E-Paper

অসুন্দরের অত্যাচার

কারণ খুঁজতে গেলে দুটো কথা শোনা যায়। এক, ‘উপর থেকে নির্দেশ’। আর দুই, স্থানীয় নেতাদের শখ।

স্বাতী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৮
মূর্তিরূপেণ: কিশোরকুমার ও সত্যজিৎ রায়ের (বাঁ দিকে) মূর্তি।

মূর্তিরূপেণ: কিশোরকুমার ও সত্যজিৎ রায়ের (বাঁ দিকে) মূর্তি।

শহর কি আর কেবল বসবাস, যাতায়াত, কাজকর্মের জায়গা? প্রতিটি শহরের থাকে তার নিজের আলো-ছায়াময় চরিত্র, ঐতিহ্যের গুমোর, শখের প্রাণ। শহরবাসীর নিতান্ত ব্যক্তিগত অনুভূতিও আসে শহরের দৈনন্দিন ছবি, ধ্বনি, গন্ধের হাত ধরে— “ভোরের ট্রামের মতো প্রেমের স়ঞ্চার মানুষের দেহে-মনে” (শক্তি চট্টোপাধ্যায়, ‘কলকাতায়, ভোরে’)। শহর সাজানোর কাজ তাই শহরবাসীর অন্তর্জগতে প্রবেশেরও পথ। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকার এসে নগর সৌন্দর্যায়নের কাজটি হাতে নিয়েছিল বেশ উৎসাহের সঙ্গে। রাস্তার রেলিঙে, ফুটপাতের স্কার্টে উজ্জ্বল রং, খালের পাশে উদ্যান, নতুন নকশার পথবাতি, পার্কগুলোর ভোলবদল, শহরের কেন্দ্রে মোহরকুঞ্জ, প্রান্তে ইকো পার্ক— নয়া শুরুয়াতের একটা স্বাদ লেগেছিল শহরের জিভে।

অচিরে খুশির হাসি হয়ে দাঁড়াল বাঁকা হাসি। বিধাননগর স্টেডিয়ামের সামনে পেশিবহুল দু’টি পায়ের উপর একটি ফুটবলের, লেক টাউনে ফুটবলার মেসির সোনালি অবয়ব যখনই বসেছে, বয়ে গিয়েছে চুটকির ঝড়। সমাজমাধ্যমে মন্তব্য, “চেয়েছিলাম বার্সেলোনার মেসি, পেলাম বারাসতের মেসি।” পাটুলির রাস্তায় উত্তমকুমার, মান্না দে-র মূর্তি দেখে এক নাগরিকের মন্তব্য, “নীচে লেখা নাম দেখেও বিশ্বাস হয় না।” কানাঘুষো, পূর্ব কলকাতার এক মূর্তি-বহুল ওয়র্ডে কোনও এক বিখ্যাত ব্যক্তির মূর্তি উদ্বোধনে এসে তাঁর পুত্র নাকি পাশের মূর্তিটির গলায় মালা পরাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন।

“ভুলভাল কথা বলার চেয়ে চুপ করে থাকা যেমন ভাল, তেমনই শ্রীহীন, খাপছাড়া কিছু মূর্তি, সৌধ, ছবি এ দিক-ও দিক ছড়িয়ে থাকার চেয়ে, না থাকা অনেক ভাল।” কথাগুলো বললেন এক সুপরিচিত শিল্পী। বিষয়টা হালকা করে নেওয়ার নয়। “স্মৃতির নির্মাণে দৃশ্যাবলি বিশেষ প্রভাব ফেলে। তাই কুৎসিতের ক্ষতি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী।”

গ্রামকে বেছে নিয়েছেন কাজের ক্ষেত্র হিসেবে, কলকাতার এমন এক শিল্পী বললেন, “শহরে এসে চার দিকে ‘শিল্প’ বলে যা দেখি, অধিকাংশই সস্তা ভাবনা, খারাপ মানের কাজ। আমাদের ডোকরা, মুখোশ, কাঠের পুতুল, পাথর খোদাই, কী না আছে। সেগুলো কি আনা যেত না শহর সাজাতে? পুজোপ্যান্ডেলগুলো যে এত অপরূপ হয়ে উঠতে পেরেছে, সে তো শহরের শিল্পীদের সঙ্গে গ্রামের শিল্পী-কারিগরদের মিলনের জন্যেই।”

এর কারণ খুঁজতে গেলে দুটো কথা শোনা যায়। এক, ‘উপর থেকে নির্দেশ’। আর দুই, স্থানীয় নেতাদের শখ। কলকাতা কর্পোরেশন সূত্রে খবর, কাউন্সিলর বা বিধায়করা ‘সৌন্দর্যায়ন’-এর নানা প্রস্তাব পাঠান। সাধারণত মনীষীদের মূর্তি গড়ার প্রস্তাবে ‘না’ বলার ঝুঁকি নেন না আধিকারিকরা। অতঃপর কখনও টেন্ডার ডেকে, কখনও নেতার নিজের জোগাড়-করা টাকায় তাঁর পছন্দের শিল্পী দিয়ে মূর্তি তৈরি হয়। অধিকাংশই ফাইবারের। দেখলে সহসা ঠাহর হয় না, মাদার টেরিজ়া না কি মাতঙ্গিনী হাজরা। আঠারো ফুট মূর্তির স্থান হয় ফুটপাতে, কিংবা দু’টি ব্যস্ত রাস্তার মাঝে এক টুকরো জমিতে। দর্শক কোথায় দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ ভাস্কর্যটি দেখবেন, সে চিন্তাটা কাজ করেনি। নেতাজি কি বিবেকানন্দকে আপাদমস্তক দেখতে চাইলে গাড়ি চাপা পড়তে হবে।

জাদুঘর, আর্ট গ্যালারিতে আটকে না-রেখে, শিল্পকে সর্বসাধারণের কাছাকাছি আনার একটা তাগিদ কাজ করেছে তৃণমূল নেতাদের মধ্যে, তা বেশ বোঝা যায়। তবে সে কাজেরও একটা শৈলী রয়েছে। ‘সকলের জন্য শিল্প’ সকলে করতে পারে না। গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট-এর এক প্রাক্তন শিক্ষকের বক্তব্য, কেন লন্ডনের বিগ বেন-এর অনুকরণ বসবে লেক টাউনের মোড়ে, আর তার লেজ ধরে অগণিত বনসাই ঘড়ি টাওয়ার বসবে নানা পাড়ায়? তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে প্রথিতযশা, সম্মানিত শিল্পীরা তো আছেন। তাঁদের শিল্পের নিদর্শনও দেখা যায়— তারামণ্ডলের বিপরীতে ভাষাশহিদের মূর্তিটি যোগেন চৌধুরীর। শুভাপ্রসন্ন-নির্মিত ভাষাশহিদ বেদি বসেছে দেশপ্রিয় পার্কে। কিন্তু শহরের সৌন্দর্যায়ন পরিকল্পনায় পরিণত শিল্পীর নান্দনিক বোধের কোনও ছাপ পাওয়া যায় না, আক্ষেপ ওই শিক্ষকের। “রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত স্থাপত্য, ভাস্কর্যের একটা আভিজাত্য থাকার কথা। তা কোথায়?”

কলকাতা পুরসভা বা হিডকো যদি শিল্পী-ভাস্করদের কোনও কমিটির পরামর্শে কাজ করত, তা হলে হয়তো কলকাতার রাস্তার শিল্প বেদনা-বিদ্রুপের বিষয় না-হয়ে গর্বের, আনন্দের উৎস হতে পারত। এখন মনে ঠোকর দিয়ে যায় প্রশ্ন, এটা কী? এখানে কেন? এক শিল্পী বলছিলেন সায়েন্স সিটির উল্টো দিকে মিলন মেলা প্রাঙ্গণের কথা। আগে ছিল লোহার কাঠামোর উপরে ঢেউ-খেলানো খয়েরি টিনের আটচালা ছাউনি। “গ্রামীণ শিল্পীদের হাতের কাজ প্রদর্শনী যখন হত, মেলা প্রাঙ্গণের স্থাপত্য, রং, টেক্সচার, সব কিছুর সঙ্গে মিলে যেত গ্রাম থেকে আসা মানুষের চেহারা, পোশাকের রং, শিল্পকর্ম। অচিরে তার জায়গা নিল দুধসাদা রঙের অতিকায় ফানেল আকৃতির প্যাভেলিয়ন, বিদেশি নির্মাণের অনুকরণে। গ্রামের মানুষগুলো হয়ে গেল বেমানান।” আধুনিকতার এমন “ভূতুড়ে প্রকাশ” নিয়ে আক্ষেপ করছিলেন ওই শিল্পী। তেমনই ভূতুড়ে লাগে অপরূপ দুর্গামূর্তিকে ফুটপাতে সারা বছর হাত-পা মেলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। চার দিনের ধূপ-ধুনোর পর সারা বছর কাটা তেলের ধোঁয়া।

তৃণমূল আমলে সমাজ উন্নয়ন পরিকল্পনার যে ধাঁচ দেখা যায়, তা-ই দেখা যায় নগর সৌন্দর্যায়নে— নীতির পালনের থেকে ব্যক্তির ইচ্ছার অনুসরণ। সরকারের ইচ্ছাতে আলিপুর জেল একটি অসাধারণ মিউজ়িয়মে রূপান্তরিত হয়েছে। আবার, সরকারি ইচ্ছার অভাবে বন্ধ গুরুসদয় দত্ত মিউজ়িয়ম। তার পটচিত্র, নকশি কাঁথা পোকায় কাটছে কি না, ভেবে বিমর্ষ বিদ্বজ্জনেরা। সংস্কারের পর টাউন হল চমৎকার সেজেছে। পুরনো কলকাতা-বিষয়ক বইয়ের ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি পুরসভার প্রশংসনীয় কাজ। পাশাপাশি, সরকার গ্রন্থাগারিক নিয়োগ না-করায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-সহ বহু প্রাচীন লাইব্রেরির বিরল সংগ্রহ নষ্ট হচ্ছে।

প্রকৃতির সম্পদের সুরক্ষার ছবিটাও তেমনই। পুরসভার দাবি, সাড়ে আট হাজার জলাশয়ের রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। কিন্তু ‘ল্যান্ড রেকর্ডস অ্যান্ড সার্ভে’ দফতরের সমীক্ষা (২০২৩) বলছে, পূর্ব কলকাতার তেতাল্লিশটি ওয়র্ডে অন্তত আট হাজার ভেড়ি, জলাশয় বুজে গিয়ে বাড়ি উঠেছে। জলের মতো, হারাচ্ছে গাছও। পুরসভার হিসাব, ২০১৯-২৩ সময়কালে কলকাতায় পাঁচ লক্ষেরও বেশি গাছ লাগানো হয়েছে। পথ-বিভাজিকায়, পথের ধারে বাঁশের বেড়া-ঘেরা জমিতে মাথা দোলাচ্ছে ফক্স-টেল পাম, জারুল, বকুল। ও-দিকে কেন্দ্রের ‘ইন্ডিয়া স্টেট অব ফরেস্ট রিপোর্ট’, ২০২১ বলছে, ২০১১-২১ সময়কালে নগর-অরণ্যের সবুজ আচ্ছাদন ৩০ শতাংশ খুইয়েছে কলকাতা। শহর এলাকার এক শতাংশেরও কম অরণ্য নিয়ে মুম্বই, দিল্লি, চেন্নাইয়ের থেকে পিছিয়ে কলকাতা।

কলকাতার প্রায় সব ওয়র্ডে ঢোকার মুখে চোখে পড়ে বড় বড় আলোকিত বোর্ড, ‘আই লাভ ওয়র্ড অমুক।’ অনেকটা জায়গা, অনেকটা আলো, অনেক বড় অক্ষরে না লিখলে যেন জুতসই হয় না ভালবাসার ঘোষণা। তৃণমূল সরকারের সৌন্দর্যায়নের চরিত্র এই অনাবশ্যক আতিশয্য— ল্যাম্পপোস্টের গায়ে জড়ানো চিনে আলোর ফিতে তার অন্যতম একটি প্রতীক। যেন সারা বছর ক্রিসমাস, সারা বছর পুজো। অন্য প্রতীক হল ‘ফ্লেক্স কালচার’। আকারে অতিকায়, সংখ্যায় অজস্র, দূষণে একশো শতাংশ, সৌন্দর্যে শূন্য। এক শিল্পী বললেন, “দেওয়াল লিখনে তবু আঁকিয়ের নিজস্বতা ছিল, একটা নান্দনিকতা ছিল। ফ্লেক্স সে সব ঘুচিয়ে দিয়েছে।” যত ভোট এগিয়ে আসবে, তত নাগরিকের দৃষ্টিপথ দখল করবে ফ্লেক্স। অসুন্দরের অত্যাচারে অবসন্ন মন অনুচ্চারে বলবে— এগুলো না থাকলেই কি ভাল থাকতাম না?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Kishore Kumar Satyajit Ray

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy