×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৮ মে ২০২১ ই-পেপার

বাঙালিয়ানা রান্নার পদ্ধতি: দু’পাতা রবীন্দ্রনাথ, এক টুকরো সৌরভ

১৩ এপ্রিল ২০১৮ ১১:৪০

২ পাতা রবীন্দ্রনাথ

৪ কলম বিবেকানন্দ

স্বাদ অনুযায়ী রামমোহন, না থাকলে রামকৃষ্ণ সঙ্গে খানিকটা সত্যজিৎ

Advertisement

১ টুকরো সৌরভ (মিনিবাসে অন্যের বগলের হলেও চলবে)

১ বোতল ডাইজিন

৩ প্রধান

১৪টা ক্যাজুয়াল লিভ

১টা দুগ্গাপুজো

মুড অনুযায়ী শ্যামা বা শাপমোচন? সঙ্গে কিছু ঘাসফুল

৩৬৫ দিন আড্ডা

১ ঘর ল্যাদ

২টো পাশবালিশ

১টা সুরভিত অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রিন

সঙ্গে অবশ্যই জয়সলমীরে ডাল-পোস্ত ও মুকুলের বাড়ি

ইচ্ছেমতো তক্ক

(পেটে বিদ্যে আর জিভে সরস্বতী না থাকলে ভাতঘুম)

ব্যস, আপনার বাঙালিয়ানা তৈরি। চেটেপুটে খান, বা লুটেপুটে— এ হল সরকারবাবুর ওয়াটার অব ইন্ডিয়া’ (ঢেঁকুর)! খাচ্ছে কিন্তু ফুরোচ্ছে না। ম্যাজিক। (আবার ঢেঁকুর…এ বার সশব্দে…শুনে তেঘরিয়ার বাঙালি মামণির তির্যক মন্তব্য ‘‘আনকালচার্ড, বাঙালি ব্রুট!’’)

এ সবই মজার কথা। নিছক লোক হাসানোর ছল। এর ভিতরে কিন্তু একটা বিষণ্ণ সুর বাজছে…ঠিক যেন দক্ষিণারঞ্জনবাবুর তার সানাই…তার ছিঁড়ছে, বুকে বিঁধছে! বাঙালির হরিহর আত্মা বাঙালিয়ানার কি তা হলে অপমৃত্যু ঘটছে? চলুন একটু গভীরে যাই! দুগ্গা দুগ্গা।

বঙ্গদেশ ছেড়ে, নিজের ভিটেমাটি পরিত্যাগ করে মুম্বইতে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে এই বাঙালিয়ানা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাইনি কখনও। বাঙালির বাঙালিত্ব, যা কি না আমাদের জন্মগত অধিকার, মৌলিক প্রাপ্তি, ‘ওয়ে অব লাইফ’— তা নিয়ে কোনও আদিখ্যেতা দেখাইনি। উল্টে ‘বাঙালি থাকিব না, মানুষ হইব’ গোছের একটা আর্তির আস্ফালন শুনতে পাচ্ছিলাম নিজের ভিতরে।

গ্লোবাল সিটিজেন হওয়ার এই প্রবল বাসনা কেমন নিমেষে পাল্টে গেল আমার কন্যার জন্মের সঙ্গে। প্রশ্ন জাগল, কন্যাকে মানুষ করব না বাঙালি? আর কেনই বা করতে হবে বাঙালি? কী আছে বাঙালিদের যা ভূ-ভারতে আর কারওর নাই? সত্যি কি নেই নাকি এটাও আমাদের রংচড়ানো মনগড়া কথা?

বাঙালিয়ানা একটা ওয়ে অব লাইফ, একটা জীবনধারণ। আর মুম্বই শহরে বসে যেটা আমি কোনও দিনও ভাবিনি সম্ভব হবে, সেটা কিন্তু বাস্তবায়িত হল। আমরা হঠাৎ ভীষণ বেশি বাঙালি হয়ে উঠলাম যার মূলে কিন্তু আমার সেই কন্যা। আর্ষা। উপেন্দ্রকিশোর রচনাবলী কেনা হল, টুনটুনির গল্প শোনানো হল, বর্ণপরিচয় আনা হল, কেনা হল সহজ পাঠ। মা আর মাসির উপর নির্দেশ দেওয়া হল যত পার ছড়া শোনাওù আগডুম বাগডুম, খোকা ঘুমালো, আইকম বাইকম, শিবঠাকুরের বিয়ে…আমার মেয়ে নাম বলতে শেখার আগেই, ছড়া বিশারদ হয়ে উঠল। সঙ্গে এল কলকাতা থেকে এক ব্যাগ গান, ক্যাসেটে অন্তরা চৌধুরী, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি ঠাকুর, চন্দ্রবিন্দু, অখিলবন্ধু ঘোষ— কি না শোনেনি সে। বাড়িতে আমার কন্যা তখন স্পষ্ট বাংলায় সবার সঙ্গে আলাপচারিতায় মগ্ন। এমনকী, প্রি স্কুলে নিজের অবাঙালি শিক্ষিকাদের সঙ্গেও। বাঙালির এই রাজত্ব বিস্তার কি আর বেশি দিন চলতে পারে? স্কুল থেকেই ডাক এল। শিক্ষিকা আমাদের অনুনয় বিনয় করে বললেন যে আর্ষার সঙ্গে কথোপকথন অসম্ভব হয়ে পড়ছে দিন কে দিন। কারণ তিনি বাংলা ছাড়া কিছুই বলেন না। বাড়িতে আর্ষার সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলার জন্য আমাদের অনুরোধ করা হল। আমরা মুখের উপর না বলে দিলাম। এর এক মাস বাদে আবার আর এক দিন স্কুলে গিয়েছি অন্য একটা কাজে। শিক্ষিকারা খুব গদগদ মুখে বললেন, ‘‘আর চিন্তা নেই, এখন আর্ষার সঙ্গে দিব্যি কথা বলছি আমরা।’’ প্রশ্ন করলাম, ‘‘কী করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন?’’ উত্তর এল, ‘‘আমরা বাংলা শিখছি।’’

ততদিনে আমাদেরই এক বন্ধু পিলু (রাজর্ষি বিদ্যার্থী) নিজের বাড়িতে গুটিকয়েক বাঙালি বাচ্চা নিয়ে শুরু করেছে ছুটির পাঠশালা। প্রবাসী বাঙালি বাচ্চাদের বাঙালি করে তোলার ক্লাস। আমরা হাতের মুঠোয় চাঁদ পেলাম। আমার কন্যা বাংলা লিখতে শিখল, রোল কলের সময় ‘উপস্থিত’ বলা শিখল, গান গাইতে শুরু করল তাও আবার সুরে, ‘জুতা আবিষ্কার’ নাটকে পন্ডিত মশাইয়ের রোলে কল্লোলের দুর্গাপুজোয় বেশ প্রশংসা কুড়লো। আমার ছাতি ছাপান্ন হল।

ঠিক যখন মনে হচ্ছিল যে শেষমেশ বোধহয় মেয়েকে সঠিক রাস্তায় বাঙালি করে তুলেছি। তখনই এক পুজোয় আমরা সপরিবার কলকাতা গেলাম, আর গিয়ে যা দেখলাম তাতে পিলে চমকাল, আক্কেলগুড়ুমও হল। ভেবেছিলাম কলকাতায় গিয়ে আর্ষা না হীনমন্যতায় ভোগে। যতই হোক, বম্বের বাঙালি তো…কিন্তু গিয়ে দেখলাম আর্ষার সমবয়সী বাচ্চারা অথবা কিছুটা বয়সে বড় ছেলেমেয়েরা, তারা কিন্তু বাংলা বলে না, বাংলা সাহিত্য পড়ে না, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান কি তা জানে না, ইলিশ মাছ খায় না, পৌষপার্বণ নিয়ে মাথা ঘামায় না, মুড়িঘণ্ট বা চচ্চড়ি খাওয়া পছন্দ করে না। স্তম্ভিত হলাম আর এল এক অদ্ভুত উপলব্ধি।

একটা আইডেন্টিটি তৈরি করা খুব প্রয়োজন হয় বিদেশ বিভুঁইয়ে। যেই আইডেন্টিটিটা বাঙালিয়ানা দেয় আমাদের। তাই, আমরা যারা বঙ্গদেশের বাইরে বাস করি, আমাদের বাঙালিয়ানা বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ বোধহয় একটু বেশি। এই আইডেন্টিটি আঁকড়ে বাঁচা যায়, এই আইডেন্টিটি আমাদের শিকড়ের গন্ধ দেয়। বাঙালিয়ানা আসলে এই গন্ধটাই…এই উপলব্ধিটাই। বাঙালিয়ানা একটা বেড়ে ওঠার রসদ। একটা চেতনা যা তৈরি করে এক মনন। নিজের সাহিত্য আর সংস্কৃতির স্বাদ আস্বাদন করার এক পথ।

বলতে দ্বিধা নেই, এই পথ, এই উপলব্ধি, এই চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখাটা বোধহয় বঙ্গদেশের বাইরে ততটাই সহজ যতটা কঠিন বঙ্গদেশের ভিতরে।

অলঙ্করণ: দেবাশীষ দেব

Advertisement