E-Paper

রবীন্দ্রচর্চায় জরুরি পাঠ

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর বিশ্বভারতী প্রকাশনা বিভাগ থেকে তাঁর চিঠিপত্রের সিরিজ় প্রকাশিত হয়ে চলেছে। তার প্রথমটি চিঠিপত্র ১, যেখানে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীকে লেখা পত্রগুচ্ছ প্রকাশিত।

সুশোভন অধিকারী

শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০২৬ ০৭:১৯

‘বায়োগ্রাফিক্যাল রিসার্চ’-এর প্রত্যক্ষ উপাদানগুলির মধ্যে চিঠিপত্র ও ডায়েরির ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। স্মৃতিকথনের স্থান এর পরে। সে কেবল ডায়েরির মতো খবরের জোগানদার নয়, তার প্রেক্ষাপটে আরও অনেক কিছু ভেসে ওঠে। অবশ্য স্মৃতিমাল্যের ঘটনাবলিকে অনেক সময় সন-তারিখের কষ্টিপাথরে যাচাই করে নিতে হয়। অন্য দিকে, ডায়েরি লেখার প্রচলন এ দেশে জোরালো ভাবে গড়ে ওঠেনি। এই সব তলিয়ে দেখে মনে হয়, জীবনী রচনার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে চিঠিপত্র হল গবেষকের নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার, প্রথম সারিতে তার স্থান। বলা বাহুল্য, রবীন্দ্রনাথের জীবনী রচনার ক্ষেত্রেও অন্যতম উপকরণ হয়ে উঠেছে এই চিঠিপত্র।

সারা জীবনে রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখেছেনও বিস্তর। তার একটা আন্দাজ পাওয়া গেলেও সঠিক পরিমাণ নির্ণয় সহজ নয়। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর বিশ্বভারতী প্রকাশনা বিভাগ থেকে তাঁর চিঠিপত্রের সিরিজ় প্রকাশিত হয়ে চলেছে। তার প্রথমটি চিঠিপত্র ১, যেখানে কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীকে লেখা পত্রগুচ্ছ প্রকাশিত। ক্রমে রবীন্দ্রপত্রাবলির অনেকটাই আজ মুদ্রিত আকারে পাঠকের কাছে এসে পৌঁছেছে। তবে বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্রপত্রগুচ্ছের বাইরে অগ্রন্থিত চিঠিপত্রের সংখ্যা কম নয়। যার কিছু অংশ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় মুদ্রিত। এ ছাড়াও ব্যক্তিগত সংগ্রহে অপ্রকাশিত চিঠি থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট— যা এখনও ছাপার অক্ষরে প্রকাশের অপেক্ষায়। খেয়াল করলে দেখি, বিশ্বভারতী প্রকাশিত চিঠিপত্রের পরিমাণ প্রায় হাজার তিনেক। এর বাইরে রয়েছে প্রকাশিত অথচ অগ্রন্থিত পত্রাবলি। এই অগ্রন্থিত ও অপ্রকাশিত পত্রের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ সহজ নয়। অন্য দিকে, বাংলা চিঠিপত্রের পাশাপাশি ইংরেজি চিঠির সম্ভার রবীন্দ্রজীবনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, সেই কাজও অসম্পূর্ণ। এ-হেন প্রেক্ষাপটে আলোচ্য বইটি যে এক জরুরি উদ্যোগ, সন্দেহ নেই।

বিজন ঘোষাল বেশ কিছুকাল ধরে রবীন্দ্রপত্র সঙ্কলন ও সম্পাদনার কাজে হাত দিয়েছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, বিশ্বভারতীর চিঠিপত্র সিরিজ়ের সঙ্গে কি এ কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে? খেয়াল করলে দেখা যাবে, বিশ্বভারতী কর্তৃক প্রকাশিত চিঠিপত্রের খণ্ডগুলি প্রাপকের নাম অনুসারে বিন্যস্ত, অর্থাৎ তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সেই হিসেবে শ্রীঘোষালের রবীন্দ্রপত্র সমগ্র গড়ে উঠেছে কালানুক্রমিক ভাবে— যার প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ২০২৩-এর গোড়ায়। যদিও এর আগে তিনি রবীন্দ্র পত্রাভিধান শিরোনামে চিঠিপত্রের কাজ শুরু করেছিলেন। তার প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ২০১৩-র মাঝামাঝি। কাজটির অভিমুখ ছিল বর্ণানুক্রমিক, তবে পাঁচটি খণ্ড প্রকাশের পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। স্মরণীয়, রবীন্দ্র পত্রাভিধান সিরিজ়টি প্রাপকের নামের বর্ণানুক্রমে গড়ে ওঠায়, পাঁচটি খণ্ড জুড়ে প্রাপকের ‘অ’ অক্ষরযুক্ত নামেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। রবীন্দ্রপত্রের এই বর্তমান কাজটি কালানুক্রমিক হওয়ায় কবির জীবন ও ভাবনা, তাঁর সমসাময়িক চালচিত্রে বুঝে নিতে সহায়ক হয়। উল্লেখ করা যায়, বিশ্বভারতী একদা কালানুক্রমিক রবীন্দ্ররচনার কাজ শুরু করলেও এখনও তা মুদ্রিত আকারে পাঠকের হাতে এসে পৌঁছয়নি।

