প্রতিভা সরকারের আঠারোটি ছোটগল্পের সঙ্কলন এই বইটি। প্রত্যেকটি গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের আটটি পৃথক রাজ্যের মাটি-জল-হাওয়া। যেমন, পঞ্জাবের ভূ-পরিসরে লেখা ‘আত্মীয়-স্বজন’ গল্পটির সূচনায় দেখা যায়, এক দল জংলি শুয়োর দ্রুতগতিতে জঙ্গল ছেড়ে ছুটে আসছে। মানুষ কেটে ফেলছে গাছপালা। বুজিয়ে ফেলছে গর্ত। গৃহহারা উন্মাদ বুনো শুয়োরের দল আর ‘আত্মীয়-স্বজন’এর অন্যতম প্রধান চরিত্র ল্যাংড়া গুলাবকে একই সঙ্গে এই গল্পে হাজির করেন লেখক। আর, গুলাব নামের চরিত্রটির মধ্য দিয়েই আমরা দেখতে পাই সখিনাকে— যার ডাকে জঙ্গলের সব পশুপাখি বন্ধুর মতো সাড়া দেয়। সখিনা মনে করে, “এই জঙ্গল হামার, জল হামার, জমিন ভি হামার, কিন্তু মনে রেখো ভাইসব,… যারা আমাদের দিয়েছে পবিত্র আগুনের খোঁজ, সেই ঈগল, সেই ভালু, সেই হিরন, চিতা, মছলি আর পাখপাখালিরাও এই জল-জঙ্গল-জমিনের সমান দাবিদার।”
শুধু মানুষ নয়, পৃথিবীর উপরে সমস্ত প্রাণীর রয়েছে সমানাধিকার, এ কোনও নতুন ভাবনা নয়। নতুন হল সখিনার নিজেকে ও চার পাশের সমস্ত জীবন্ত অস্তিত্বকে দেখার মন। যে-মাছ জালে ধরা পড়ল এইমাত্র, যে-হরিণ শিকারির সামনে দৌড়ে এল, তা তাদের মৃত্যুনিয়তি নয়। বরং সখিনার মতে, “ওরা ইচ্ছে করে নিজেদের ‘হত’ হতে দিয়েছে।” এর কারণ কী? গল্পটি জানায়, “যেই তিরবেঁধা হরিণের চামড়া ছাড়ানো হয়, বা জালে পড়া মাছের আঁশ, অমনি নাকি তাদের ভেতর থেকে উজ্জ্বল আলোর মতো এক আঙুল সমান আত্মা বেরিয়ে আসে, কুপির শিখার মতো কাঁপতে-কাঁপতে খুঁটিয়ে দেখে মানুষের ঘরদুয়ার।” শেষে, সেই আলোর টুকরোরা ফিরে যায় জঙ্গলে, নদীর গভীরে। নিজের প্রাণিজন্মে ফিরে, জ্ঞাতিভাইদের মানুষের ঘরে ‘মেহমান’ হওয়ার অভিজ্ঞতা শোনায় তখন তারা।
রূপকথার আবহকে অতুলনীয় ভাবে প্রতিস্থাপন করে গল্পকার এই অনুচ্ছেদটি সম্পূর্ণ করেছেন এই ভাবে, “তাই শিকারি যখন তির ছুঁড়বে তার আঙুলে যেন জড়ানো থাকে শ্রদ্ধাবোধ আর কৃতজ্ঞতা! তার থেকে বেশি আর কে জানে এই আত্মীয়বধের অনন্যোপায় অসহায়তা!” লক্ষণীয়, ‘বোধ’ আর ‘বধ’ শব্দ দু’টিকে পর পর দু’টি লাইনে ব্যবহার করলেন প্রতিভা, এবং তার মধ্যে দিয়ে চলাচলে জাগিয়ে রাখলেন ‘আত্মীয়’ শব্দটিকে।
পশুরা কি সন্দেহ করতে পারে? না। মানুষ পারে। গুলাবের মধ্যে এই পার্থক্যই ঢেলে দিয়েছেন লেখক। সে অন্য পুরুষের সঙ্গে সখিনাকে সন্দেহ করে। সখিনা কিন্তু প্রকৃতির অন্যান্য জীবের মতো একই রকম আছে। সে ছাড়া গুলাবের কেউ নেই। কিন্তু সেই একমাত্র আত্মীয়কে গুলাব ‘বোধ’ নয়, সন্দেহ-গ্রস্ত হয়ে বধের দৃষ্টিতে দেখেছে। এই সন্দেহই সমাজনির্ভর মানুষের অনন্যোপায় অসহায়তা। যার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আছে সখিনা, প্রকৃতির মতোই স্বাধীন।
‘হে চিরসারথি’
প্রতিভা সরকার
২২২.০০
গুরুচন্ডা৯
কলকাতা থেকে মুম্বই শহরে চিকিৎসার জন্য আসা রাধুর একাকিত্বে ঘেরা জীবন এবং সেই জীবনের ভিতর তার স্বামীর নয়, কোনও পরিচিত মানুষের নয়, তার ‘নিজের বাড়ি’ খুঁজে পাওয়ার ইচ্ছে— এই সঙ্কলনের ‘ঘরবাড়ি’ নামক গল্পের সম্পদ। রাধুকে মুম্বই আসার জন্য প্লেনের টিকিট কেটে দিয়েছিল তার স্বামী শংকর। তাদের দাম্পত্য অসফল। মনের কোনও সংযোগ সেখানে নেই। রাধুর নতুন প্রতিবেশী তার মতোই একাকী। তার সঙ্গে রাধুর কখনও আলাপ হয়নি। কথা হয়নি। কিন্তু গল্পে হঠাৎই তাদের মধ্যে এক কল্প-সংলাপের আয়োজন দেখতে পাওয়া যায়। জানালায় রাধুর নিঃশব্দ দৃষ্টি বৃদ্ধ প্রতিবেশীকে জিজ্ঞেস করে, “যার সঙ্গে মনের লেনদেন ফুরিয়েছে, তার কাছ থেকে প্লেনের ভাড়া নেওয়ার কোনও মানে হয়?” অপর দিকে, বৃদ্ধের নীরব দৃষ্টির উত্তর এ গল্পের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, সে বলে, “না ম্যাডাম, বেঁচে থাকার জন্য অন্যকে ঠকানো ছাড়া সব জায়েজ। যে দিয়েছে সে করুণা করে দিলেও নিয়ে নিন প্লিজ, আর বেঁচে থাকুন।”
‘বানাবা হুন্নিমে’ অর্থাৎ কার্তিক মাসের পূর্ণিমার আগের দিন আজও কর্নাটকের বহু জায়গাতেই গোপনে ইয়েলাম্মা মন্দিরে মেয়েদের দেবদাসী করা হয়। দেবদাসী কী ভাবে হয়? “ভারী অসুখ হলে, ঝাড়ফুঁকে না সারলে দলিতরা দেবী ইয়ালাম্মার কাছে মনে মনে মানত করে সন্তানকে দান করে দেয়।” পরে তারাই হয় পূজারিদের ভোগ্যবস্তু। বাঙালি সাংবাদিক-বন্ধু অনী-কে তার সহকর্মী বালা জানায় ইয়ালাম্মার ইতিহাস, ‘দেবদাসী’ হওয়ার নিয়মনীতি। কিন্তু বালা এত সব জানল কী করে? ‘দেবদাসী’ গল্পে ঘুমের মধ্যে ভূতে পাওয়া গলায় চিৎকার করে বালা জানায়, “হাউদু, নান্না আম্মা দেভাদাসী” অর্থাৎ “আমার মা একজন দেবদাসী।” এইখানে এসে গল্পটি হাহাকারের সমার্থক হয়।
যে-হেতু বিভিন্ন ভূখণ্ডের বিচিত্র সব পরিবেশের একত্র পরিবেশন এই গল্প-সঙ্কলন, তাই এ-গ্রন্থের গল্পগুলি সহজেই ভিন রাজ্যের বহু শব্দ-তথ্য আমাদের জানাতে থাকে। তবে সেই সব শব্দ-তথ্য, ভিন্ন ডায়লেক্ট, অন্ধতা, অত্যাচার এবং কুসংস্কারকে ছাড়িয়েও এ-বইয়ে কেবলই মূর্ত হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার ইচ্ছে ও তার পরিণাম। নির্জনতা, রহস্য, বিশুদ্ধ দুঃখ এবং জীবনের বাস্তবতাকে ভেঙেচুরে বেরোনোর মতো জাদুসাহস এই বইটির বহু গল্পেরই নিয়ন্ত্রকবিন্দু।
বইটির ভূমিকায় লেখক জানিয়েছিলেন, “স্বভূমিকে যে ভালবাসে,… প্রতিমা গড়ার মাটি আঙুলে ছানতে সে ঘুরে বেড়ায় এই বিরাট দেশের এ-মুড়ো থেকে ও-মুড়ো। তারপর দিনের শেষে দেখে সব মুখ একরকম, সব কান্না লবণাক্ত।” এ কথা ঠিক, এ-গ্রন্থে মাটির পরিবেশ ভিন্ন ভিন্ন হলেও, মনের পরিবেশ সর্বত্র একই।
‘চিরসারথি’ কে, বইটি প্রশ্ন করে অবিরাম। হয়তো এর উত্তর, জীবন!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)