E-Paper

শতজল ঝর্নার ধ্বনি

কালপর্বের বিচারে সে-সময় ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক বিচারপদ্ধতিই ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব চর্চার প্রধান ভরকেন্দ্র। নতুন আত্মপরিচয়ের খোঁজ ও ‘জাতি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের তাগিদ যে আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছিল, ভাষা ছিল তার অন্যতম অবলম্বন।

রাজ্যেশ্বর সিংহ

শেষ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৫
পীঠস্থান: জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি হয়ে ওঠে ভাষাচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

পীঠস্থান: জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি হয়ে ওঠে ভাষাচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

‘কালের অনুক্রমে’ এবং ‘ব্যক্তিত্বের পরম্পরা’য় ঠাকুরবাড়ির ভাষাচর্চার একটা রূপরেখা তৈরির কথাই বইয়ের মুখবন্ধে জানিয়েছেন লেখক। অবশ্য ভাষাচর্চার পরিসরে কী থাকতে পারে সেটা বেশ ধন্দের। যেমন ধরা যাক ঠাকুরবাড়ির সভ্যদের বহু ভাষাচর্চা, অনুবাদ ইত্যাদির সঙ্গে ভাষা বিষয়ক তাঁদের সন্দর্ভকে কি এক ভাবে পড়া যায়? তদুপরি সৃজন-সাহিত্যের শৈলী, ভাষা ব্যবহারকেও যদি এই বৃত্তভুক্ত করে নিই, তা হলে ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম হয় যে, যে কোনও ভাষিক প্রকাশই আসলে ‘ভাষাচর্চা’র পরিধিভুক্ত। এই বইয়ের লেখকের প্রত্যাশাও সে রকম।

এই বইয়ের কেন্দ্রে আছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে ঘিরেই পূর্বভাগ আর উত্তরভাগের কালানুক্রমিক বিন্যাস। পূর্বভাগে রয়েছেন দ্বারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, হেমেন্দ্রনাথ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রবেশক হিসেবে প্রাচীন ভারতীয় ভাষাপ্রস্থান বা উনিশ শতকের আলোচনায় ব্যাকরণের উপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেখান থেকে ‘ঠাকুরবাড়ির ভাষাচর্চা’র একটা অভিমুখ নির্ধারণ হয়ে যাওয়ারই কথা; অথচ বইয়ের পরিকল্পনায় সৃজন-সাহিত্য, অনুবাদ এবং ব্যক্তিবিশেষের পাঠ-প্রতিক্রিয়া, ভাষা বিষয়ে বোঝাপড়া, এত কিছুর মধ্যে ভাষাচর্চার প্রবণতা খোঁজার চেষ্টা পদ্ধতিগত ভাবেই খানিক সমস্যার বলে মনে হয়।

কালপর্বের বিচারে সে-সময় ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক বিচারপদ্ধতিই ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব চর্চার প্রধান ভরকেন্দ্র। নতুন আত্মপরিচয়ের খোঁজ ও ‘জাতি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশের তাগিদ যে আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছিল, ভাষা ছিল তার অন্যতম অবলম্বন। বাংলা ভাষার লিপি সংস্কার, ব্যাকরণ নির্মাণ অথবা বিদেশি বা অন্য ভারতীয় ভাষার সঙ্গে যোগাযোগসূত্রে নানা ভাবে ‘আধুনিকতা’ ও ‘জাতীয়তাবাদ’-এর এক অসহজ সহাবস্থান কি প্রত্যক্ষ করা যায় না? দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রেখাক্ষর বর্ণমালা’ (১৩২৯ বঙ্গাব্দ) বা তুকারামের অভঙ্গ অনুবাদ প্রসঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের ‘শর্ট নোট’, ‘বোম্বাই চিত্র’-এ দু’টি সমান্তরাল ভাষাপ্রসঙ্গ, তুলনামূলক তৌলনচিত্র নির্মাণ ইত্যাদি তারই ইঙ্গিতবহ।

‘সংস্কৃত বাংলা ভাষার জননী’ কথাটার মধ্যে বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক বিবর্তনের খোঁজ যত না ছিল, তার বেশি ছিল একটা পরিচিতি নিরুপণের আকাঙ্ক্ষা। আধুনিক ভাষাতত্ত্ব চর্চা সে-সব নাকচ করলেও বাঙালি বিদ্বৎসমাজের একাংশ আর্যগৌরবের ‘সুবর্ণ অতীত’ অনুসন্ধানের বাসনায় নানা ভাবে ভাষাতিরিক্ত অধিকারের জোরে সংস্কৃত-বাংলার এই সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বাংলা ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণের অভাব বা অন্যভাবে সংস্কৃতায়িত বাংলা ব্যাকরণের ঝোঁক ঘুরেফিরে সে কথার স্বীকৃতি দেয়। পুণ্য পত্রিকায় হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বঙ্গপ্রাকৃত’ লেখাটি এর বিপরীতে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। বিশেষত ‘‌কক্‌নি’ জাতীয় শব্দ সমীক্ষাভুক্ত করে পর্যালোচনা এ-কালের ভাষাতত্ত্ব চর্চার নিরিখে যথেষ্ট আধুনিক বিবেচনা।

ঠাকুরবাড়ির ভাষাচর্চা

দেবাশিস ভৌমিক

৫৭০.০০

লোকসেবা শিবির

রবীন্দ্রনাথের বিবেচনার কেন্দ্রেও ছিল বাংলা ভাষা। ‘বাক্‌পতি রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মূল্যায়ন, “আমার মনে হয় ভাষা সম্বন্ধে এই রহস্যবোধ আর ভাষার ব্যাখ্যার চেষ্টা, এই দুইটির সম্বন্ধে একটি সচেতন ভাব এবং কৌতূহল, তাহার রসরচনা ও ভাষাঘটিত আলোচনা, উভয়ের দ্বারা রবীন্দ্রনাথ আমাদের মনে জাগাইতে সমর্থ হইয়াছেন।” খেয়াল করার বিষয় হল, কথাটা যখন তিনি লিখছেন, তখন মাতৃভাষা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রথম প্রবন্ধ ‘বাংলা উচ্চারণ’-এর প্রকাশকাল সত্তর অতিক্রান্ত। ভাষাচর্চার যে সন্দর্ভ রবীন্দ্রনাথ নিজে প্রস্তাব করেন সেখানে তিনি সুনীতিকুমারকে সামনে রেখেই নিজের অবস্থানটি স্পষ্ট করে দেন। বাংলাভাষা-পরিচয়-এর ভূমিকায় লিখছেন, “ভাষাতত্ত্বে প্রবীণ সুনীতিকুমারের সঙ্গে আমার তফাৎ এই— তিনি যেন ভাষা সম্বন্ধে ভূগোলবিজ্ঞানী, আর আমি যেন পায়ে-চলা-পথের ভ্রমণকারী।” বাংলা ভাষার উৎস নির্ণয় করতে গিয়েও সুনীতিবাবুর সঙ্গে তিনি সহমত হতে পারেননি। ভাষার সঙ্গে ‘জন্ম’ কথাটা যে ‘খাটে না’ এবং ‘যে জিনিস অনতিব্যক্ত অবস্থা থেকে ক্রমশ ব্যক্ত হয়েছে তার আরম্ভসীমা নির্দেশ করা কঠিন’, এ-ই ছিল তাঁর মত। ভাষাতত্ত্ব বা ব্যাকরণ চর্চায় রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব প্রস্থানটি সঙ্গত ভাবেই এই গ্রন্থের কেন্দ্রীয় ভাবনা হয়ে উঠেছে। ‘বাংলা বহুবচন’ প্রবন্ধটিতে গ্রন্থঋণের তালিকায় দীনেশচন্দ্র সেনের বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, হর্নেলের গৌড়ীয় ভাষার ব্যাকরণ, কেলগের হিন্দি ব্যাকরণ, গ্রিয়ারসনের মৈথিলী ব্যাকরণ, ব্রাউনের আসামী ব্যাকরণ ইত্যাদি দেখে ভাষাচর্চার পদ্ধতি ও পরিসরের খানিক ইঙ্গিত মেলে।

রবীন্দ্র-উত্তরকালে হিতেন্দ্রনাথ, ক্ষিতীন্দ্রনাথ, ঋতেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, সুরেন্দ্রনাথ, সৌম্যেন্দ্রনাথ প্রমুখের কথা আলোচিত হয়েছে। এঁদের অধিকাংশই অবশ্য নিজেদের ভাষা ব্যবহারের বৈশিষ্ট্যেই ব্যক্তিত্ব-চিহ্নিত। ক্ষিতীন্দ্রনাথের ‘জাতীয় ঐক্যে ভাষার স্থান’ পলিটিক্যাল ডিসকোর্সের মধ্যে ‘ভাষা’কে দেখার যে কথা প্রস্তাব করে তা সময়ের প্রেক্ষিতে দিক-নির্দেশক বলে ভাববার যথেষ্ট কারণ আছে। হিতেন্দ্রনাথের ‘বৃহৎবঙ্গকোষ’ অভিধানগ্রন্থ হিসেবে পরিকল্পিত হলেও পদ্ধতিগত ভাবে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের ব্যবহার ঋতেন্দ্রনাথের কথা মনে করায়। অভিধানকার হিসেবে শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয়ে সংশয়, অনুমান শেষ পর্যন্ত পাঠককেও বিভ্রান্ত করে। ভাষা-বিষয়ক চর্চায় এই পর্বে মৌলিক সন্দর্ভের তুলনায় বিভিন্ন ভাষার অনুশীলন, শিক্ষার প্রসঙ্গই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অবনীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে অবশ্য তাঁর সৃজন-সাহিত্যের শিল্প-শৈলীই ভাষা চর্চার অভিমুখ হয়ে উঠেছে। এখানে ভেবে দেখার যে, ব্যক্তিবিশেষের কালানুক্রমিক আলোচনার তুলনায় ভাবনাগত ঐক্যের দিক থেকে অধ্যায়বিন্যাস কি আরও প্রাসঙ্গিক হতে পারত? মেয়েদের ভাষা চর্চার স্বতন্ত্র অধ্যায়বিন্যাস এই প্রশ্নকেই খানিক সমর্থন জোগায় বলে মনে হয়।

ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মধ্যে স্বর্ণকুমারী এবং শোভনাসুন্দরীর কথাই এসেছে। স্বর্ণকুমারীর ‘সচিত্র বর্ণবোধ’, ‘প্রথম পাঠ ব্যাকরণ’, ‘বালবোধ ব্যাকরণ’ চলতি ধারারই অনুবর্তন। দ্বিতীয় জনের অবশ্য আগ্রহ ছিল লোকভাষা চর্চায়। জয়পুরে প্রবাস যাপনের সূত্রে ক্ষেত্রসমীক্ষাভিত্তিক কহাবত বা জয়পুরী প্রবচন-এর মতো সঙ্কলন নিঃসন্দেহে বাঙালির ভাষাচর্চার কালিক ইতিহাসের চিহ্ন বহন করে। স্বল্প পরিসরে হলেও অধ্যায় পরিকল্পনায় ঠাকুরবাড়ির বৃহৎ পরিবারের অংশ হিসেবে আত্মীয়-পরিজনদের কথাও উঠে এসেছে।

ঠাকুরবাড়ির ভাষা চর্চার ‘রূপরেখা’ প্রস্তুত করতে গিয়ে অধ্যাপক-গবেষক দেবাশিস ভৌমিক কার্যত পুণ্য পত্রিকার পুনরাবিষ্কার করেছেন। পরিশিষ্টে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, ভারতী, সাধনা পত্রিকায় ভাষা বিষয়ক লেখালিখির সূচি থাকলেও পুণ্য-র অনুপস্থিতি চোখে পড়ে। অধ্যাপক-গবেষক হিসেবে ভবিষ্যতের গবেষকদের কাছে প্রত্যাশা রেখে ইতি টেনেছেন লেখক। এই সারকথাটুকু গ্রন্থটির উদ্দেশ্য-বিধেয় বোঝার জন্য যথেষ্ট।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

book review

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy