×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২০ জুন ২০২১ ই-পেপার

হে সখা তুমি

০৫ অগস্ট ২০১৮ ০০:০০

সম্প্রতি প্রকাশিত হইল সঙ্গীতা তলওয়ার লিখিত ‘দ্য টু মিনিট রেভোলিউশন’ গ্রন্থটি, যাহার বিষয়: কেমন ভাবে একটি নির্দিষ্ট সংস্থার নুডল-কে ভারতে জনপ্রিয় করা হইয়াছিল, কী ভাবে তাহার বিপণনের কৌশল ভাবিয়া বাহির করা হইয়াছিল। ১৯৮২ হইতে ভাবনা শুরু হইয়াছিল এবং নুডলটি বিক্রি শুরু হইয়াছিল ১৯৮৩ সালে, দিল্লিতে। তখন মানুষ সাধারণত কঠিন কৌটার মধ্যে পণ্য পাইতে অভ্যস্ত। কিন্তু এই সংস্থা নরম মোড়কে পণ্যটি বিক্রি করিয়া, সেইগুলিকে দোকানে স্পষ্ট প্রদর্শনের জন্য ঝুলন্ত ঝুড়ি প্রস্তুত করিয়া, অনেকগুলি অভিনব কাণ্ড করিয়াছিল। এবং সত্যই ভারতময় কয়েক লক্ষ মা পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে অতুলন স্বস্তির শ্বাস ফেলিয়াছিলেন, কারণ এই সমাজে স্ত্রী ও মা হইবার পর যে মূল প্রশ্ন নিত্য এক মহিলার সম্মুখে জ্বলজ্বল করিতে থাকে, তাহা হইল, ‘‘আজ কী রান্না হইয়াছে?’’ এবং তাহারই এক গুরুত্বপূর্ণ দোসর প্রশ্ন: ‘‘জলখাবারে কী আছে?’’ প্রশ্নটির এক সরল সমাধান লইয়া আসিল এই পণ্য। বিজ্ঞাপনের মূল কথাটি অনুযায়ী, মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে ক্ষুধার্ত সন্তানের (ও অবশ্যই পরিবারের অন্যদেরও) খাদ্য প্রস্তুত করিয়া দিবার সক্ষমতা আয়ত্ত করিলেন এই বিশাল দেশের মাতাগণ। ইহাকে বিপ্লব বলিলে অত্যুক্তি হয় না। যে কোনও খাদ্য প্রস্তুত করাই কিছু সময়সাপেক্ষ, স্বাদও রন্ধনকারীর দক্ষতাসাপেক্ষ, কিন্তু এইটি যেন জাদু দ্বারা তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত হইয়া যাইত, আর সকলেই একই রকম স্বাদু খাদ্য প্রস্তুত করিতে পারিতেন। ফলে, অন্তত এই ক্ষেত্রে, বৈষম্য ঘুচিয়া পাচকের গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত হইল। যে সময় নুডল বলিতে সাধারণ মানুষ বুঝিত একটি চিনা খাবার, যাহা কালেভদ্রে কোনও অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাড়িতে রাঁধিতে হয়, সেই সময় পণ্যটি আসিয়া নুডলকে ভারতে নিয়মিত একটি খাবারে পরিণত করিল। খেলাধুলা করিয়া ছেলেমেয়ে বাড়ি ফিরিলেও তাহা পরিবেশন করা যাইল, অতিথি আসিলেও ভাঁড়ারে তেমন সামগ্রী নাই বলিয়া ভাবনার অবকাশ রহিল না।

ক্রমে এই খাবার হইয়া দাঁড়াইল ভারতের বহু মানুষের, বিশেষত যুবক-যুবতীগণের স্বাধীনতার প্রধান বন্ধু। ছেলে বা মেয়ে যখন স্থির করিল, সে নিজ রাজ্য ছাড়িয়া অন্য রাজ্যে যাইয়া পড়াশোনা করিবে, কিংবা অন্য কোনও কারণে বাড়ি ছাড়িয়া অন্যত্র থাকিয়া নিজস্ব একক স্বতন্ত্র জীবন গড়িয়া তুলিবে, তাহাকে রান্নার দুশ্চিন্তা হইতে মুক্তি দিল এই তাৎক্ষণিক স্বাদু খাদ্য বানাইয়া লইবার নিশ্চয়তা। একটি খাদ্য অনেক স্তরেই মানুষের জীবনে অবদান রাখিতে পারে, (কেহ তর্ক করিতে পারে, একটি পানীয় তাহাকে সৃষ্টির শিখরে পৌঁছাইয়া দিয়াছে, অন্য কেহ টিপ্পনী কাটিতে পারে ওই পানীয়ই তাহাকে সর্বনাশের গহ্বরে পতিত করিয়াছে) কিন্তু তাহা যে ব্যক্তির স্বাধীন স্ববশ জীবনকে অগ্রসর করিয়া দিতে পারে, তাহাকে নির্ভয় পরোয়াহীন হইতে সাহায্য করিতে পারে, ইহা অসামান্য ব্যাপার। যে ব্যক্তি কোনও কিছুই রাঁধিতে জানেন না, কখনও মাছ ভাজিতে বলিলেও উল্টাইয়া পড়িয়া যাইবেন, অফিস হইতে বাড়ি ফিরিয়া তাঁহাকেও কোনও পরিচারিকার উপর নির্ভর করিতে হয় নাই, খাদ্যবিপণি হইতে কিছু ক্রয় করিবার তাড়াহুড়া ও খরচের দায় লইতে হয় নাই, আহার্যের কারণে দাপুটে কলহযুক্তি প্রত্যাহার করিয়া লইয়া নতমস্তকে জননীক্রোড়ে ফিরিয়া যাইতে হয় নাই। সহজতার দ্বারা এই খাদ্য একটি প্রজন্মকে, বা আরও অধিক মানুষকে অন্তত কিছু দিনের জন্য অনন্ত স্বনির্ভরতা দিয়াছে। বিবাহের পরে বহু পুরুষ ও নারী নিজেদের এই অনাড়ম্বর অথচ ঝঞ্ঝাটহীন আনন্দঘন ‘নুডল-দিবস’গুলির কথা ভাবিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়াছেন। অগতির গতি হিসাবে, এবং গতিময় জীবনের আবশ্যিক শর্ত হিসাবে খাবারটি বহু মানুষের জীবনে ওতপ্রোত।

এক সময় ঘোষিত হইয়াছে, খাবারটি যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর নহে, প্রায় এক দিনে সকল প্যাকেট সকল বিপণি হইতে সরাইয়া ফেলা হইয়াছে। আবার সে ফিরিয়াছে, তাহার দাপট পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইবে কি না, সময় বলিবে। কিন্তু তাহাতে তাহার ইতিহাস ম্লান হইয়া যায় না। স্মৃতিকাতর জাতি তাহাকে ভুলিতে পারিবে না। কারণ সে কেবল খাদ্য নহে, সখা। বিপদে উদ্ধার করিয়াছে, সম্পদে আনন্দ দিয়াছে। তাহার ‘মশল্লা’ কেবল স্বাদ নহে, স্বাধীনতা দিয়াছে। খাদ্য লইয়া অতীব প্রয়োজনীয় চিন্তাকে প্রায় অবান্তর করিয়া দিয়া, অন্য বিষয়ে ভাবিবার অবসর দিয়াছে। রাহুল গাঁধীর ন্যায় তাহাকে সহসা জড়াইয়া ধরিলে দোষ নাই।

Advertisement

এটিএম থেকে টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে। রাত্তিরে শুতে যাওয়ার সময় ছিলেন রাজা, সকালে উঠে দেখলেন আপনি ফকির। নাগরিক পঞ্জি তৈরি হচ্ছে, শুতে যাওয়ার সময় ছিলেন তীব্র ভারতীয়, জমিয়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মুণ্ডপাত করতেন, সকালে উঠে দেখলেন আপনিই বাংলাদেশি, বা নিউজ়িল্যান্ডের জনজাতির সদস্য। তার চেয়ে বড় শঙ্কা, সারা সকাল ভাবলেন কোহালি একা জিতিয়ে দেবেন, বিকেলে চটকা ভেঙে দেখলেন, আউট। এত অনিশ্চয়তায় বাঁচা যায়!

Advertisement