Advertisement
E-Paper

যা দেখছেন, তার অর্থ খুঁজুন

একত্রিশ বছর আগে প্রকাশিত ওই বই পৃথিবীবিখ্যাত করে তুলেছিল তার লেখককে। তিনি বনে গিয়েছিলেন স্টার।

পথিক গুহ

শেষ আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০০:২৮
মুখর: প্যারালিম্পিক্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্টিফেন হকিং, লন্ডন ২০১২। ছবি: গেটি ইমেজেস

মুখর: প্যারালিম্পিক্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্টিফেন হকিং, লন্ডন ২০১২। ছবি: গেটি ইমেজেস

পাঁচ বছর আগে মুক্তি পেয়েছিল এক বায়োপিক। ‘দ্য থিয়োরি অব এভরিথিং’। তখনও পর্যন্ত এই গ্রহে জীবিত বিজ্ঞানীকুলে সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষটির কাহিনি। ছবির শেষে পর্দায় বিশেষ এক জ়ুম-ইন। বইয়ের দোকানে কাচের জানলায় পেল্লায় এক প্রচ্ছদ। আ ব্রিফ হিস্টরি অব টাইম। ও দিকে পাঠকেরা ঘিরে ধরছে লেখককে। তাদের কেনা বইতে অটোগ্রাফের আশায়। ফিল্ম শেষ হচ্ছে বিজ্ঞানীর গবেষণার ফলাফল দিয়ে নয়। এমনকি তাঁর জীবনযন্ত্রণা দিয়েও নয়। ও সব যেন গৌণ। বদলে ওই বইখানির বিক্রি-সংক্রান্ত তথ্য। জানানো হল, ২০১৩ পর্যন্ত আ ব্রিফ হিস্টরি অব টাইম-এর বিক্রি ছাপিয়েছে এক কোটি।

একত্রিশ বছর আগে প্রকাশিত ওই বই পৃথিবীবিখ্যাত করে তুলেছিল তার লেখককে। তিনি বনে গিয়েছিলেন স্টার। বিজ্ঞানের জগতে যা বড় একটা দেখা যায় না। মেয়ে বড় হচ্ছে, তার পড়ার খরচ যাতে সঙ্কুলান হয়, অধ্যাপনার বাইরে কিছু অর্থ উপার্জন করে, তাই বই লেখা। কেমন বই? তাঁর মতে, যা শোভা পাবে এয়ারপোর্টের বুক স্টলে জেমস হেডলি চেজ় বা হ্যারল্ড রবিন্‌সের বইয়ের পাশাপাশি। অর্থাৎ, ধারে এবং ভারে থ্রিলারের সমতুল একখানি বই লিখতে চেয়েছিলেন কেমব্রিজের অধ্যাপক স্টিফেন উইলিয়াম হকিং। পূর্ণ হয়েছিল তাঁর সে সাধ। আর, এই বইখানির পর অন্য যতগুলি বই লিখেছেন তিনি, সবগুলিই এয়ারপোর্টের স্টলে শোভা পেয়েছে। ব্যতিক্রম নয় ব্রিফ আনসার্স টু দ্য বিগ কোয়েশ্চন্‌স-ও। এটির খ্যাতির তো অন্য কারণও আছে। এটি বিজ্ঞানীর প্রয়াণের পর প্রকাশিত। সেই হিসেবে তাঁর শেষ রচনা। বইয়ের ফ্ল্যাপে এটিকে যদিও লেখকের ‘ফাইনাল বুক’ বলা হয়েছে, প্রকাশনা সংস্থাগুলোর কাছে হকিং যেমন লোভনীয়, তাতে ওঁর অমুদ্রিত বক্তৃতা কিংবা রচনা-সঙ্কলন যে এর পরেও বেরোবে না, তা বলা যায় না।

বিজ্ঞানে অনেক কিছুর ব্যাখ্যা মিললেও, আ ব্রিফ হিস্টরি অব টাইম কেন যে বিশ্বব্যাপী পাঠকের কাছে রাতারাতি প্রিয় হল, তার ব্যাখ্যা মেলে না। এ ব্যাপারে অনেকে হকিংয়ের শারীরিক অক্ষমতার প্রসঙ্গ টানেন। মৃতপ্রায় দেহ নিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের দুরূহ রহস্যানুসন্ধান আমাদের মনে বিস্ময় উদ্রেক করে বটে, কিন্তু শুধু তা লেখক হিসেবে হকিংয়ের সাফল্য পুরোটা ব্যাখ্যা করে না। এমন নয় যে, হকিং মুদ্রণজগতে একেবারে শূন্যতার মধ্যে একটা বিগ ব্যাং ঘটিয়েছিলেন। বিজ্ঞাননির্ভর বেস্টসেলার গত শতাব্দীর শেষের দিকে বেশ কিছু ছিল। দ্য তাও অব ফিজ়িক্স (ফ্রিৎজ়ফ কাপ্রা, ১৯৭৫), দ্য ফার্স্ট থ্রি মিনিটস (স্টিভেন ওয়েনবার্গ, ১৯৭৭), কসমস (কার্ল সাগান, ১৯৮০), এবং কেওস (জেমস গ্লিক, ১৯৮৭) ওই তালিকায় পড়তে পারে। আ ব্রিফ হিস্টরি অব টাইম ও সবকেও অনেক পেছনে ফেলেছিল।

