• শুভ্রপ্রকাশ মণ্ডল
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

আশ্বাস চেয়ারম্যানের, ডিভিসি-র হাতেই রঘুনাথপুর

Meeting
আলোচনা: কলকাতায় ডিভিসি-র সদর দফতরে পুরুলিয়ার দুই বিধায়ককে নিয়ে বৈঠক সংস্থার চেয়ারম্যান প্রবীরকুমার মুখোপাধ্যায়ের। নিজস্ব চিত্র

আর্থিক সঙ্কট কাটিয়ে ওঠায় রঘুনাথপুরের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র একাই চালাবে ডিভিসি। শুধু তাই নয়, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের অনিশ্চিত হয়ে পড়া কাজও চালু করার ইঙ্গিত মিলেছে। বৃহস্পতিবার কলকাতায় ডিভিসি টাওয়ারে পুরুলিয়ার শাসকদলের দুই বিধায়কের সঙ্গে বৈঠকে এ কথা স্পষ্ট করে দেন ডিভিসি-র নতুন চেয়ারম্যান প্রবীরকুমার মুখোপাধ্যায়। প্রচুর বকেয়া থাকায় ডিভিসি এক সময়ে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র অন্য সংস্থার সঙ্গে চালানোর প্রস্তুতি নেওয়ায় কর্মীদের মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, এ দিন তা কেটে গেল।

বৈঠকের পরে চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘পরিস্থিতি পুরো বদলে গিয়েছে। সমস্যা কাটিয়ে আর্থিক দিক দিয়ে ডিভিসি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। রঘুনাথপুরের প্রকল্প আমরা নিজেরাই চালাতে চাই।’’ তিনি জানান, ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম পর্যায়ের দু’টি ইউনিট থেকে শীঘ্রই পূর্ণমাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করার ব্যাপারে তাঁরা বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছেন।

এখানে প্রথম পর্যায়ে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা সম্পন্ন দু’টি ইউনিট তৈরি হয়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে একটি ইউনিট থেকে দৈনিক গড়ে ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বানিজ্যিক ভাবে তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু পর্যন্ত কয়লার অভাবে দ্বিতীয় ইউনিট চালু করা যাচ্ছে না।

ডিভিসি সূত্রের খবর, ঝাড়খণ্ড-সহ দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্যকে ডিভিসি বিদ্যুৎ বিক্রি করেও প্রচুর টাকা বকেয়া ছিল। আর্থিক সঙ্কটের কারণে রঘুনাথপুরের এই বিদ্যুৎকেন্দ্র যৌথ ভাবে চালানোর কথা ভেবেছিল ডিভিসি। বছর খানেক আগে এ নিয়ে এনটিপিসি এবং নেভেলি লিগনাইট কর্পোরেশনের সঙ্গেও আলোচনা চালানো হচ্ছিল। ২০১২ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার শিলান্যাস করে যাওয়া দ্বিতীয় পর্যায়ের ৬৬০ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দু’টি ইউনিট তৈরির কাজও বিশ বাঁও জলে চলে গিয়েছিল। তাই প্রকল্প ঘিরে সংশয় তৈরি হয়েছিল সব মহলেই।

এরই মধ্যে চলতি আর্থিক বছরে ডিভিসি প্রচুর বকেয়া আদায় করায় পরিস্থিতি বদলেছে। আদায় করা টাকার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৩০০ কোটি। সূত্রের খবর, পরিস্থিতির বদল হওয়ার পরেই রঘুনাথপুর নিয়ে মনোভাব বদলেছে সংস্থার শীর্ষ মহলের। এ দিন ডিভিসির সদর কার্যালয়ে রঘুনাথপুরের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্তাদের উপস্থিতিতে রঘুনাথপুরের বিধায়ক পূর্ণচন্দ্র বাউরি ও পাড়ার বিধায়ক উমাপদ বাউরিকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেন চেয়ারম্যান।

পূর্ণবাবু বলেন, ‘‘রঘুনাথপুরের বিদ্যুৎকেন্দ্র ডিভিসি একাই চালাবে শুধু নয়, প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্প তারাই করতে চাইছেন বলে জানিয়েছেন ডিভিসি-র চেয়ারম্যান।” ছ’বছর আগের ঘোযণা অনুয়ায়ী দ্বিতীয় পর্যায়ের এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার কোটা টাকা। এখন তা আরও বেড়েছে। কিন্তু কাজ আর থমকে রাখতে রাজি নয় ডিভিসি। এ দিন ডিভিসি-র চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘আমরা মনে করছি রঘুনাথপুরে দ্বিতীয় পর্যায়র বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়া দরকার। বিষয়টি নিয়ে সংস্থার পরিচালন পর্ষদের সভায় আলোচনার পরেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোদমে চালু করার ক্ষেত্রে এখনও কিছু সমস্যা রয়েছে। তা কাটাতে এ দিন বৈঠকে স্থানীয় বিধায়কদের হস্তক্ষেপ জরুরি বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান। পূর্ণবাবুর সক্রিয়তায় প্রকল্পের জলের পাইপ লাইন পাতার (ওয়াটার করিডর) কাজের জটিলতা কেটেছিল। এ বার ডিভিসি-র শীর্ষমহল চাইছে, রেললাইন পাতার কাজে তৈরি হওয়া জমির সমস্যা-সহ অন্যান্য ছোটখাটো জট কাটাতেও রাজ্য সরকার ও জেলা প্রশাসন সর্বোত ভাবে তাদের সাহায্য করুক। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে এই প্রকল্প নিয়ে ভীষণ আশাবাদী, সে কথা জানিয়ে ডিভিসি-কে আশ্বস্ত করেন দুই বিধায়ক।

তাঁরা বলেন, ‘‘জেলা সফরে এসে মুখ্যমন্ত্রী বারবার আমাদের ডিভিসি-র সমস্যা দেখার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা চেয়ারম্যানকে জানিয়েছি, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমস্যা মেটাতে সর্বোত ভাবে সাহায্য করা হবে।”

রঘুনাথপুরের শিল্পতালুকে এক মাত্র মুখ এখন এই বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফলে রাজ্য সরকার চাইছে ডিভিসি এখানে প্রকল্প আরও ভাল ভাবে করুক। তাই দোলাচল কাটিয়ে রঘুনাথপুরের প্রকল্প ডিভিসি একাই পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু করার আশ্বাস মেলায় শাসকদলও স্বস্তি পাচ্ছে।

ডিভিসি সূত্রের খবর, কয়লার অভাব মেটাতে সম্প্রতি আরসিআর (রেল কাম রোড করিডর) পদ্ধতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা আনার কাজ শুরু হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব রেলের তিনটি সাইডিং রুকনি, চৌরাশি ও রাধানগরে মালগাড়িতে পাশের ঝাড়খণ্ড থেকে কয়লা আসছে। সেখান থেকে সড়কপথে কয়লা ঢুকছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে। ডিভিসি-র এক কর্তা জানান, এখন দৈনিক পাঁচ হাজার মেট্রিক টন কয়লা আসছে। আরসিআর পদ্ধতিতে কয়লার জোগান বেড়ে দাঁড়াবে ১২ হাজার মেট্রিক টন। ফলে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে রঘুনাথপুরের প্রকল্পে অনন্ত ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান জানান, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে রেল করিডর তৈরির কাজ শেষ হয়ে গেলে, কয়লার জোগান আরও বাড়বে। ফলে আগামী বছর থেকে রঘুনাথপুরের প্রকল্পে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।

শুধু বকেয়া আদায়ই নয়, নতুন ক্রেতাও পেয়েছে ডিভিসি। ডিভিসি সূত্রে খবর, স্বল্পকালীন মেয়াদে তারা রাজ্য সরকারকে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রি করছে। বাংলাদেশকে আরও ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পরেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে ডিভিসি।

চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘আপাতত স্বল্পকালীন মেয়াদে চলতি মাসের জুন থেকে আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বিক্রির বরাত পাওয়া গিয়েছে। এপ্রিল মাসে পিপিএম (পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট) সম্পন্ন হবে। পরের ধাপে ২০২০ সালের জুলাই থেকে ১৫ বছরের জন্য বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ বিক্রি করবে ডিভিসি।’’ সূত্রের খবর, সেই বিদ্যুৎ রঘুনাথপুরের প্রকল্প থেকেই বিক্রির পরিকল্পনা আছে ডিভিসি-র। চেয়ারম্যান বলেন, ‘‘বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে। পরিস্থিতির বদল হতে শুরু করেছে। আর্থিক দিক দিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ডিভিসি।’’ সামনের আর্থিক বছরে সংস্থা পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি আশাবাদী।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন