হাতে সম্ভবত আর মাত্র এক দশক সময়, এর মধ্যে নিজেকে উন্নত দেশে রূপান্তরিত করতে না পারলে ভারতকে চিরকাল উদীয়মান দেশের তকমা নিয়েই থাকতে হবে। নীতিকাররা উঠুন, জাগুন, কফির ঘ্রাণ নিন।— স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া এমনটাই বলছে একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে।  

সতর্কবাণী ঘোষণায় একটু বেশি দেরি হয়ে গেল না কি? চিরকাল উদীয়মান থেকে না গিয়ে উন্নত দেশে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য দশ বছর খুব একটা বেশি সময় নয়। তবুও, স্টেট ব্যাঙ্ক, যে ব্যাঙ্ক দেশের সর্বোচ্চ ঋণদাতা, তার রিপোর্টকে অসম্মান করছি না। তাই এই সতর্কবাণীকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে, এই পরিস্থিতি থেকে কী ভাবে উদ্ধার পাওয়া যেতে পারে, তার একটা হিসেব কষা যাক। 

সাধারণত কোনও সমস্যার মোকাবিলায় আমি সামগ্রিক রণকৌশলের কথাই বলি, কিন্তু এ ক্ষেত্রে হাতে সময় এত কম যে, এই অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমিও একটা ম্যাজিক ওষুধ খুঁজব। সেই ওষুধটির নাম উৎপাদনশীলতা। উন্নত দেশের তকমা পেতে হলে উৎপাদনশীলতাকে অত্যন্ত দ্রুত বাড়াতে হবে। সুতরাং প্রশ্নটা দাঁড়াচ্ছে: কী করে দশ বছরে ভারতের উৎপাদনশীলতা অনেকখানি বাড়ানো যেতে পারে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ রবার্ট গর্ডন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, টমাস এডিসনের ইলেকট্রিক বাল্ব, কিংবা ট্রেন, মোটরগাড়ি বা এরোপ্লেন চলার ফলে উৎপাদনশীলতা যতটা বেড়েছিল, আজকের বিস্ময়-প্রযুক্তিগুলি তার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি। অতএব, খেলাটা কঠিন।

কিন্তু, দাঁড়ান, হাল ছাড়বেন না। গুগল সংস্থার সিইও সুন্দর পিচাই বলছেন, তাঁর আস্তিনে এমন একটি আশ্চর্য প্রযুক্তি রয়েছে যার মহিমা ‘বিদ্যুৎ বা আগুনের চেয়েও বেশি’। তিনি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)-এর কথা বলছিলেন। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা ‘কৃত্রিম বুদ্ধি’ মানে মেশিনকে শিখিয়ে বা অভ্যেস করিয়ে মানুষের মতো করে ‘ভাবতে’ শেখানো। অনেকেই বলছেন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য এটিই হল ব্রহ্মাস্ত্র।

একটা কথা প্রথমেই খেয়াল রাখা ভাল, এআই-এর ময়দানে ভারত খেলতে পারবে বটে, কিন্তু প্রধান ভূমিকা নেওয়া তার পক্ষে সহজ হবে না। একটি হিসেব দেওয়া যাক। ২০৩০ সালে বিশ্বের মোট জিডিপিতে এআই-এর অবদান হবে আনুমানিক ১৫.৭ ট্রিলিয়ন বা ১৫ লক্ষ ৭০ হাজার কোটি ডলার, তার মধ্যে ৭ ট্রিলিয়ন ডলার উৎপাদন করবে চিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার উৎপাদন হবে ৩.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। আর ভারতের? একটি হিসেবে, ২০৩৫ সালে ১ ট্রিলিয়নও নয়। ‘এআই’ বললেই যে সব জিনিসের কথা প্রথমেই আপনার মনে আসে সেগুলি হল: ফোনের অটো-কারেক্ট, স্মার্ট স্পিকার, কিংবা সেই সব জুতোর বিজ্ঞাপন, আপনি এক বার ইন্টারনেটে জুতোর খোঁজ করার পর থেকেই যেগুলি নাছোড়বান্দার মতো আপনার পিছনে লেগে থাকে। এ ছাড়া আছে স্বয়ংচালিত গাড়ি কিংবা ক্যাশিয়ার-হীন দোকান অথবা রাস্তায় স্মার্ট লাইট ইত্যাদি, যা এসে পড়ল বলে। কিন্তু, কথা হচ্ছে, ভারতের মতো দেশে এ সব জিনিস ক’জনের পক্ষে প্রাসঙ্গিক? শতকরা ৭০ জনের স্মার্টফোন নেই। বেশির ভাগ রাস্তার হাল এমনই যে স্বয়ংচালিত গাড়ি বললে প্রলাপের মতো শোনাবে।

কোনও সন্দেহ নেই, এআই-এর মাঠে বড় খেলোয়াড় বলতে আমেরিকা এবং চিন। কিন্তু, তুলনায় ছোট খেলোয়াড় হলেও, এআই-এর ক্ষেত্রে ভারতের কিছু বিশেষ সম্ভাবনা আছে। সেগুলি আশা জাগায়। একে একে বলছি।

প্রথমত, একশো ত্রিশ কোটির দেশে আধার নামক অভিন্ন-পরিচিতির বন্দোবস্ত এবং তার ভিত্তিতে ডিজিটাল পরিষেবার ক্রমবর্ধমান সম্ভার— আয়বৃদ্ধির এত বড় সম্ভাবনা আর কোনও দেশে নেই। ঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারলে উদ্ভাবন এবং উদ্যোগের প্রসারে নতুন প্রযুক্তির বিপুল প্রয়োগ সম্ভব। বাধা আছে অনেক— ঠিকঠাক উদ্যোগীর দরকার, যথেষ্ট মূলধন লাগবে, দক্ষ কর্মী চাই, তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনওটাই এমনি এমনি মিলবে না।

দ্বিতীয়ত, এআই-এর ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ আসে বেসরকারি উদ্যোগীদের থেকে। ভাল খবর হল, এই ক্ষেত্রের বড় বেসরকারি উদ্যোগীরা ভারতে ইতিমধ্যেই সক্রিয়। এবং তাঁদের মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সব চেয়ে সম্ভাবনা আছে যে দেশগুলিতে, ভারত তাদের অন্যতম। একটি হিসেবে, ভারতে যে সব সংস্থা এআই ব্যবহার করে, তাদের ৫৮ শতাংশই উৎপাদনক্ষমতার পর্যাপ্ত ব্যবহার করছে, অর্থাৎ যথেষ্ট বাজার পাচ্ছে। এমন হলেই উদ্যোগীরা ব্যবসার প্রসারে আগ্রহী হন, তাতে বিনিয়োগ বাড়ে, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনও উৎসাহিত হয়।

তৃতীয়ত, ভারতের সামাজিক ও মানব উন্নয়ন সংক্রান্ত চিরাচরিত সমস্যাগুলির মোকাবিলায় এআই প্রযুক্তি খুবই কার্যকর হতে পারে। ডেঙ্গি এবং চিকুনগুনিয়ার কথা ধরা যাক। মশকবাহিত রোগের মধ্যে এই দু’টি ভারতে জনস্বাস্থ্যের পক্ষে খুব বড় সমস্যা। এই রোগগুলির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য সংক্রমণকে প্রথম অবস্থাতেই ধরে ফেলা এবং তাদের গতিপ্রকৃতির পূর্বাভাস দেওয়া আবশ্যক। প্রযুক্তি এ ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক হতে পারে। যেমন, প্রোজেক্ট প্রিমনিশন নামে এক প্রকল্প আছে, তাতে মশাকেই তথ্য সংগ্রহের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মশা যখন কোনও প্রাণীকে কামড়ায়, তখন সেই কামড়ের মধ্যেই নিহিত থাকে সেই প্রাণীর ডিএনএ, মশার কামড় থেকে সংক্রামিত ব্যাধি ও অজানা ভাইরাস সংক্রান্ত তথ্য। ড্রোন-এর সাহায্যে মশকসঙ্কুল এলাকাকে চিহ্নিত করা যায়, রোবট-ফাঁদ দিয়ে কামড়ের নমুনা সংগ্রহ করা যায় এবং এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তথ্য বিশ্লেষণ করে প্যাথোজেন সন্ধান করা যায়। স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে এমন অনেক দৃষ্টান্তের কথা ভাবা যেতেই পারে। কৃষি, পরিবহণ, পরিকাঠামো, শিক্ষা, অপরাধ দমন— নানা ক্ষেত্রেই এআই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অবকাশ প্রচুর। এ ক্ষেত্রে ভারতের সম্ভাবনা অতুলনীয়।

ভারতের নীতিকাররা দৃশ্যত এআই-সুরভিত কফির ঘ্রাণ নিতে পেরেছেন। ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র বাজেট দ্বিগুণ করা হয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক এআই নিয়ে চারটি কমিটি বসিয়েছেন, এআই সংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নীতি আয়োগকে। নীতি আয়োগ ইতিমধ্যে গুগল-এর সঙ্গে একটি যৌথ প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে, এই বিষয়ে একটি শ্বেতপত্রও প্রকাশ করেছে।

ঠিক ভাবে কাজে লাগালে এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, বহু জীবন বাঁচাতে পারে, নতুন জীবিকার সন্ধান দিতে পারে— এমন কর্মসংস্থান, যা এই দেশের তরুণদের অসম্ভব দরকার। একেবারে আগুন আবিষ্কারের সঙ্গে তুলনীয় বলছি না, কিন্তু ভারতীয় অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা যে গভীর খাদে পড়ে আছে তা থেকে তাকে তুলে আনাটা কম কথা নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টাফ্টস ইউনিভার্সিটিতে ফ্লেচার স্কুল-এ গ্লোবাল বিজ়নেস-এর ডিন