ব্রিফ আনসার্স টু দ্য বিগ কোয়েশ্চনস
স্টিফেন হকিং
৬৫০.০০, জন মারে

যে বইয়ের পরে সংক্ষিপ্ত এবং সচিত্র সংস্করণ বের হয়, তার ও রকম জনপ্রিয়তা ব্যাখ্যার অতীত। হকিং পরে নিজেই কবুল করেছিলেন যে, অনেক আইডিয়া— বিশেষ করে কাল্পনিক সময় ব্যাপারটা— তিনি সহজ করে ওই বইতে বোঝাননি। আসলে, না বুঝলেও পাঠকরা বইখানি কিনতে কসুর করেননি। কিনলে পাঁচ জনের সামনে নিজের বিশেষ সত্তা জাহির হয়। সমালোচকরা এ জন্য ‘হকিং সূচক’ বলে একটা পরিমাপ ঠাট্টাচ্ছলে চালু করেছেন। বই কেনার পর মানুষ তা কতটা পড়েন, সেটা যাচাই করতে। ওই সূচকে আ ব্রিফ হিস্টরি অব টাইম-এর মান খুব কম। এক সময় তো বইটি আখ্যা পেয়েছিল ‘দ্য মোস্ট আনরেড বুক’!। লেখক হিসেবে নিজের ত্রুটি হকিং শুধরে নেন পরের বইগুলোয়। দি ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল কিংবা দ্য গ্র্যান্ড ডিজ়াইন তো দুরূহ বিজ্ঞান-ব্যাখ্যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ব্রিফ আনসার্স-ও ব্যতিক্রম নয়।

প্রকাশকের তরফে বইয়ের মূল্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা প্রশংসনীয়। এর ‘প্রাককথা’ অস্কার-বিজয়ী অভিনেতা এডি রেডমেইনের। যিনি ‘দ্য থিয়োরি অব এভরিথিং’ বায়োপিকে হকিং চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ওই পুরস্কার জিতেছিলেন। শেষ কথা হকিং-কন্যা লুসি-র। আর ভূমিকা লিখেছেন নোবেলজয়ী পদার্থবিদ এবং হকিংয়ের বহু কালের সুহৃদ কিপ থর্ন। রেডমেইন লিখেছেন বায়োপিক সম্পর্কে হকিংয়ের মন্তব্য (‘‘ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে ফিজ়িক্স বেশি থাকলে ভাল হত’’)। লুসি বর্ণনা করেছেন হকিংয়ের অন্তিমযাত্রা। থর্ন বলেছেন হকিংয়ের ব্ল্যাক হোল গবেষণার কথা।

বড় বড় প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতে হকিংয়ের এই বই। ঈশ্বর কী আছেন? ব্রহ্মাণ্ড শুরু হল কী ভাবে? ভবিষ্যৎ কি অনুমান করা যায়? ব্ল্যাক হোলের ভিতরে কী আছে? অতীতে বা ভবিষ্যতে কি লাফ দিয়ে যাওয়া যায়? মহাবিশ্বে আর কি কোথাও বুদ্ধিমান জীব আছে? আমরা কি পৃথিবীতে অনন্তকাল টিকে থাকব? আমাদের কি মহাশূন্যে আর কোথাও বসতি গড়া উচিত? মেশিন কি বুদ্ধিতে আমাদের ছাপিয়ে যাবে? মানবজাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে? মোট দশটি প্রশ্নের প্রথম পাঁচটি বিজ্ঞানী হিসেবে হকিংয়ের গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বাকি অর্ধেক প্রশ্ন হিসেবে বড় বটে, তবে ওঁর গবেষণার মধ্যে পড়ে না। তবু বিজ্ঞানীসুলভ চিন্তা ও যুক্তি সহকারে তিনি প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছেন। কোথাও আবার তিনি দাবি করেছেন যে, প্রশ্নটি তাঁর গবেষণার মধ্যে অবশ্যই পড়ে। যেমন, প্রথম প্রশ্নটি। ধর্ম আর বিজ্ঞানের সংঘাত চিরকালীন। এ প্রসঙ্গে বেশ কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, ঈশ্বর আছেন কি নেই, সে প্রশ্নটার উত্তর বিজ্ঞানের বিচার্য হতে পারে না। বিজ্ঞানে প্রশ্নের শেষ নেই। সব জিজ্ঞাসার জবাব বিজ্ঞান দিতে পারবে না কোনও দিন। ধার্মিক উত্তর খুঁজবেন ঈশ্বরে। সুতরাং, কাজ কি ওই তর্কে ঢুকে? হকিং মোটেই ওই যুক্তি মানেন না। সব প্রশ্নের সেরা প্রশ্ন— ব্রহ্মাণ্ডের জন্মরহস্য— যখন হাতের কাছে মজুত, তখন ঈশ্বরের থাকা-না-থাকার প্রসঙ্গে বিজ্ঞান ঢুকতেই পারে। হকিংয়ের দাবি, ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হয়েছে বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে। বিজ্ঞানের ওই নিয়মগুলো আস্তিকদের বড় অস্ত্র। তাঁরা বলেন, নিয়মগুলো কেন ও রকম, অন্য রকম হল না, তা বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে না। ঈশ্বর চেয়েছেন বলেই নিয়মগুলো ও রকম। হকিং ওই যুক্তিকেও উল্টে দিয়েছেন। তাঁর মতে, যে ঈশ্বর নিজের তৈরি নিয়ম বদলাতে পারেন না, তাঁকে তিনি মানেন না।