রবীন্দ্রপত্র সমগ্র কালানুক্রমিক ৬সঙ্কলন ও সম্পা: বিজন ঘোষাল

৭০০.০০

লালমাটি

এই রবীন্দ্রপত্র সমগ্র-এর ষষ্ঠ খণ্ডের কালসীমা ১৯১২-১৯১৪ পর্যন্ত বিস্তৃত, সঙ্কলিত চিঠিগুলি ১৯১২-র এপ্রিলে (বৈশাখ ১৩১৯) শুরু হয়ে ১৯১৪-র এপ্রিল (চৈত্র ১৩২০) স্পর্শ করেছে। রবীন্দ্রজীবনের বিশেষ পর্ব, কবির নোবেল অধ্যায়ের পত্রগুচ্ছ এই খণ্ডের অন্তর্গত। পরিমাণ অনুসারে, প্রথম থেকে পঞ্চম খণ্ড পর্যন্ত মুদ্রিত রবীন্দ্রপত্রের সংখ্যা ২১৯০। ষষ্ঠ খণ্ডে মুদ্রিত শেষ পত্রসংখ্যা ২৫৬২, অর্থাৎ এই খণ্ডে মোট ৩৭২টি চিঠি। সূচনায় ২১৯১ সংখ্যক চিঠিটি প্রবাসী-সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে লিখিত, কবি তাঁর সম্পাদিত আরব্য উপন্যাস উপহার পেয়ে লিখছেন, “আমি পূর্বেই ইহা ক্রয় করিয়া আমার পরিবারস্থ বালক বালিকা ও ব্রহ্মবিদ্যালয়ের ছাত্রদের অবকাশ কালে পড়িবার জন্য দিয়াছি...।” পরবর্তী চিঠিটি তরুণ ছাত্র অমল হোমকে লেখা। ছাত্রাবস্থায় জাহ্নবী পত্রিকার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তাঁর পরিবারের বিরাগভাজন হওয়ার প্রেক্ষিতে কবি লিখছেন, “তোমার অভিভাবক সম্প্রদায় তোমার এই অকাল সাহিত্যপ্রীতির মূলে শান্তিনিকেতনের যোগ কল্পনা করে ক্ষুব্ধ শুনেছি। তুমি পরীক্ষাপাশ করবার পূর্বেই বিশ্বসাহিত্য পালিয়ে যাবে না, ঠিকই থাকবে। ইস্কুলপালানো ছেলেদের দলে ভিড় বাড়িয়ো না, আমার নজীর সর্বত্র নাও চলতে পারে।”

চিঠিগুলি কালানুক্রমিক হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে পত্রপ্রাপকের বদলের সঙ্গে রবীন্দ্রমনের গতিপথের চিহ্ন বদলে যায়। কখনও বা পড়তে গিয়ে মনে হয়, এ কবির দিনলিপির নামান্তর। যেমন ছিন্নপত্রাবলী পর্বের দীর্ঘকাল পরে ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে লেখা সুদীর্ঘ চিঠি হয়ে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের ডায়েরির আশ্চর্য পাতা: “গীতাঞ্জলির ইংরেজি তর্জমার কথা লিখেছিস। ওটা যে কেমন করে লিখলুম এবং কেমন করে লোকের এত ভাল লেগে গেল, সে কথা আমি আজ পর্যন্ত ভেবেই পেলুম না। আমি ইংরেজি লিখতে পারিনে এ কথাটা এমনি সাদা যে এ সম্বন্ধে লজ্জা করবার মত অভিমানটুকুও আমার কোনোদিন ছিল না।… তুই ভাবছিস আজকে বুঝি আমার সে মায়া কেটে গেছে— একেবারেই তা নয়” ইত্যাদি। এই চিঠি নোবেল পুরস্কারের আগে লেখা, সেই পর্বে বিলেতের ‘ইন্ডিয়া সোসাইটি’ ইংরেজি গীতাঞ্জলি প্রকাশ করেছে, তার পরবর্তী সংস্করণ প্রকাশ করেছে ম্যাকমিলান। প্রায় দিনলিপির আধারে এই দীর্ঘ পত্র একাধিক দিন ধরে লিখেছেন। আবার সদ্য নোবেলপ্রাপ্তির খবরে নিরুত্তাপ কণ্ঠে সুরেন দাশগুপ্ত, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, সূর্যকুমার ভুঁইয়া প্রমুখকে সৌজন্য-চিঠিতে (১৭ নভেম্বর ১৯১৩) অতি সংক্ষেপে লিখেছেন “আমার সম্মানলাভে যাঁহারা আনন্দ প্রকাশ করিতেছেন তাঁহাদের প্রতি আমার অন্তরের কৃতজ্ঞতা নিবেদন করিতেছি।” একই দিনে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ও দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারীকে লিখেছেন তুলনায় বড় চিঠি। খানিক রসিকতার সুরে রামেন্দ্রসুন্দরকে লিখেছেন, “সম্মানের ভূতে আমাকে পাইয়াছে, আমি ত মনে মনে ওঝা ডাকিতেছি— আপনাদের আনন্দে আমি সম্পূর্ণ যোগ দিতে পারিতেছি না” ইত্যাদি।

সময়ক্রম অনুসারে চিঠিগুলির বিন্যাসে কবির চিত্তপটের পাশাপাশি সামগ্রিক প্রেক্ষিতটি ধরা পড়ে। সঙ্কলক শুধু চিঠিগুলি পর পর সাজিয়ে দেননি, টীকা-সহ সযত্নে সম্পাদনা করেছেন। এমনকি বিশ্বভারতী প্রকাশিত চিঠিপত্রে তারিখের অস্বচ্ছতা থাকলে আলোচনাসাপেক্ষে সঠিক সময় নির্ধারণে সচেষ্ট হয়েছেন। ‘পাঠনির্দেশ’ ও ‘নির্দেশিকা’র পাশাপাশি গ্রন্থভূমিকাও উল্লেখের দাবি রাখে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Review Rabindranath Tagore

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy