সীমান্তে একটা চালু প্রবাদ আছে— ‘বর্ডারে বাস, ভাবনা বারো মাস।’ আর সেটা যদি নদী-সীমান্ত হয় তা হলে সমস্যা বেড়ে যায় আরও বহু গুণ। সম্প্রতি পদ্মায় ইলিশ ধরাকে কেন্দ্র করে একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গিয়েছে। মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি এলাকা থেকে তিন জন মৎস্যজীবী মাছ ধরতে পদ্মায় নেমেছিলেন। অনেক সময়েই পদ্মায় দু’দেশের সীমারেখা বুঝতে পারেন না মৎস্যজীবীরা। এ ক্ষেত্রেও হয়তো তেমনটাই ঘটেছিল। ওই তিন মৎস্যজীবী ঢুকে পড়েছিলেন বাংলাদেশের রাজশাহির চারঘাট উপজেলা সদরের বালুঘাট এলাকায়। ঘটনার সূত্রপাত সেখান থেকেই।

সংবাদমাধ্যম থেকে জানা গিয়েছে, প্রণব মণ্ডল নামে এক মৎস্যজীবীকে বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) আটকে রাখে। দু’জনকে ছেড়ে দেয়। প্রণবকে ছাড়াতে বিএসএফ জওয়ানেরা বাকি দুই মৎস্যজীবীকে নিয়ে বিজিবি-র সঙ্গে ‘ফ্ল্যাগ মিটিং’ করতে যায়। এবং পরে উভয় পক্ষের মধ্যে গন্ডগোল শুরু হয়। 

অভিযোগ, বেগতিক দেখে বিএসএফ যখন ওই দুই মৎস্যজীবীকে নিয়ে ফিরছিল তখন পিছন থেকে গুলি করে বিজিবি। গুলিবিদ্ধ হয়ে এক বিএসএফ জওয়ান মারা যান। আর এক জন গুরুতর জখম। বিজিবি-র তরফে অবশ্য দাবি করা হয়েছে, আত্মরক্ষার জন্যই তারা গুলি চালিয়েছে। 

এ দিকে, প্রণব মণ্ডল নামে ভারতীয় ধীবরকে তুলে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের হাতে। আর বিএসএফও জলঙ্গি থানায় বিজিবি-র বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করা হয়েছে। চকিতে এই হচ্ছে ঘটনা।

এ বারে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু অভিজ্ঞতা ও বাস্তব চিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। লেখার শুরুতেই বলেছি, বর্ডারে থাকলে বছরভর নানা ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়। জলঙ্গির কাকমারি সীমান্তে ওই ঘটনার পরে চরম দুশ্চিন্তায় আছেন প্রণব মণ্ডলের পরিবার। প্রণব কবে ফিরবেন, কী ভাবে ফিরবেন, না ফিরলে সংসার চলবে কী করে তা নিয়ে ভেবে ভেবে ঘুম উড়ে গিয়েছে তাঁর পরিবারের সদস্যদের। যে দু’জন ধীবর অক্ষত অবস্থায় ফিরেছেন তাঁরাও স্বস্তিতে নেই। কারণ, ঘটনার সময় তাঁরাও বিএসএফের সঙ্গেই ছিলেন। ফলে বার বারই ডাক পড়ছে বিএসএফ ক্যাম্প থেকে। 

এ বারে পদ্মাপাড়ের ধীবরদের কথায় আসা যাক। বলাই বাহুল্য, পদ্মা আর আগের মতো সদয় নয়। বছর কয়েক আগেও জাল নিয়ে পদ্মায় নামলেই ইলিশ না হলেও কিছু না কিছু মাছ উঠতই। এখন সে গুড়েও বালি। ক্যালেন্ডারে বর্ষা এলেও বৃষ্টির দেখা মেলে না। তবে এই সময়টার অপেক্ষায় থাকে পদ্মাপাড়ের মৎস্যজীবীরা। কারণ, এই সময় সামান্য হলেও ইলিশ ঢুকতে শুরু করে। আর পদ্মার ইলিশের বাজারও ভাল। ঠিক সেই কারণেই ধীবরা ধার-দেনা করে জাল ও নৌকার বন্দোবস্ত করেন। কাকমারি চরের ধীবরেরাও তাই করেছিলেন। কারণ, এই সময় কিছু ইলিশ ধরে বাজারে বিক্রি করতে পারলেই হাতে আসবে কিছু টাকা। কিন্তু সে সব আশা এখন জলে। এই ঘটনার পরে ধীবরেরা আর পদ্মায় নামতে পারছেন না। ফলে রুটি-রুজি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেল।

সংবাদমাধ্যম থেকেই জানতে পেরেছি, এই ঘটনার পরে অনেকেই বলছেন, ‘এমনটা আগে কখনও ঘটেনি।’ কিন্তু বাস্তব বলছে অন্য কথা। আমার নিজের বাড়িও পদ্মাপাড়েই। একটা সময় নদী ভাঙনে ঘর-বাড়ি-খেত-খামার সবই গিলেছে পদ্মা। আবার পদ্মাপাড়েই ঘর বাঁধার কারণে বিএসএফ-বিডিআরের (এখন অবশ্য বিজিবি) একাধিক ‘ফ্ল্যাগ-মিটিং’-এ উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছে। তেমনই এক বৈঠকে গুলি যে চলেনি তা নেহাতই আমার বরাতজোর। 

তবে তার আগে ‘ফ্ল্যাগ মিটিং’ সম্পর্কে সংক্ষেপে একটু জানিয়ে রাখি। সাধারণ সীমান্তে ছোটখাট কিছু সমস্যা হলে তা দু’দেশের সীমান্তরক্ষী ও স্থানীয় বিশিষ্ট কিছু লোকজনের উপস্থিতিতে মিটিয়ে ফেলা হয়। পোশাকি ভাষায় এরই নাম ফ্ল্যাগ মিটিং। 

সালটা ১৯৯৫। একটা গরু চুরিকে কেন্দ্র করে দু’দেশের সীমান্তেই উত্তেজনা তৈরি হয়। ফ্ল্যাগ মিটিং হয়েছিল বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। সেখানে বিএসএফের সঙ্গে উপস্থিত ছিলাম আমিও। বৈঠক চলাকালীন হঠাৎ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আমিও বিডিআরের (তখনও বিজিবি হয়নি) একটি কথার প্রতিবাদ করি। সঙ্গে সঙ্গে তাদের এক জন আমার মাথার দিকে তাক করে রাইফেল ধরে। 

অপ্রত্যাশিত সেই ঘটনায় আমার মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। মুহূর্তে বিষয়টির রাশ ধরেন দুই বিএসএফ জওয়ান। তাঁরাও ওই বিডিআরের দিকে এসএলআর উঁচিয়ে ধরে। পরে অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। বালুঘাট এলাকায় জওয়ানদের পাশাপাশি ওই দুই মৎস্যজীবীরও কিন্তু বিপদ ঘটতেই পারত। সেটা যে ঘটেনি তা নেহাত কপাল-জোরেই। 

এ বার বলি ১৯৮৩ সালের একটি ঘটনার কথা। সীমান্ত তখন বেশ অশান্ত। এখনকার মতো এত নিরাপত্তা, কাঁটাতারের বেড়া, বর্ডার রোড কিছুই ছিল না। চুরি, ডাকাতি, খুন, জখম ছিল প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। সে বার বাংলাদেশের এক দুষ্কৃতীকে তাড়া করেছিল নাসিরেরপাড়া ক্যাম্পের বিএসএফের এক জওয়ান। দুষ্কৃতীকে অবশ্য তিনি ধরতে পারেননি। কিন্তু সেই জওয়ানকে ধরে ফেলে বাংলাদেশের কিছু দুষ্কৃতী। পরে সেই জওয়ানের ক্ষতবিক্ষত দেহ মেলে বাংলাদেশের আখের খেতে। 

পরে নাসিরেরপাড়া সীমান্তের নিরাপত্তা বাড়াতে আরও একটি আউটপোস্ট তৈরি করা হয়। এবং উদয় সিংহ নামে নিহত সেই জওয়ানের স্মৃতিতে ওই পোস্টের নাম রাখা হয় ‘উদয় পোস্ট’। শোনা যায়, সে বারে নাকি ওই জওয়ান দুষ্কৃতীকে তাড়া করার সময় ভুল করে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েছিলেন। কোনও ফ্ল্যাগ মিটিং-এর সুযোগ না দিয়েই সঙ্গে সঙ্গেই হিসেব বুঝে নিয়েছিল বাংলাদেশের দুষ্কৃতীরা। 

হিসেব বুঝে নেওয়ার পালা এখনও চলছে। প্রতিদিন। যদিও সে হিসেব সব সময় মেলে না। মোদ্দা কথাটা হল, সীমান্তে যাই ঘটুক না কেন বার বার তার মাসুল গুনতে হয় সাধারণ মানুষকে। যাঁরা স্বেচ্ছায় কেউ সীমান্তে থাকতে আসেন না। নিরুপায় হয়েই তাঁরা সীমান্তে থাকতে বাধ্য হন। এটা দু’দেশ ও দু’দেশের সীমান্তরক্ষীদের বোঝা উচিত। নইলে মানুষ চাঁদে বসতি গড়বে। কিন্তু সীমান্তের ললাট-লিখনে তখনও জ্বলজ্বল করবে অনিশ্চয়তা আর ভয়।