নিজের ‘কীর্তি’ সেলফোনের ক্যামেরায় ধরে রাখতে উদগ্র হয়ে পড়েছিলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসের স্ত্রী। কিন্তু সে নিজস্বী এতটা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন হবে, তা বোধহয় অমৃতা ফডণবীস কল্পনা করেননি। মুম্বই-গোয়া প্রমোদ তরণীতে উঠে অমৃতাদেবী যে ভাবে নিজস্বীতে বুঁদ হতে চেয়েছেন, তাতে আর পাঁচটা সাধারণ নিজস্বীর মতো শুধু বহিরঙ্গের ছবি ধরা পড়েছে, এমনটা ভাবলে ভুল হবে। অন্তরের অসীম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ছবিটাও নিদারুণ ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী-জায়া।

মুম্বই-গোয়া প্রমোদ তরণীটি মাঝ সাগরে। এমন অবস্থায় জাহাজের ডেকের একেবারে কিনারায় চলে গেলেন অমৃতাদেবী। যাবতীয় নিষেধ এবং সতর্কবার্তা নস্যাৎ করে দিয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করে গেলেন। তার পর জাহাজের ডেক্‌ থেকে পা ঝুলিয়ে বসে নানা ভঙ্গিতে, নানা কৌণিক বিন্দু থেকে, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে নিজের ছবি তুলতে থাকলেন।

জাহাজ যখন মাঝ সমুদ্রে, তখন পাটাতনের একেবারে কিনারায় গিয়ে ওই রকম কার্যকলাপে বিপদ ঘটতে পারে, এমনটা মুখ্যমন্ত্রী-জায়া মোটেই জানতেন না— এ রকম কোনও তত্ত্ব কেউ খাড়া করবেন না বলেই আশা রাখা যায়। প্রমোদ তরণীতে উপস্থিত পুলিশকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীরা মুখ্যমন্ত্রী-জায়াকে বার বার সতর্কও যে করেছিলেন, সে কথাও বোধহয় অস্বীকার করার মতো নয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন, তিনি প্রায় অপ্রতিরোধ্য ছিলেন।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

সোশ্যাল মিডিয়ায় যাঁদের নিত্য বা নিয়ত আনাগোনা, তাঁদের এক বিরাট অংশকে নিজস্বী যেন নেশাতুর করে তুলছে ক্রমশ। বিপজ্জনক অবস্থানে নিজস্বী নেওয়া আবার বিশেষ সক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করেছে একাংশের মধ্যে। সেই ‘বিশেষ সক্ষমতা’র প্রমাণ দিতে ‘রোমাঞ্চকর নিজস্বী’র তাড়নাও ক্রমশ বাড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ার জীবদের মধ্যে। এ বার দেখা গেল, খোদ মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী-ও সে তাড়নার শিকারে পরিণত হতে পারেন।

আরও পড়ুন: পুলিশের সামনেই জাহাজের কার্নিশে পা ঝুলিয়ে দেদার সেলফি! কে এই মহিলা?

প্রথমত, অমৃতা ফডণবীস আইন ভেঙেছেন। নিজস্বী নেওয়া বা না নেওয়া পরের কথা। মাঝ সমুদ্রে থাকা জাহাজের কোন অংশে যাওয়া যায়, কোনও অংশে যাওয়া নিষিদ্ধ, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধি রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রীর হওয়ার সুযোগ নিয়ে সে সব বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়েছেন অমৃতা ফডণবীস। নিরাপত্তাকর্মীদের নিষেধ অগ্রাহ্য করে বিপদসীমা অতিক্রম করে গিয়েছেন। তাঁর প্রাণসংশয় ঘটতে পারত। সে ক্ষেত্রে কিন্তু দায় বর্তাত ওই নিরাপত্তারক্ষীদের ঘাড়েই, যাঁরা প্রায় অসহায় হয়ে পড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী-জায়ার বিপজ্জনক কার্যকলাপের সামনে।

দ্বিতীয়ত, জীবন বিপন্ন করে নিজস্বী নেওয়ার প্রবণতা অনেকগুলো প্রাণ নিয়ে নিয়েছে ইতিমধ্যেই। প্রশাসন বার বার এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা জারি করছে। পরিস্থিতি যখন এ রকম, তখন অমৃতা ফডণবীসের মতো নাগরিকদের থেকে কী প্রত্যাশিত? সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত। কারণ তাঁর মতো বিশিষ্ট নাগরিকরা সহজেই সমাজের কাছে রোল মডেল হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু অমৃতা ফডণবীস ঠিক বিপ্রতীপ অবস্থানে চলে গেলেন। তাঁর এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের ছবি যে আরও অনেককে বেপরোয়া করে তুলবে, আরও অনেক প্রাণকে বিপন্ন করবে, অমৃতা ফডণবীস তা বুঝতে পারলেন না একেবারেই।

মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রীয়ের এই আচরণ শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, সমাজের একটা অংশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনকও তাঁর এই আচরণ।