ফ্লোর থেকে বেরোনোর সময় সন্দীপ রায়ের এই ভেবে খারাপ লাগছিল যে, ‘এত সুন্দর সেটটিকে ভেঙে ফেলা হবে’! শতরঞ্জ কে খিলাড়ি ছবি তৈরির কাজ চলছে তখন পুরোদমে, সত্তর দশকের শেষার্ধ, সত্যজিৎ রায়ের প্রথম হিন্দি ছবি।
টালিগঞ্জের ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়ো তখন সত্যিই ইন্দ্রপুরী হয়ে উঠেছিল কয়েকটি দিনের জন্য... ওয়াজিদ আলি শাহের রংমহল, রাজপ্রাসাদে বিরাট এক জলসাঘর বানিয়ে তুলেছেন শিল্প-নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্ত আর তাঁর সহকারী অশোক বসু। “দেওয়ালে অদ্ভুত রকমের সুন্দর অতি সূক্ষ্ম কারুকার্য। দেওয়ালের গায়ে দেওয়ালগিরি এবং ঘরের দু’দিকে মুখোমুখি করে টাঙানো সোনার কাজ করা ফ্রেমে বাঁধানো দুটি বিশাল আয়না।” অনুপুঙ্খ বিবরণ সন্দীপের, সত্যজিতের ছবির ডিটেল-এর মতো।
এ যেন তাঁর শিল্পের আন্দাজ পাওয়ার চেষ্টা। একে শুধু পিতা-পুত্রের পরম্পরা ভাবলে আচমকা গণ্ডি টেনে দেওয়া হবে, যে-হেতু সত্যজিতের শিল্পকর্ম নির্মাণের সঙ্গে ওতপ্রোত ছিলেন সন্দীপ, ফলে তাঁর শিল্পের বা ফিল্মের কোনও পাঠও বুনতে থাকেন লেখক তাঁর বয়ানে। পাঠক কৌতূহলী হয়ে উঠবেন নানা কারণে, এতে ছবি করার অন্তর্গত প্রক্রিয়া সম্পর্কে যেমন জানা যাবে, তেমনই জানা যাবে এক জন ছবি-করিয়ে হিসেবে সন্দীপ সত্যজিতের কোন কোন দিকগুলিকে পাঠকের সামনে আনতে চান।
তিনটি রচনা তাঁর: ‘শতরঞ্জ শুরুর আগে’, ‘ওয়াজিদ আলির রঙমহলে’, ‘ইন্দ্রপুরীতে অ্যাটেনবরো’। তিনটিতেই তন্নতন্ন পর্যবেক্ষণে সত্যজিতের ডিটেল প্রয়োগের কথা এসে পড়ে, তাঁর পিরিয়ড-ছবিতে কী ভাবে আবহমান কাল এসে সমকালকে ছুঁয়ে যায়, স্থাপত্যরীতি থেকে কোনও বিশেষ চরিত্রের বৈশিষ্ট্য যে কৌণিকতায় ধরা পড়ে... সবই ডিটেল-এর দৌলতে। ভারতীয় শিল্প-সাহিত্যে এই ডিটেল-এর প্রাচুর্য প্রসঙ্গে সত্যজিতের মন্তব্য: “চলচ্চিত্রকে একান্তভাবে বিংশ শতাব্দীর শিল্পকলা বলা হলেও তার রচনারীতি যে আংশিকভাবে প্রাচীন শিল্পসাহিত্যে অন্তর্নিহিত, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।” ফলত তাঁর ছবির যে কোনও একটি মুহূর্তে পর্দার ইমেজটিতে তথ্যমূল্য-সহ ডিটেল জমা হতে থাকে, ইমেজের অন্তর্গত মূল ভাবনার দিকে দর্শককে মনোযোগী করে তোলার জন্যে। উনিশ শতকের পুনর্নির্মাণে এই ডিটেল রচনাজনিত শিল্প-নির্দেশনার পিছনে ‘সম্পূর্ণ পরিকল্পনা অবশ্য স্বয়ং পরিচালকের’, সযত্নে খেয়াল করিয়ে দেন সন্দীপ। ছবিটিকে ভর করে তাঁর শুটিং বা প্রি-প্রোডাকশনের বৃত্তান্ত এক দিকে যেমন পাঠককে আমজাদ খান থেকেরিচার্ড অ্যাটেনবরোর অভিনয়ের আড়ালে লুকোনো তাঁদের ব্যক্তিত্বকে চেনায়, তেমনই অন্য দিকে লোকেশনের জন্য লখনউ শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো থেকে হায়দরাবাদের সলার জং মিউজ়িয়মের সরঞ্জাম ব্যবহার কী ভাবে করেছিলেন সত্যজিৎ, তাও জানায়। এ ভাবেই সন্দীপের সচেতন কলমে আধুনিক চলচ্চিত্রচর্চার একটা আদল তৈরি হতে থাকে, ইতিহাসের আদল।
প্রবন্ধ সংগ্রহ
সন্দীপ রায়
৫০০.০০
বিচিত্রপত্র গ্রন্থন বিভাগ
সে আদল আকার পেতে থাকে সত্যজিৎ-সহধর্মিণীর সৃষ্টিগুণের সমন্বয়ী সূত্রে, যেমন সন্দীপ লিখছেন, “বাবার ফিল্মে কোনো রবীন্দ্রসংগীত থাকলেই বাবা মায়ের সঙ্গে বসে যেতেন। গান সিলেক্ট হবার পর শিল্পীকে সে-গান শেখানোর দায়িত্ব পড়তো মায়ের ওপর। কারণ রবীন্দ্রনাথের গানের সঠিক স্বরলিপি ও তার লয়ের ব্যাপারটা ছিল তাঁর নখদর্পণে।” বিজয়া রায় চারুলতা ও ঘরে-বাইরে ছবির সব গান নিজের গলায় রেকর্ড করেছিলেন, সেই টেপ পাঠানো হয়েছিল কিশোরকুমারকে বম্বেতে, তিনি গানগুলো তুলে নেন টেপ থেকে।
ছেলেবেলা থেকেই খুব ভাল গান করতেন বিজয়া, তাঁর গান শুনে খুশি হয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রগানের রেকর্ডও ছিল তাঁর। আর ছিল সেলাই ও নিটিং-এর নেশা। চারুলতা-য় ভূপতির ‘B’ নকশা করা রুমাল তাঁরই করা। সত্যজিতের অনুরোধে সোনার কেল্লা-য় মুকুলের পরনে লাল টুকটুকে সোয়েটারটিও তাঁরই বোনা।
আগন্তুক ছবিতে উইল সংক্রান্ত একটা ব্যাপার রেখেছিলেন সত্যজিৎ, চেয়েছিলেন অনিলার ভূমিকায় মমতাশঙ্কর কোনও গল্পের বই থেকে ওই উইলের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাক, সে-বই তিনি বিজয়ার পরামর্শেই দৃশ্যগ্রহণের সময় মমতাশঙ্করের হাতে তুলে দেন, আগাথা ক্রিস্টির পোয়রো-কাহিনি পেরিল অ্যাট এন্ড হাউস।
তথ্যের ভার কমিয়ে তরতরে গল্পের মতো লিখে যান সন্দীপ, পাঠকের মন যাতে সরতে না পারে, পাশাপাশি কত অনায়াসে সত্যজিতের শিল্পসন্ধানী মনটি বুনতে বুনতে যান, আবার এও জানাতে ভোলেন না যে ভাবনা থেকে রূপান্তর পর্বে কী ভাবে সত্যজিতের মানসসঙ্গী হয়ে ওঠেন বিজয়া: “বাবা-মা’র প্রথম প্রেম ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজ়িক। অবসর পেলেই দু’জনে তন্ময় হয়ে রেকর্ড বা ক্যাসেটে বিটোফেন, বাখ্ ও মোৎসার্ট শুনতেন।” সম্ভবত আশির দশকের মাঝামাঝি কোনও বিদেশি সাংবাদিকের জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের প্রিয় ভিনদেশি পরিচালকদের প্রত্যেকের একটি করে ছবি বেছে হাতে-লেখা একটি তালিকা তৈরি করেছিলেন সত্যজিৎ, ছাপা হয়নি কোথাও। সন্দীপ সেই তালিকাটিকে কালানুক্রমে সাজিয়ে, প্রত্যেক পরিচালকের ছবি ও তাঁদের ফিল্মগুলির পোস্টার-সহ পেশ করেছেন রচনাটি: ‘বাবার প্রিয় সিনেমা’। সেখানে নিজের স্মৃতি থেকেই জানিয়েছেন, “বাবার শেষ দেখা প্রিয় ছবি ১৯৮১-তে তোলা স্প্যানিশ পরিচালক, কারলস সওরার ‘ব্লাড ওয়েডিং’।”
‘লেখক’ সত্যজিৎ আর ‘ছবি-করিয়ে’ সত্যজিতের যোগসূত্র ধরিয়ে সন্দীপ তাঁর ‘খসড়া খাতায় ফেলুদা’য় লিখছেন, সত্যজিতের ছবি তৈরির জীবন ও তাঁর ‘ফেলুদা’ রচয়িতার জীবন ওতপ্রোত জড়িত, বিবিধ প্রমাণের মধ্যে যেমন একটি: দেশভ্রমণ। ফেলুদার যাওয়া সব জায়গাতেই কখনও না কখনও গিয়েছেন সত্যজিৎ, সে-সবের মধ্যে দার্জিলিং ছিল অত্যন্ত প্রিয়, ফলে “তাঁর প্রথম মৌলিক চিত্রনাট্য ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ আর প্রথম ফেলুদার গল্পের ঘটনা যে দার্জিলিং শহরেই ঘটবে, তাতে আর আশ্চর্য কী?”
এতাবৎ কথাবার্তায় কারও মনে হতেই পারে, প্রবন্ধ সংগ্রহ-টি শুধুই সত্যজিৎময়— তা কিন্তু নয়। তাঁর কাহিনি নিয়ে নিজের প্রথম ছবি ফটিকচাঁদ ছবির শুটিংয়ের যে অভিজ্ঞতা লিখেছেন সন্দীপ, গদ্যগুণে তা অনির্বচনীয়, তাতে প্রধান একটি চরিত্র কলকাতায় রবিবারের ময়দান, ‘যা শুধু গল্পেরই নয়, এ শহরেরও এক আশ্চর্য ঘটনা’— মন্তব্য লেখকের।
তাঁর দেখা প্রিয় কিছু হলিউড ফিল্ম কেমন ভাবে তৈরি হল— সেই লেখাগুলির পাশাপাশি লিখেছেন কার্টুন ও কমিক্স নিয়েও, ইংরেজ কার্টুনিস্ট উইলিয়াম হিথ রবিনসন থেকে আমেরিকার কমিক্স জগতের তিন অবিসংবাদিত চরিত্র।
লেখার সঙ্গে তাঁরই আঁকা নানাবিধ অলঙ্করণ, হেডপিস। প্রচুর স্থিরচিত্র। গোটা গদ্যগ্রন্থটি এমন ভাবে চিত্রিত ও সজ্জিত যে পাঠকের কল্পনাকে জাগিয়ে তোলে, অচেনা রহস্যের জগৎ খুলে যায় যেন!
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)