ভাষা দিয়ে প্রজন্মকে চেনা যায় কি? আজকের জেন জ়ি বা তাদের চেয়েও ছোট জেন আলফাদের অন্তত চিনে নেওয়া যায় তাদের ব্যবহৃত শব্দে, বাক্যবন্ধে। জেন জ়ি বা জেন আলফা এমন শব্দরাজি ব্যবহার করে যেগুলি আগে শোনা যায়নি, লিখিত ব্যবহারও হয়নি। যেমন ‘অরা ফার্মিং’, ‘সিগমা’, ‘রিজ়’ ইত্যাদি। প্রবীণদের কানে শব্দগুলো যদি বেখাপ্পা ঠেকেও, তাঁরা এক বার ভেবে নিতে পারেন তাঁদের সময়ের নিজস্ব শব্দগুলোকে— আর কিছু না হোক, জনপ্রিয় ব্যবহারে ‘গুরু’ শব্দটার অর্থের সম্প্রসারণ কিন্তু তাঁদের আমলেই হয়েছিল!
উদ্বেগের জায়গাটা অন্যত্র। আজ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বেড়েছে বহু গুণ। সমাজমাধ্যম, ইউটিউব, টেলিভিশন— সর্বত্র মানসিক সুস্থতার কথা হচ্ছে। কিন্তু জনপ্রিয়তার আড়ালেই লুকিয়ে নতুন সমস্যা— মনোবৈজ্ঞানিক শব্দগুলির দৈনন্দিন অপব্যবহার। বিশেষত শহরাঞ্চলের, সম্পন্ন পরিবারের জেন জ়ি, জেন আলফাদের একাংশের কথোপকথন খেয়াল করলেই দেখা যাবে একটি নিশ্চিত প্রবণতা— ‘ডিপ্রেশন’, ‘ট্রমা’ ‘প্যারানয়া’, ‘নার্সিসিজ়ম’, ফোবিয়া’ বা ‘ওসিডি’-র মতো শব্দগুলি নিতান্ত মুড়িমুড়কির মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এর প্রতিটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা— প্রশিক্ষিত চিকিৎসক বা মনোবিজ্ঞানী ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে চিহ্নিত করা মুশকিল। ফলে, আজকের তরুণরা শব্দগুলির অপব্যবহার করছে। প্রবণতাটি বিপজ্জনক।
পছন্দের রান্না হয়নি, বন্ধু ফোন ধরেনি, বা শিক্ষক সামান্য বকেছেন— এমন সামান্য মনখারাপ, হতাশা বা ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাকেই ‘ডিপ্রেশন’ বলা হচ্ছে। অথচ বাস্তবে ‘ডিপ্রেশন’ গুরুতর শারীরবৃত্তীয় বৈকল্য, যার লক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী, জটিল। সাধারণ মনখারাপ বা হতাশার সমগোত্রের নয়। শব্দের ভুল ব্যবহার অবসাদের মতো গুরুতর রোগকে গুরুত্বহীন করে তুলছে। কারও সামান্য আত্মবিশ্বাস বা নিজের যত্ন নেওয়াকেও বলা হয়— “ও পুরো নার্সিসিস্ট!” শব্দটি ব্যঙ্গার্থে, অন্যকে অপমানের হাতিয়ার হিসাবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। মনোবিজ্ঞানের জগতে বাইবেলতুল্য ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিজ়অর্ডার অনুযায়ী, ‘নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিজ়অর্ডার’ ব্যক্তিত্বের গভীর অসুস্থতা, যেখানে ব্যক্তির আত্মমুগ্ধতা ও অন্যদের প্রতি সহানুভূতির অভাব এক ধরনের আচরণগত বিকৃতি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞ মনোবিদই এই অসুস্থতা নির্ধারণ করতে পারেন।
ছোটখাটো অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতাকেও ‘ট্রমা’ বলা হচ্ছে। অথচ ‘ট্রমা’ অত্যন্ত গভীর মানসিক আঘাত যেখানে মানুষের স্বাভাবিক মোকাবিলার প্রক্রিয়া একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং এই আঘাত ব্যক্তির মানসিক গঠনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। যেমন দুর্ঘটনা, নির্যাতন, যুদ্ধ, প্রিয়জনের মৃত্যু ইত্যাদি। সামান্য চমকে ওঠা বা চিন্তিত হয়ে পড়াকে ‘প্যানিক’ বলে চালানো হয়, যদিও তা এক মারাত্মক ভয়ের অনুভূতি যার প্রকাশ ঘটে বিভিন্ন শারীরিক লক্ষণের মাধ্যমে।
‘বাইপোলার ডিজ়অর্ডার’ এমন মানসিক অসুস্থতা, যেখানে ব্যক্তি দুই বিপরীত মেরুর মানসিক অবস্থার মধ্যে নিরন্তর দোল খান; কখনও ভীষণ অবসাদগ্রস্ত, কখনও অস্বাভাবিক উচ্ছ্বসিত। রোগীর জীবন তো বটেই, পরিবারের জীবনও যন্ত্রণাময় হয়ে ওঠে। মেজাজের স্বাভাবিক পরিবর্তন বা আবেগের ওঠা-নামা ‘বাইপোলার ডিজ়অর্ডার’ নয়।
‘অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজ়অর্ডার’ নামক গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সমস্যার সংক্ষিপ্ত রূপ ‘ওসিডি’ শব্দটির অপপ্রয়োগ ঘটে, অনেক ক্ষেত্রেই কাউকে মহিমান্বিত করতে বা সগৌরব প্রতিষ্ঠায়। পরিপাটি থাকতে ভালবাসলে, কাজে নিখুঁত হতে চাইলে অনেকে বলেন, “আমার একটু ওসিডি আছে।” ওসিডি এক গুরুতর মানসিক সমস্যা, যেখানে অনিচ্ছাকৃত চিন্তা ও বাধ্যতামূলক আচরণ ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করে, যাকে চাইলেই বাদ দেওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞের সাহায্য লাগে।
কোনও বিষয়ে কেউ একটু সংশয় বা সন্দেহ প্রকাশ করলে তাকে ‘প্যারানয়েড’ বলে বিদ্রুপ করা হয়। ‘প্যারানয়া’ একটি দুর্বিষহ মানসিক অবস্থা যেখানে প্রতি মুহূর্তে এক জন এই ধারণা নিয়ে বাঁচেন যে, কেউ তাঁর প্রাণহানি বা সাংঘাতিক ক্ষতিসাধন করতে চান। ‘হ্যালুসিনেশন’ বা ‘ডিলিউশন’ নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে— এমন জীবন অসম্ভব যন্ত্রণার।
মনোবৈজ্ঞানিক শব্দবন্ধের অতিরিক্ত, অবাঞ্ছিত ব্যবহারের ফল কতটা ঋণাত্মক— সে বিষয়ে সমাজ অজ্ঞ ও অসচেতন। এই প্রবণতার একটি মূল কারণ সমাজমাধ্যমের ‘জ্ঞান’-এর দৌরাত্ম্য। ছোট ভিডিয়ো, রিল বা পোস্টের মাধ্যমে মনোবিজ্ঞানের গভীর ধারণাগুলি অতি সরল ভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে। দর্শকরা জীবনের ক্ষুদ্র ঘটনার সঙ্গে মেলাচ্ছেন। এই প্রবণতা প্রকৃত রোগীদের অবস্থাকে জটিলতর করছে। যখন কেউ সত্যিই মানসিক অবসাদে, সমাজ সেটিকে সাধারণ মনখারাপ ভেবে উপেক্ষা করছে। চিকিৎসা বিলম্বিত হচ্ছে, যন্ত্রণা বেড়ে যাচ্ছে বহু গুণ।
ফুসকুড়িকে ত্বকের ক্যানসার, বা পেটব্যথাকে প্যাংক্রিয়াটাইটিস বললে এই দুরারোগ্য ব্যাধিগুলো ক্রমশ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে এবং চরম দুর্ভোগে পড়েন রোগীরা। মনোবিজ্ঞানের শব্দগুলো কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি পাঠ্য-পরিভাষা নয়, সমাজমাধ্যমের ক্ষণিকের ‘ট্রেন্ড’ তো নয়ই। পরিভাষাই বিষয়ের গভীরে যাওয়ার পথ দেখায়— তার সৎ ও সচেতন ব্যবহারেই মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সত্যিকারের জাগরণের সূচনা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)