনে তাকে সঙ্গও দেন। তাজমহলের কোণের একটি মিনারের চূড়ায় ওঠার পর যখন সূর্যাস্তের মায়াবি রঙে ধুয়ে যাচ্ছে বিশ্বখ্যাত শ্বেতপাথরের গম্বুজ, যমুনার কালো জলে তার প্রতিফলন— সেই অপার্থিব মুহূর্তে মেয়েটি বলে ওঠে, এটাই তো তাদের দু’জনের শপথ বিনিময়ের সেরা সময়। তার ব্যবহারে, অপ্রত্যাশিত দাবি শুনে সহৃদয় মানুষটিও চমকে ওঠেন, বলে ফেলেন, ‘পাগল নাকি মেয়েটা?’ গল্পের পরের অংশ জুড়ে ঘুরপাক খায় কেবল এক কাতর, যন্ত্রণামাখা প্রশ্ন— আমাকে প্রত্যাখ্যানই যদি করবে, তবে এখানে নিয়ে এলে কেন? মেয়েটির অন্তিম পরিণতি আর দেখা হয়নি তাঁর। এগিয়ে আসা ভিড়ের মুখ থেকে শুনে, চোখের জলের ফোঁটাটুকু মুছে তাজমহল ছেড়েছিলেন তিনি।

ব্যান্ডেজড মোমেন্টস: স্টোরিজ় অব মেন্টাল হেলথ বাই উইমেন রাইটারস ফ্রম ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস

সম্পা: নবনীতা সেনগুপ্ত, নিশি পুলুগুর্থা

৪৯৯.০০

নিয়োগী বুকস

খেপি, পাগলি, উন্মাদ, ডাইনি— কত নামেই না ডাকা হয়েছিল মেয়েটিকে। ডেকেছে বাইরের কৌতূহলী ভিড়, একা মেয়ের যুক্তিহীন আচরণ যাদের এনে জড়ো করেছে। কিন্তু প্রিয়জন যাঁরা, তাঁরাও কি সব সময় এই মেয়েদের বোঝেন? ভারতের মতো দেশে নির্যাতন, দারিদ্র, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ও হরমোনের ওঠাপড়া, রজস্বলা হওয়া থেকে শুরু করে তার নিবৃত্তি পর্যন্ত সময়ে মেয়েদের একটা বড় অংশকে ঠেলে দেয় মানসিক অ-সুখের দিকে। অথচ, সেই পর্বে মেয়েদের অধিকাংশই প্রিয়জনের কাছ থেকে সামান্যতম সাহায্য, সহানুভূতিটুকুও পান না। হয় তাঁদের নিয়ে মশকরা করা হয়, নয়তো তাঁরা হন শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার। নবনীতা সেনগুপ্ত অনূদিত, সেবন্তী ঘোষের ‘স্টোরি অব লাফটার’-এ মন-চিকিৎসকের কথোপকথনে খুলে যায় মেঘনার বিবাহিত জীবনের এক-একটা পাতা। স্বামী-স্ত্রীর স্মৃতিমধুর মুহূর্তগুলি মনে করা প্রসঙ্গে মেঘনা ‘মজার ঘটনা’ হিসেবে এমন সব বিবরণ শুনিয়ে চলে, যার মধ্য দিয়ে এক ভিতু, শান্ত মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে, স্বামীর হাতে প্রতিনিয়ত হেনস্থার ছবিটি ফুটে ওঠে।

মানসিক সমস্যার অজুহাতে মেয়েদের ঘর থেকে বার করে দেওয়ার উদাহরণ তো অগুনতি। নিশি পুলুগুর্থা অনূদিত তৃষ্ণা বসাকের ‘বর্ডারলাইন’ গল্পে জবার চরিত্রটি বহু ঝড়ঝাপটা সহ্য করা প্রভাসের জীবনে এসেছিল শান্তির বাতাস নিয়ে। দুই সন্তান, সংসার নিয়ে ভরপুর জীবন। তার পরই শুরু হয় জবার অদ্ভুত আচরণ। একটা চামচ দশ বার ধুয়ে চলা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চাল ধোয়া, সব ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলা। ক্লান্ত, বিরক্ত প্রভাস বার করে দেয় জবাকে, পাঠিয়ে দেয় তার মা, ভাইয়ের কাছে। হুমকি দেয়, ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ফিরিয়ে আনবে না তাকে। পরে ‘জবা ভাল হয়ে গিয়েছে’ জেনে তাকে ফিরিয়ে আনতে যায় প্রভাস: লাল-হলুদ তাঁতের শাড়ি পরা, মিষ্টির থালা-হাতে জবা, সন্তানদের খোঁজ নেওয়া জবা, প্রভাসকে আদা-চা করে দিতে চাওয়া জবা, এমনকি রাতে বহু বছর পর এক বিছানায় শুতে আসা জবা— সব কিছুই ছিল স্বাভাবিক, ঠিক আগের মতো। অনেক রাতে আবছা চাঁদের আলোয় ভাসা উঠোনে জবাকে আবিষ্কার করে প্রভাস, কুয়ো থেকে বালতি-ভর্তি জল নিয়ে স্নান করছে সে। গায়ে এক টুকরো সুতোও নেই।

১৭টি ভারতীয় ভাষায় লেখা এমনই ২৬টি গল্প, বইটিতে। প্যারানইয়া, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজ়অর্ডার, অ্যাংজ়াইটি, প্যানিক অ্যাটাক, স্কিজ়োফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজ়অর্ডার... প্রত্যেকটির অর্থ, লক্ষণ আলাদা, চিকিৎসা পদ্ধতিও। কিন্তু সমাজ এখনও, অনেক ক্ষেত্রেই নিজের মতো করে তাকে ব্যাখ্যা করে। কখনও বলে বাতিক, ‘বিয়ে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে’, কখনও ‘বাচ্চা হোক, স্বাভাবিক হয়ে যাবে’। এই প্রবল অজ্ঞতা যে সমাজকে ঘিরে থাকে সারা ক্ষণ, সেখানে শুধুই মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত, তা-ও আবার মেয়েদের লেখা একগুচ্ছ গল্প নিয়ে বই বার করা সহজ কথা নয়। সম্পাদকদের কাজটি তাই সহজ ছিল না। ভূমিকায় তাঁরা লিখেওছেন, গল্প বাছাই-পর্বে তাঁদের সমস্যায় পড়তে হয়েছিল, কারণ সচেতনতার অভাব থাকায় অনেক সময়ই শারীরিক নির্যাতন বা মেয়েদের বঞ্চনার কাহিনিও মানসিক স্বাস্থ্যের পর্যায়ভুক্ত করা হত। সে সব সমস্যা পেরিয়ে গল্পগুলি সংগ্রহ ও অনুবাদ করে, যত্নে সাজিয়ে তৈরি হয়েছে এই বই। এমন নয় যে, মানসিক স্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে এর আগে কোনও লেখা হয়নি। তা সত্ত্বেও বইটি জরুরি: ভারতের মতো দেশে মেয়েদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি সব সময়ই পিছনের সারিতে, মানসিক স্বাস্থ্য তো বটেই। এমন এক সংবেদনশীল ক্ষেত্রকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা মেয়েরা কোন চোখে দেখেন, কেমন ভাবে তা নিজেদের লেখায় ফুটিয়ে তোলেন, তার সযত্ন সন্ধান প্রয়োজন ছিল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

book review Women Health Mental Health

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy