উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানের বিভিন্ন জেলায় ঘুরলে একটা কথা খুব দেখা যায়, ‘বাংগালি ডাক্তার।’ প্রথমটা খটকা লাগে, ডাক্তারদের পরিচয় আবার ভাষা দিয়ে হয় নাকি? খোঁজ করলে জানা যায়, বাংলায় যাদের ‘হাতুড়ে’ বলা হয়, তারাই ওখানে ‘বাংগালি ডাক্তার।’ গত শতাব্দীর প্রথমার্ধেও গোটা উত্তর ভারত জুড়ে বাঙালি ডাক্তার, উকিল, ইঞ্জিনিয়ারদের যে প্রতিপত্তি ছিল,  সেই সূত্রেই হয়তো হাতুড়েদের এই ‘খ্যাতি।’ যে সব ডাক্তার কলকাতা থেকে উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানের বিভিন্ন শহরে গিয়ে পসার জমিয়েছিলেন, তাঁদের সহকারীরা ‘ডাক্তারি’ শিখে  নিজেরাই ‘ডাক্তারি’ শুরু করেন।

বাংলার বাইরে যাঁরা ‘বাংগালি ডাক্তার’, এ রাজ্যে তাঁরাই ‘রুরাল মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনার’, কিংবা গ্রামীণ চিকিৎসক। এঁদের সংখ্যা ডিগ্রি-পাওয়া ডাক্তারদের কয়েক গুণ, গ্রামগঞ্জে অসুখবিসুখে এঁরাই ভরসা। তবে এ দেশের আইনের চোখে এঁরা অপরাধী— বৈধ ডিগ্রি বা লাইসেন্স না থাকতেও ওষুধ লেখা, ওষুধ বিক্রি, এমনকী অস্ত্রোপচার অবধি করেন এই ডাক্তাররা, যার জন্য জেল-জরিমানা সবই হতে পারে। হয় না, তার কারণ এলাকায় এঁদের যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে। নিজেদের দাবি নিয়ে আন্দোলনও করছেন। কয়েক দিন আগে পত্রিকায় ছবি-সমেত খবর ছিল, গ্রামীণ চিকিৎসকরা কলকাতায় মিছিল করছেন স্বীকৃতির জন্য।

গ্রামীণ চিকিৎসকদের স্বীকৃতি দেওয়া উচিত কি না, সে বিতর্ক দীর্ঘ দিনের। মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং ডাক্তারদের নানা সংগঠনের যুক্তি, আধা-চিকিৎসক তৈরি করে তাঁদের বৈধতা দেওয়া যাবে না। গ্রামে হোক আর শহরে, ডিগ্রি যাঁদের রয়েছে, তাঁরাই রোগ নির্ণয় করবেন, ওষুধ দেবেন, অস্ত্রোপচার করবেন। আর কারও সে অধিকার থাকতে পারে না। এই অবস্থানের জন্যই তিন বছরের ডাক্তারি কোর্স চালু করার যে উদ্যোগ নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার, তার বিরোধিতা করেছিল মেডিক্যাল কাউন্সিল। ব্রিটিশ আমলের ‘এলএমএফ’ ডাক্তারদের প্রচলন পঞ্চাশের দশকে উঠিয়ে দেওয়ার পর, চিকিৎসক তৈরির অন্য কোনও স্বল্পমেয়াদি কোর্সকে কখনও ছাড়পত্র দেয়নি কাউন্সিল। এমনকী ‘নার্স প্র্যাকটিশনার’ (যে অভিজ্ঞ নার্সরা ছোটখাটো নানা অসুখের জন্য ওষুধের প্রেসক্রিপশন দেন)  পশ্চিম দুনিয়ায় চালু থাকলেও এ দেশে বৈধতা পায়নি। তার যুক্তি: প্রতিটি মানুষের জীবন অমূল্য, হাফ-ডাক্তারদের হাতে তা ছাড়া চলে না।

বিপক্ষের যুক্তি: পাশ-করা ডাক্তারের মুখ চেয়ে বসে থাকলে গরিবের চিকিৎসাই হবে না। প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রে ডাক্তাররা আসেন অনিয়মিত। ভারতের জনসংখ্যার নিরিখে যত পাশ-করা ডাক্তার চাই, তা তৈরি করার মতো মেডিক্যাল কলেজই নেই। আর পাশ করলেও ডাক্তাররা প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে থাকবেন, সে আশা নেই। অতএব হাতুড়েরা ছিলেন, থাকবেন। সম্প্রতি মালদহে নাইসেড-এর একটি সমীক্ষা বলছে, শহর-গ্রামে রোগীদের ৮১ শতাংশ যাচ্ছে হাতুড়েদের কাছে। অথচ সরকার, মেডিক্যাল কাউন্সিল উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজেছে। চিনের ‘খালি-পা ডাক্তার’, কিংবা বাংলাদেশে জাফারুল্লা চৌধুরীর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা বলছে, গ্রামের মানুষকেই ঠিকঠাক ট্রেনিং দিলে চিকিৎসার চাহিদা অনেকটা মেটানো যায়। তা হলে ভারতেই বা একটা অ্যান্টিবায়োটিক লিখতে পুরোদস্তুর ডাক্তারি ডিগ্রি লাগবে কেন?

এই পরিচিত বিতর্কে নতুন মাত্রা জুড়েছেন অর্থনীতির কিছু গবেষক। বিশ্বব্যাঙ্কের জিষ্ণু দাশের দাবি, গরিব গ্রামগুলোতে পাশ-করা  ডাক্তারদের চিকিৎসার মান বেশ খারাপ। পর পর কয়েক বছর সমীক্ষা করে জিষ্ণু বলছেন, রোগী কিছু বিশেষ লক্ষণ নিয়ে এলে ডাক্তারি শাস্ত্রমতে তাকে যে যে প্রশ্ন করা দরকার, কাজের বেলায় গরিব রোগীদের তার বেশির ভাগই করছেন না ডাক্তাররা। স্টেথো বসিয়ে দেখা, প্রেশার মাপার মতো ছোটখাটো পরীক্ষাও করছেন না। ফলে রোগ নির্ণয় আর তার চিকিৎসায় বড়সড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে অকারণ ওষুধ লেখা হচ্ছে প্রচুর। চিকিৎসা করাতে গিয়ে গরিব যে সর্বস্বান্ত হয়, তার চেয়েও বড় আক্ষেপ এই যে, তার টাকার বড় অংশই স্রেফ জলে যায়। জিষ্ণু তাই তাঁর রিপোর্টের নাম দিয়েছিলেন ‘মানি ফর নাথিং’, অর্থাৎ ফালতু খরচ। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গেও এমআইটি-র গবেষক অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জিষ্ণু দাশ গ্রামে চিকিৎসার মান নিয়ে সমীক্ষা করেছেন, যার রিপোর্ট ‘ল্যানসেট’ জার্নালে প্রকাশিত হবে শীঘ্রই। তবে আগের সমীক্ষাগুলি বলছে, ডাক্তারের ডিগ্রির জোরের চাইতেও রোগীর ট্যাঁকের জোর বড়। শহুরে, ধনী রোগীকে সরকারি-বেসরকারি সব ডাক্তারই ভাল চিকিৎসা দিচ্ছেন, আর গ্রামের গরিব রোগী সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও হাফ-চিকিৎসা পাচ্ছে।

ডাক্তারের ডিগ্রি থাকলেই গরিবের চিকিৎসা ভাল হয় না, এক দিকে এই কথাটা যত স্পষ্ট হচ্ছে, অন্য দিকে ততই প্রশ্ন উঠছে, গ্রামীণ চিকিৎসকদের অচ্ছুত করে রেখেই বা গরিবের কোন উপকারটা হচ্ছে? তার চাইতে তাঁদের ট্রেনিং দিয়ে একটা বৈধ জায়গা করে দিলেই তো হয়।

এত দিন এ প্রশ্নটা এই উচিত-অনুচিত, আইনি-বেআইনির আবর্তে ঘুরপাক খেত। কিন্তু এখন একটু এগিয়ে কথা বলা যাচ্ছে। গ্রামীণ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষিত করার অন্তত দুটো উদ্যোগ চোখের সামনে রয়েছে। গত ক’বছরে বেশ কয়েকটি ‘ব্যাচ’ পাশও করেছে। কাজটা করতে গিয়ে কী বুঝছেন প্রশিক্ষক ডাক্তাররা?

 

হিতে বিপরীত?

‘আমার একটাই চিন্তা। ভাল করতে গিয়ে মন্দ না হয়’— বললেন এসএসকেএম হাসপাতালের চিকিৎসক অভিজিৎ চৌধুরী। তিনি গ্রামীণ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ শুরু করেন ২০০৭ সালে বীরভূমে। এখন নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, পাথরপ্রতিমাতেও কোর্স চলছে। আবাসিক ৯ মাসের কোর্স, ৫০ জনের ব্যাচ। এই ক’বছরে দু’হাজারেরও বেশি গ্রামীণ চিকিৎসক পাশ করেছেন। অন্য দিকে, বাঁকুড়ার ছাতনার ফুলবেড়িয়া গ্রামে ১০ মাসের আবাসিক কোর্স করাচ্ছেন স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ পীযূষকান্তি সরকার ও তাঁর সহযোগীরা।   গত বছর পাশ করেছেন ২২ জন, এ বছর পড়ছেন ২০ জন। ব্যবস্থা আছে ৬০ জনের। পীযূষবাবু, অভিজিৎবাবুর দাবি, তাঁরা চিকিৎসাকর্মী তৈরি করছেন, চিকিৎসক নয়। পাশ করে নামের আগে ‘ডা.’ লেখা নিষিদ্ধ। অভিজিৎবাবু বলছেন, ছাত্রেরা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুসারে, রোগের লক্ষণের ভিত্তিতে কিছু নির্দিষ্ট অসুখের চিকিৎসায় নির্দিষ্ট ওষুধ দিতে পারে। পীযূষবাবু ওষুধ বা ইঞ্জেকশনের তালিকা সীমিত না করলেও, কেবল যে ওষুধগুলি সম্পর্কে শেখানো হয়েছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান ছাত্রদের।

