সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

হারিয়ে যেতে বসা পুতুলনাচ ‘চদর বদর’

এই পুতুলনাচের পোশাকি নাম ‘চাদর বাঁধনি’। গ্রাম্য ভাষায় এরই নাম ‘চদর বদর’। এই পুতুল নাচানো সাঁওতালি সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন। হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পের হাতেগোনা কয়েক জন শিল্পী আজও রয়েছেন বীরভূমে। লিখছেন বিজয় ঘোষাল

Folk artists
চদর বদর খেলা দেখাচ্ছেন শিল্পীরা। ছবি: লেখক

Advertisement

লোকসংস্কৃতি তথা লোকায়ত জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পুতুলনাচ। লোকশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে পুতুলনাচের ভূমিকা চিরকালীন। এখানে অচেতন পুতুলকে চালনা করা হয় শিল্পীর দক্ষতায়। পুতুলনাচের মাধ্যমে লোকায়ত জীবনের নানা দিক প্রকাশিত হয়। আসলে লোকসংস্কৃতি হল এমন একটি মৌলিক কলা, যা বংশপরম্পরায় বা গোষ্ঠী পরম্পরায় চলতে থাকে। এই সংস্কৃতির প্রতিফলন ক্ষেত্র যেমন গ্রামীণ সমাজ, তেমনই এই সংস্কৃতি প্রসারে যুক্ত আছে গ্রামের তথাকথিত সহায় সম্পদহীন প্রান্তিকস্তরের জনগোষ্ঠী। পুতুলনাচকেও লোকায়ত শিল্পের আঙিনায় আনা যেতেই পারে। 

গ্রাম বাংলার বেশ কিছু পুতুলনাচ আজ লুপ্তপ্রায়। পুতুলনাচের তেমনই এক ধারা অন্তত ৩০ বছর আগেও বীরভূম, বর্ধমান, বাঁকুড়া-সহ কিছু জেলায় ভাল ভাবেই টিকে ছিল। আজ গোটা বাংলায় হাতেগোনা কয়েক জন কর্মী সেটিকে অবলুপ্তির গ্রাস থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এই পুতুলনাচের পোশাকি নাম ‘চাদর বাঁধনি’। গ্রাম্য ভাষায় এরই নাম ‘চদর বদর’। এটি সাঁওতালি শব্দ। ‘চদর বদর’ নাচানো সাঁওতালি সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন। ‘চদর বদর’ আদিবাসী নিজস্ব ঘরানার পুতুলনাচ, যা কোনও পশ্চিমী দেশ থেকে অনুসৃত নয়। নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ধরে রাখার প্রয়াস, আদিবাসীদের সারল্য, প্রযুক্তি এই পুতুলনাচের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। বাংলার মৃতপ্রায়, সুপ্রাচীন অথচ আলোচনা-গবেষণার আড়ালে থেকে গিয়েছে সাঁত্ততালি লোকায়ত শিল্পের এই আঙ্গিকটি। তাই ‘চদর বদর’ পুতুলনাচের আলোচনা আজ খুবই প্রাসঙ্গিক। খুব কম লোকেরই এই সাঁত্ততালি লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান আছে। যদিও আগের মতো এই পুতুলনাচের খুব ব্যাপকতা নেই। এই লোকায়ত শিল্পের সে ভাবে কোনও সামাজিক স্বীকৃতি নেই, কোনও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতাও জোটে না। কিন্তু, ‘চদর-বদর’ আজও কিছু কিছু এলাকায় বেঁচে রয়েছে স্রেফ কিছু প্রান্তিক মানুষের তাঁদের নেশাকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছের সুবাদে। 

তেমনই কয়েক জন আছেন বীরভূম জেলাতেও। গোপালনগর ও নিমডাঙায় আজও ‘চদর বদর’ পুতুলখেলা দেখিয়ে বেড়ান সুকল, চুরকু খান্দু মার্ডিরা। বীরভূমের ‘চদর বদর’ পুতুলনাচের খোঁজ পাওয়া গেল গোপালনগর-কামারপাড়া ও নিমডাঙা গ্রামে। যদিও ‘চদর বদর’-এর শিল্পীরা বীরভূম ছাড়া লাগোয়া ঝাড়খণ্ডের দুমকা এবং উত্তর দিনাজপুরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। সমাজকর্ম বিভাগের ছাত্র হওয়ার দরুন, গোপালনগর ছিল আমার ক্ষেত্রসমীক্ষার স্থান। এই গ্রামে দু’বছরের বেশি সমীক্ষা করে ‘চদর-বদর’-এর শিল্পী চরুকু, সুকল, খান্দু মার্ডিদের পুতুলনাচ চাক্ষুষ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। গোপালনগরে, ৩০টির কম বসতি যুক্ত বাগানপাড়ায় সুপ্ত হয়েছিল এই লোক-আঙ্গিকটির। এঁরা চদর বাঁধনি করে থাকেন দলে এবং নিমডাঙার সুকল মার্ডি একাই দেখিয়ে থাকেন পুতুলখেলা। গোপালনগরে  জনের দলে আছেন খান্দু মার্ডি ( দলের প্রধান ও বাঁশি বাদক), সুকুল মর্মু ( গায়ক), রবি বাসকি ( তুংদা বা মাদল বাদক), বড় মর্মু ( লাগড়া বাদক), চুরকু টুডু ( পুতুল নাচায়) এবং  ভৈরব মর্মু ( বানাম বাদক)।

‘চদর বদর’ আলোচনার প্রথমেই আসবে এর উৎপত্তি। এই পুতুলনাচকে যে কেউ দেখলেই এটাকে ‘ডাং’ পুতুল রীতি বা বেণী পুতুলনাচের রীতি হিসেবে ভুল করে থাকেন। কিন্তু দু’টি পুতুলনাচ আঙ্গিকের দিক থেকে অনেকটাই আলাদা। ডাং পুতুলনাচের মতো ‘চদর বদর’ও দেখানো হয়ে থাকে ডাং বা লাঠির সাহয্যে। কিন্তু ডাং পুতুলনাচের শিল্পীরা নিজের কোমরে একটি ছোট চোঙ বেঁধে খাপে ডাংটিকে পুরে হাত দিয়ে সেই ডাংটিকে উপর নীচে তুলে ও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুতুলনাচ দেখান। চদর বদরের ক্ষেত্রে ডাংটিকে দুইয়ের মধ্যবর্তী স্থানে ভারসাম্য এনে পুতুলনাচ দেখানো হয়। বেণী পুতুলের মতো চদর বদরের পুতুলগুলি ছোট হয়ে থাকে। 

‘‘চদর বদরের চদর শব্দটি চাদর থেকে নেওয়া হয়েছে। পুতুলগুলি নাচানোর সময় বাড়ির মেয়েদের শাড়ি দিয়ে ঢাকা থাকে পুতুলনাচের মঞ্চ।’’— বললেন বংশীবদন মুর্মু। এক পায়া কাঠের স্ট্যান্ডের উপরে বাঁশের তৈরি বাক্স, যার তিন দিক চাদর দিয়ে ঢাকা থাকে। প্রদর্শনের সময় এই তিন দিকের চাদর উঠিয়ে দেওয়া হয়। ভিতরের একটি পাটাতনের উপরে ধামসা মাদল নিয়ে সারি বাঁধা পুরুষ পুতুল এবং তার মুখোমুখি সাঁওতালি মেয়েদের নৃত্যদল। পাটাতনের নীচে রয়েছে লিভার। চাদরে ঢাকা সেই লিভারকে শিল্পীর আঙুলে প্যাঁচানো সুতোর সাহায্যে সুকৌশলে চালনা করলেই নানা ভঙ্গিমায় নেচে উঠে আদিবাসী ঘরানার পুতুলগুলি। 

গোপালনগরে বাগানপাড়ার পুতুলনাচটি শুরু হয়েছিল পাশের কামারপাড়ার মাতাল মর্মুর হাত ধরে। চদর বদর ইতিহাস প্রসঙ্গে বর্তমান দলের সুকল মর্মু বলছিলেন, ‘‘দুর্গাপুজোর দশমীতে সিধে দেখানোর জন্য পুতুলগুলি নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরতাম। তাঁরা খুশি হয়ে চাল-ডাল তরকারি দিতেন। তখন থেকে আজও দশমীর দিন ও তার পরের দিন চদর বদর নিয়ে দূরে গ্রামে যাই। এ ছাড়াও নিজেদের বাঁদনা পরব, বিয়ের অনুষ্ঠান ও চড়কের (পাতা) দিনে পুতুলখেলা দেখাই জীবন ও জীবিকার টানে।’’ সুকল জানালেন, প্রত্যেক বাড়িতে সিধে নেওয়ার জন্য তাঁরা এই ছড়াটি বলতেন—‘‘এম খানদো এমা লোপে/ বাং খানদো মড়ে মাহালে/ বাসা আপেয়া।’’ অর্থাৎ, দেবে তো দাও, না তো তোমার বাড়িতে পাঁচ দিন বাসা নিয়ে থাকব।

চদর বদরের পুতুলগুলি সাধারণত ৭ থেকে ৯ ইঞ্চি লম্বা হয়। পুতুলগুলি গড়তে প্রয়োজন হয় কারিগরি দক্ষতা। শিরিষ, জাম, বট, ডুমুর ইত্যাদি হাল্কা কাঠ খোদাই করে পুতুল তৈরি করা হয়ে থাকে। কাঠের তৈরি পুতুলে তার পরে চলে রংয়ের কাজ। শেষে পুতুলকে কাপড় পরানো হয়। এর পরবর্তী কাজ হল পুতুলগুলিকে মঞ্চে সাজানো। বীরভূমের চদর বদরের পুতুলগুলি আগে তৈরি করতেন বেঁকাজলের সোম মুর্মু ও নিমডাঙার সুকুল মার্ডি। এই সোম মুর্মু  হলেন কামারপাড়ার মাতাল মুর্মুর ভাইপো। 

পুতুল নাচের মঞ্চটি গোলাকার, কিন্তু দিনাজপুরে মঞ্চটি চৌকো। এখানেই বীরভূমের চদর বদর পুতুল নাচের সঙ্গে আঞ্চলিক বৈসাদৃশ্য ধরা পড়ে।  সুকুল মার্ডি তাঁর পুতুলগুলির নাম দিয়েছেন লক্ষ্মীমণি, সোনামণি, ভাবিনি, খুকুমণি। অন্য দিকে ছেলে পুতুলগুলির মধ্যে আছে রাম, লখন , দামু। শিল্পীরা প্রত্যেকে বাজাচ্ছেন লাগড়া, মাদল, বাঁশি। আর পুতুলেরা বাজনার তালে তাল মিলিয়ে নাচছে। 

চাদর বদর প্রদর্শনের সময় শিল্পীদের পোশাকেও থাকে বৈচিত্র। শিল্পীরা পাঞ্চি পরেন নিম্নাংশে। মাথায় গামছা ও হাঁসের পালক। চিরাচরিত উপজাতি বাদ্যযন্ত্রে অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায় পুতুল নাচের সময়।  বাজে বানাম, তুংদা (মাদল), লাগড়া, তিরেঞয়া( বাঁশি)। পুতুলনাচের সময় মোটমুটি নির্ভর করে দর্শকের উপরে। দর্শক চাইলে পুতুলনাচের সময় বাড়তেই পারে। 

বর্তমানে প্রায় চোখেই পড়ে না এই লোকয়ত শিল্পটি। কারণ হিসেবে উঠে আসছে শিল্পীদের সংগঠনের অভাব এবং নিজেদের এই লোক-আঙ্গিকটির সম্পর্কে এতিহ্য ও গর্ব অনুভব না করতে পারা। গোপালনগরেও প্রায় ধুঁকছে এই লোকয়ত শিল্প। কিন্তু, আজও জীবিত। একই অবস্থা নিমডাঙায়। শিল্পীদের একটাই খেদ, এমন এক লোকায়ত শিল্পের প্রসারে আজও সরকারি বা বেসরকারি সংগঠন এগিয়ে আসেনি। তাই ইচ্ছে না থাকলেও পুতুল নাচ বন্ধ করতে হচ্ছে তাঁদেরকে। আসলে লোকআঙ্গিক পুনরুজ্জীবনের একটাই সমস্যা— নিজদের এতিহ্যটির প্রতি গর্ববোধ হারিয়ে ফেলা। চদর বদরও ব্যতিক্রম নয়। বহু আদিবাসী যুবক তাঁদের এই শিল্পের বিষয়ে অজ্ঞ। সাঁত্ততাল লোকসংস্কৃতি অনুরাগী বংশীবদন মর্মু ও  কুমকুম ভট্টাচার্য বললেন, ‘‘চদর বদর নিয়ে এখনও বহু মানুষের উৎসাহ ও আগ্রহ আছে। কিন্তু এখন তো আর দেখাই যায় না চদর বদর!’’ নিমডাঙার ৭০ বছর বয়সী সুকুল মার্ডির কাছে জানতে চাই—‘‘কেউ আসে না চদর বদরের তালিম নিতে?’’ উত্তর মিলল—‘‘ছেলেদের কোনও ইচ্ছা নেই শেখার। তাই আজও পুজোর সময় একাই চদর দেখাতে যাই সোনাঝুরিতে। যতদিন বেঁচে থাকব পুতুলনাচ দেখিয়ে যাব।’’ 

 

লেখক বিশ্বভারতীর ছাত্র, মতামত নিজস্ব

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন