ভারতীয় রাষ্ট্রের ইতিহাসে নারীবিদ্বেষের যত নিদর্শন রয়েছে, ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন তার মধ্যে গণ্য হওয়ার দাবি রাখে। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সম্পর্কে যে তথ্য কেন্দ্র সংসদে পেশ করেছে, তা ফের এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। প্রক্রিয়া শুরুর আগে রাজ্যে প্রতি হাজার পুরুষে মহিলার সংখ্যা ছিল ৯৬৯, এ-যাবৎ যা সর্বাধিক। ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম সংশোধিত তালিকায় ওই অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৯৬৪। চোদ্দো বছরে এই প্রথম কমল পুরুষ-মহিলা অনুপাত। সংখ্যার হিসাবেও চিত্রটি যথেষ্ট উদ্বেগজনক— ওই তালিকায় যে ৬৩ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে, তার অর্ধেকেরও বেশি মহিলা— অন্তত ৩৩ লক্ষ। নাম মুছে যাওয়া মেয়েদের সংখ্যা পুরুষদের থেকে ৩-৪ লক্ষ বেশি। বহু নাম এখনও বিবেচনাধীন, কিন্তু সারা ভারতে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা বজায় থাকলে এ রাজ্যেও মহিলারাই খারিজ হবেন বেশি। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, উত্তরপ্রদেশ ও ছত্তীসগঢ় বাদে বাকি রাজ্যগুলিতে সাড়ে তিন কোটি ভোটার বাদ পড়েছেন, যাঁদের অর্ধেকের বেশি (প্রায় ৫৮ শতাংশ) মহিলা। উত্তরপ্রদেশে আড়াই কোটি ভোটারের দেড় কোটি, তামিলনাড়ুতে মোট ৯৪ লক্ষের মধ্যে ৫০ লক্ষ মহিলা। এসআইআর-এ মেয়েদের বিপর্যয়ের আগাম সঙ্কেত দিয়েছিল বিহার, যেখানে বাদ পড়েছেন ২৯ লক্ষ পুরুষ, আর ৩৬ লক্ষ মহিলা ভোটার। এসআইআর শুরুর আগে বিহারে ভোটার তালিকায় পুরুষ-মহিলা অনুপাত ছিল প্রতি হাজার পুরুষে ৯০৭ মহিলা। সংশোধনের পরে তা কমে দাঁড়াল ৮৯২-এ। লক্ষণীয়, যে রাজ্যে এসআইআর হয়নি, হয়েছে সাধারণ সংশোধন, সেই অসমে মহিলা ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে।
এ রাজ্যে ৩০ লক্ষেরও বেশি মহিলা ‘বহিরাগত’ এ এক অসম্ভব দাবি। এসআইআর-এর শর্তগুলি মেয়েদের পক্ষে পূরণ করা বিশেষ ভাবে দুঃসাধ্য, সরকার কি তা জানত না? জমির মালিকানায় নাম রয়েছে, এমন মহিলা বড় জোর ১৫ শতাংশ। বনপাট্টা যত দেওয়া হয়েছে, আবেদন খারিজ হয়েছে তার থেকে বেশি। ভোটার তালিকায় যত মেয়ের নাম রয়েছে, তাঁদের অর্ধেকেরও জন্মের সার্টিফিকেট নেই, অধিকাংশ জনজাতি গোষ্ঠীর মহিলার নামে জনজাতিভুক্ত সার্টিফিকেট নেই। এই অপ্রাপ্তির দায় সরকারের উপরেও বর্তায়। স্কুল পাশের সার্টিফিকেট না-থাকা কি মেয়েদেরই দোষ? বিবাহিত মেয়েদের নানা নথিতে নামের হেরফের হবে, তা কি সরকারের অজানা? ‘স্থানান্তরিত’ দেখিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে অজস্র মেয়েকে। পশ্চিমবঙ্গের কিছু বুথে খারিজদের মধ্যে মেয়েদের অনুপাত অস্বাভাবিক বেশি। অথচ, ভোটার তালিকায় নারী-পুরুষ সংখ্যার যেটুকু সমতা এসেছিল, তা পাওয়া গিয়েছিল অনেক বাধা পেরিয়ে। এক তো কন্যাসন্তানের প্রতি বিরূপতার জন্য জনসংখ্যাতেই মেয়েদের সংখ্যা কম। তার উপর প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নাম ভোটার তালিকাতে লেখানোর বিষয়েও পরিবার, প্রশাসনের অনীহা কাজ করেছে সব রাজ্যে।
এত বাধা ঠেলে ভারতের মেয়েরা গণতন্ত্রে একটা বিশেষ শক্তি হয়ে উঠেছিলেন। ভোটার তালিকায় ২০১৯ সালে যেখানে হাজার পুরুষে ৯১২ মেয়ে ছিলেন, সেখানে ২০১৯ সালে হলেন ৯২৬, ২০২৪ সালে ৯৪৮। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মেয়েদের ভোটদানের হার। নব্বইয়ের দশকেও মেয়েদের ভোটদানের হার ছিল অন্তত ১০ শতাংশ কম। তার পর এই ব্যবধান দ্রুত কমতে থাকে। ২০১৯ সালে মেয়েদের ভোটদানের হার ছাড়িয়ে যায় পুরুষদের হারকে। নির্বাচনী রাজনীতিতে মেয়েরা নিজেদের ইচ্ছার স্বাক্ষর রাখতে পেরেছিলেন, মেয়েদের ‘ভোটব্যাঙ্ক’ ভারতের রাজনীতিতে নির্ণায়ক হয়ে উঠেছিল। যা রাজনৈতিক দলগুলিকে বাধ্য করেছে পানীয় জল, সুলভে রান্নার গ্যাস, আবাস, নগদ হস্তান্তর-সহ নানা প্রকল্প শুরু করতে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির এই প্রক্রিয়ায়, নারী-পুরুষ সাম্যের আকাঙ্ক্ষায় আঘাত হানল এসআইআর।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)