প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য কী? দু’জনেই জানালেন: এক, ভুল চিকিৎসা, অকারণ ওষুধ লেখা কমিয়ে রোগীর ক্ষতি কমানো; দুই, গ্রামীণ চিকিৎসার অনিয়ন্ত্রিত ক্ষেত্র ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ করা। পীযূষবাবু মনে করেন, পঞ্চায়েতকে প্রশিক্ষিতদের নাম নথিভুক্ত করতে হবে। অভিজিৎবাবুর মত, স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে এঁদের স্বীকৃতি দেওয়া দরকার রাজ্য সরকারের।

এখনও অবধি অভিজ্ঞতা কী? অভিজিৎবাবু স্পষ্টই বললেন, এক-তৃতীয়াংশ ছাত্র বিষয়টি শিখছে, প্র্যাকটিসও বদলাচ্ছে। এক-তৃতীয়াংশ শিখছে, কিন্তু কাজের বেলায় প্র্যাকটিস বদলাচ্ছে না। বাকিরা শিখছেও না, প্র্যাকটিসও বদলাচ্ছে না। আরও চিন্তার কথা, দুটি কোর্স থেকেই বেশ কিছু ছাত্র ড্রপ-আউট হচ্ছে। এই ক্লাসছুটরাও কিন্তু রোগী দেখা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্য উদ্বেগটি হল, সরকার প্রশিক্ষণকে স্বীকৃতি দেবে কি না। “আমরা একটা মডেল তৈরির চেষ্টা করছি। কিন্তু সরকার যদি অ-প্রশিক্ষিতদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে, তা হলে কারও প্রশিক্ষণ নেওয়ার আগ্রহ থাকবে না,” বললেন পীযূষবাবু। শহরের ডাক্তারদের অনুকরণে হাতুড়েরা ওষুধ লেখায় যে ভাবে অ্যান্টিবায়োটিকে প্রতিরোধ ছড়াচ্ছে, তাতে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন তিনি।

নিয়ন্ত্রিত হওয়ার শর্তে প্রশিক্ষণ নিতে গ্রামীণ ডাক্তাররা কেন আগ্রহী হবেন? বাঁকুড়ার জয়পুরের এক গ্রামে এক প্রবীণ গ্রামীণ চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা হল। তাঁর কাছে চিকিৎসা প্রাপ্ত শিশুরা এখন পূর্ণবয়স্ক, তিনি দ্বিতীয় প্রজন্মের চিকিৎসা করছেন। বললেন, “যাদের রক্তচাপ খুব চড়ে গিয়েছে, যারা অনবরত বমি করছে, কিংবা প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, তাদের প্রাণদায়ী ইঞ্জেকশন, ওষুধ তো দিতেই হবে। প্রশিক্ষণের সীমায় নিয়ন্ত্রিত থাকলে যা করার কথা নয়, তা-ও করতে হতে পারে।”

গ্রামীণ চিকিৎসকরাই সংগঠন তৈরি করে যদি স্ব-নিয়ন্ত্রণ করেন? “সম্ভব নয়। যে কোনও সংগঠনের মতো, আমাদের সংগঠনও দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য। সদস্যদের মূল্যায়নের জন্য নয়।” আর, তাবড় তাবড় ডাক্তারদের স্বনিয়ন্ত্রণের দৌড় যা দেখা যাচ্ছে, তাতে আধা-ডাক্তারদের থেকে তা আশা করাও বোধহয় বাড়াবাড়ি।

গ্রামবাসীরা প্রশিক্ষিতদের বাড়তি মূল্য দেবেন, তার সম্ভাবনাও কম। বরং পাশ-করা ডাক্তার নাগালে থাকলেও অনেকেই বাড়তি আস্থা থাকায়, কিংবা খরচ কমাতে গ্রামীণ চিকিৎসকের কাছেই আসছেন। দাই ট্রেনিং কর্মসূচি যে তেমন সফল হয়নি, তার কারণ পাশ-করা দাইকে বাড়তি টাকা দিতে কেউ রাজি হয়নি। ডাক্তারদের বেলায়ই বা অন্য রকম হবে কেন?

এ সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো ক্রমশ স্পষ্ট হবে। চলতে চলতে যেমন পথ তৈরি হয়ে যায়, তেমনই গ্রামীণ চিকিৎসকদের নিয়ে কাজ করতে করতে গরিবের চিকিৎসার নীতি-রীতি তৈরি হবে। অন্তত গরিবের ‘স্বাস্থ্যের অধিকার’ নিয়ে বাগাড়ম্বর-সর্বস্ব আলোচনা থেকে সরে এসে গরিবের চিকিৎসার প্রয়োজন মেটানোর উপায় যে খোঁজা হচ্ছে, তাই বা কম কী।

 

রাঘবেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট, কলকাতা-র শিক্ষক