কল্পবিজ্ঞানের ভক্তরা মজা পাবেন টাইম ট্রাভেল নিয়ে হকিংয়ের আলোচনায়। লাফ দিয়ে ভবিষ্যতে বা অতীতে কি যাওয়া সম্ভব? গল্পের প্লট সাজাতে যা দেখানো হয়, তা কি বাস্তবে ঘটানো যায়? ভবিষ্যতের কথা বাদ দেওয়া গেল, অতীতে যাওয়ায় ঝামেলা আছে। কেউ যদি অতীতে গিয়ে তার বাবা-মাকে খুন করে বসে? তা হলে তো তার জন্ম হয় না। না জন্মালে সে অতীতে যাবে কী করে? এ যুক্তির প্যাঁচ এড়াতে মনে করা হয় অতীতে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কল্পবিজ্ঞানে তবু এ নিয়ে গল্প ফাঁদা হয়। ফিকশনপ্রেমীদের পিঠ চাপড়ে দিয়ে হকিং বলেছেন, এর পরেও অতীতে চলে যাওয়া সম্ভব হতে পারে ‘এম-থিয়োরি’র সৌজন্যে। কোন সে তত্ত্ব? মাদার অব অল থিয়োরিজ়। মানে, যে তত্ত্ব ব্যাখ্যা করবে জগতের সব নিয়ম। হকিংয়ের দাবি, এম-থিয়োরি পথ দেখাবে অতীতে যাওয়ার।

পৃথিবীর পরিবেশ বাঁচানোর দায় বা ভিন্‌গ্রহে বসতি গড়ার প্রয়োজন সম্পর্কে হকিং কী বলবেন, তা আমাদের জানা। ও সব বাদ দিয়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার এক কূট প্রশ্নে ফেরা যাক। বিষয়টা ‘ইনফরমেশন প্যারাডক্স’। তথ্য ধাঁধা। ধাঁধাটার উৎস ব্ল্যাক হোল গবেষণা। নিজের চৌহদ্দির মধ্যে একবার পেলে ব্ল্যাক হোল গিলে খায় সব কিছু, এমনকি আলোও। তো যে সব পদার্থ গিলছে ব্ল্যাক হোল, সে সবের সম্পর্কে তথ্য কি লোপাট? উদাহরণ দিয়ে বলা যাক। ধরা যাক, একটা ব্ল্যাক হোল গিলেছে এক তারা। আর এক ব্ল্যাক হোল গিলেছে এক গ্রহ। গিলে ফেলার পর ও সব তো হাওয়া। তখন কি বলা যাবে কোন ব্ল্যাক হোল কী গিলেছে? না বলা গেলে ফিজ়িক্স রসাতলে! শাস্ত্রটা গড়ে উঠেছে এই বিশ্বাসে যে, কার্য আর কারণ এক সূত্রে বাঁধা। বিকেলের বীজ সকালে নিহিত। তথ্য লোপাট হলে প্রমাণ হয় ওই বিশ্বাস ভুল। অথচ, ব্ল্যাক হোল গবেষণা সে রকমই ইঙ্গিত করছে। এ জন্য তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা চার দশকেরও বেশি সময় ধাঁধাটার সমাধান খুঁজছেন। এই বইতে হকিং জানিয়েছেন, সতীর্থদের সঙ্গে গবেষণায় তিনি টের পাচ্ছেন তথ্য লোপাট হয় না।

বইয়ের অন্তিম পরিচ্ছেদে পাঠককে হকিং শোনান তাঁর মর্মবাণী: নক্ষত্রের দিকে তাকান, পায়ের দিকে নয়। যা দেখছেন, তার অর্থ খুঁজুন। ভাবুন কী ভাবে এই ব্রহ্মাণ্ড টিকে আছে। কৌতূহলী হোন। কল্পনার পাখা মেলে দিন।

Stephen Hawking Book Book Review
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy