‘গুগল ডুডল’ দেখে জানতে পারলাম, ইন্টারনেট বা আন্তর্জালের ৩০ বছর পূর্ণ হল। অন্তত পৃথিবীর গত ২০ বছরের ইতিহাস যে আন্তর্জালের ইতিহাস, তা বোধ হয় কেউই অস্বীকার করবেন না। যিনি এই আশ্চর্য জিনিসের আবিষ্কর্তা, সেই টিম বার্নার্স লি একটি চিঠিতে তাঁর আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন, আন্তর্জাল যেমন বহু সুযোগ তৈরি করেছে, প্রান্তিক গোষ্ঠীদের স্বর দিয়েছে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সুবিধেজনক করেছে, তেমন এতে নানা জোচ্চরদেরও সুযোগ বেড়েছে, যারা ঘৃণা ছড়ায় তারাও স্বর পেয়েছে এবং সব রকমের অপরাধ করা অত্যন্ত সহজ হয়েছে। তিনি রাষ্ট্রের মদতে ‘হ্যাকিং’ বা নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য অনেকের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। যত দিন যাবে, আমাদের জীবনে ইন্টারনেট অপরিহার্য হয়ে উঠবে। তাই এই সতর্কীকরণও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইন্টারনেটের জন্মদিনের কেক কাটতে গিয়ে যেন এই কথাগুলো আমরা ভুলে না যাই।

স্বপন চৌধুরী

কলকাতা-৩৩

 

আশুতোষ

‘‘বাইরে যতটা ‘রয়্যাল’, ভিতরে ততটাই ‘বেঙ্গল’’’ (পত্রিকা, ২-৩) পড়ে সমৃদ্ধ হলাম। ‘‘সারা জীবনই মন দিয়ে পড়েছেন। কোন দিন কী পড়ছেন, তাঁর ডায়েরি সাক্ষী’’— পড়ার পর, পাঁচ বছর আগে টিফিনের সময় স্টাফ কমনরুমের একটি ঘটনা মনে এল। কলকাতার একটি সাহিত্য পত্রিকা ‘কথাসাহিত্য’র বইমেলা সংখ্যায় (১৪২০ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত একটি লেখা থেকে সহকর্মীদের একটি দিনলিপি (১৩ ডিসেম্বর ১৮৮৩) পড়ে শোনালাম: ‘‘ভোর ৪টেয় ঘুম ভেঙে গিয়েছে। ৪.৩৫ পর্যন্ত ২ মাইল হেঁটে এলাম; ঠাণ্ডা লেগেছে মনে হচ্ছে। স্টেটসম্যান আর ইংলিশম্যান, দুটি পত্রিকাই পড়লাম। Hamilton-এর Metaphysics থেকে দুটি লেকচার আর Fowler-এর Inductive Logic-এর কয়েক পাতা পড়লাম। দুপুরে একটু ঘুমিয়েছিলাম। তারপর কুমারসম্ভবের ৪র্থ সর্গ পড়লাম— ‘রতিবিলাপ’ অংশটি এই ধরনের রচনার মধ্যে নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ, আমি অন্তত এর থেকে শ্রেয়তর কিছু পড়িনি। কাকাবাবুর বাগান পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে ফিরে এলাম— প্রায় ৬ মাইল রাস্তা। রাত্রে Besant-এর Hydrostatics পড়লাম। ১০টায় শুতে গিয়েছি।’’ পড়ে শোনানোর পর বললাম: এই দিনলিপি এক কলেজে পাঠরত ছাত্রের। তিনি কোন বিষয়ের ছাত্র? এক সহকর্মী বললেন সংস্কৃতের, আর এক জন বললেন পদার্থবিদ্যার, আমাদের মধ্যে সিনিয়র অমলেন্দুবাবু (আমি যাঁকে বড়দা বলি) সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন, গণিতের। জানিয়ে রাখি, আমি প্রথম বার পড়ার পর গণিতের ছাত্রের দিনলিপি ভাবতে পারিনি। সত্যিই অবাক হতে হয় আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পাঠ পরিধি জানার পর।

আশুতোষের গণিতের প্রতি প্যাশনের কথা অনেকেরই জানা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে জার্মান আর ফরাসি গণিতজ্ঞদের খ্যাতি ছিল বিশ্ব জুড়ে। ওই দুই ভাষার গণিতজ্ঞদের কাজগুলো পড়বেন বলে তিনি দুটো ভাষাই শিখে নেন নিজের চেষ্টায়। 

‘‘শুধু কলকাতার বইয়ের দোকানেই নয়, তিনি নিয়মিত যেতেন নিলাম ঘরগুলোয়’’ প্রসঙ্গে বলি, কয়েক বছর আগে এই পত্রিকারই সম্পাদক সমীপেষুতে পড়েছিলাম, ‘‘ফরাসি ভাষায় লেখা গণিতের দুষ্প্রাপ্য দু’টি বইয়ের নিলাম হবে কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে আশুতোষ নিলামে অংশ নেওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছেন। তিনি বিস্মিত হয়ে দেখলেন আর এক জন ক্রেতা তাঁর থেকে দাম বাড়িয়েই চলেছেন। বই দু’টির দাম যখন ২৫২ টাকায় এল আশুতোষ বিফলমনোরথ হয়ে বাড়ি ফিরে এলেন। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ওকেনলি সাহেব বই দু’টি কিনেছিলেন। তিনিও ২৫২ টাকা দাম জানার পর তাঁর প্রতিনিধির কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলেন অপর ক্রেতার পরিচয়। জানার পর সমঝদার ওকেনলি সাহেব বই দু’টি উপহার স্বরূপ দিয়েছিলেন উপযুক্ত পাঠক আশুতোষকে।’’

নন্দগোপাল পাত্র

সটিলাপুর, পূর্ব মেদিনীপুর

 

সাদরি ভাষা

‘বাংলা ভাষা নয়, মাতৃভাষা দিবস’ (২১-২) শীর্ষক প্রতিবেদনে সাদরি ভাষার প্রসঙ্গ এসেছে। সুন্দরবনের জনজাতির মানুষদের (ছোটনাগপুর থেকে আগত সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাওঁ, ভূমিজ) মধ্যে ‘সাদরি’ ভাষার প্রচলিত বটে, তবে শুধু সুন্দরবনেই নয়, উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় (বিশেষ করে চা-বলয়ে) কিংবা বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, চব্বিশ পরগণা, মানভূম, মালদহ প্রভৃতি জেলায় এই ভাষার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে ২৫ লক্ষের বেশি মানুষ সাদরি/সাদানি ভাষায় কথা বলেন। এ ছাড়াও বিহার, ওড়িশা, অসম, ঝাড়খণ্ড, ছত্তীসগঢ়, মধ্যপ্রদেশ, আন্দামান ও নিকোবরে আনুমানিক ২ কোটির কাছাকাছি মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। এমনকি প্রতিবেশী বাংলাদেশেও এই ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক থেকেই শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে। মূলত প্রোটো অস্ট্রালয়েড গোষ্ঠীর বিভিন্ন জনজাতির মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন। এই সব জনজাতি গোষ্ঠীর অধিকাংশের নিজস্ব মাতৃভাষা আছে। এই ভাষাগোষ্ঠীর বিপুল সংখ্যক ভাষাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রত্যেকের স্বতন্ত্র নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। যা নিজগোষ্ঠী ছাড়া অপরের কাছে বেশির ভাগ সময় দুর্বোধ্য। কোনও কোনও আদিবাসী জনগোষ্ঠী আবার নিজস্ব মাতৃভাষা বর্জন করেছেন কিংবা ভুলে গিয়েছেন। এই সমস্ত আদিবাসীদের কাছে সাদরি প্রথম বা দ্বিতীয় মাতৃভাষা হিসেবে প্রচলিত। ভাষাবিদরা এ ধরনের ভাষাকে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা (Lingua franca) বা সংযোগস্থাপনকারী ভাষা বলেন।

মূলত মধ্য-পূর্ব ভারতের অসংখ্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের সামাজিক সংযোগ রক্ষার্থে আনুমানিক খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকেই এই ভাষা ব্যবহৃত হত। সাদরি ভাষা স্থানভেদে বিভিন্ন নামেও পরিচিত। যথা (লুইসের মতে) সাদানি, সাদানা, সাদাতি, সদরি, সাধন, সদনা, সদরিক, সিদ্দ্রি, স্রাদ্রি, সাধারি, সদন, সান্ত্রি, নাগপুরি, নাগপুরিয়া, ছোটা নাগপুরি, দিক্কু কাজি, গাওয়ারি, গাঁওয়ারি, গোয়ারি, গাউয়ারি, ঝাড়খণ্ডি। অথচ, ভাষাতত্ত্বের নিরিখে স্বতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও আজও পশ্চিমবঙ্গে সাদরি অবহেলিত হয়েই রয়েছে। নিজস্ব বাক্যশৈলী, ধ্বনিগত স্বাতন্ত্র্য, শব্দের রূপগত স্বাতন্ত্র্য, ধাতু ও ধাতুরূপগত স্বাতন্ত্র্য, শব্দকোষ, উচ্চারণরীতি, সাহিত্যভাণ্ডার প্রভৃতি সমস্ত শর্তই এই ভাষা পূর্ণ করেছে।

খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে হিউয়েন ৎসাংয়ের ভ্রমণ কাহিনির সূত্রে বলা যায়, মধ্য মগধাম্ থেকে ভোজপুরি, নাগপুরিয়া ও সাদরি/সাদানি ভাষার উৎপত্তি। যদিও সাদরি/সাদানি ভাষায় প্রথম লিখিত সাহিত্যের সময়কাল আজও অজানা। তবে, বলা যায়, পঞ্চদশ শতকে চৈতন্য ভক্তিবাদের জোয়ার আদিবাসী সমাজকেও সিক্ত করে। তখন ছোটনাগপুরের মহারাজ রঘুনাথ নৃপতি নাগবংশী (১৬২৬-১৬৬৮) প্রথম সাদরি ভাষায় বৈষ্ণব কাব্য রচনা করেন। জর্জ গ্রিয়ারসন সাদরিকে কোনও পৃথক ভাষা হিসেবে চিহ্নিত না করলেও, আদিবাসী এবং অ-আদিবাসীদের ভাব বিনিময়ের একটি মিশ্র নতুন ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। সাদরি ভাষার প্রথম ব্যাকরণ ‘নাগপুরীয়া সদানী বোলীকা’ রচনা করেন ফাদার পিটার শান্তি নওরোঙ্গী (১৯৫৬)। 

তাই পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যোগাযোগের ভাষা সাদরির দ্রুত স্বীকৃতি ও পঠনপাঠনের ব্যবস্থা জরুরি। ইতিমধ্যে ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও অসমে এই ভাষায় পড়ানো শুরু হয়েছে। রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়-সহ ঝাড়খণ্ডের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ভাষায় কোর্স চালু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এই ভাষাগোষ্ঠীর থেকে আসা অসংখ্য প্রথম শিক্ষার্থী সদস্যদের অজানা ভাষার বিজাতীয় পরিবেশের সন্মুখীন হতে হচ্ছে। অন্য ভাষা হৃদয়ঙ্গম করতে না পেরে, বাক্-ব্যবহারে অকুশলী বলে স্কুলছুট হচ্ছে। (ঋণ: সাদরি ভাষার রূপরেখা, সমীর চক্রবর্তী ও সাদরি/সাদানি, সবিতা কিরণ এবং জন পিটারসন)।

ঝন্টু বড়াইক

সহকারী অধ্যাপক ও সাদরি ভাষার গবেষক, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।