আমাদের দেশের জনসংখ্যা এত বেশি যে নেহাত সংখ্যার নিরিখেই অনেক সমস্যাকে সমস্যা বলে মনে হয় না। যেমন, অসমে চূড়ান্ত এনআরসি-তে দেখা গেল উনিশ লাখ লোক এক ধাক্কায় স্ব-ভূমিতে পরবাসী হয়ে গেলেন। তবে তাতে যে দেশের সমাজ-রাজনীতিতে উতরোল উঠবে, এমনটা মনে হয় না। ১৩০ কোটিতে উনিশ লাখ হল ০.১৪ শতাংশ। এ নিয়ে আর কিসের হেলদোল!

তবে অসমে অভ্যন্তরীণ চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। রাজ্যের জাতীয়তাবাদী শিবির এই ‘সামান্য’ সংখ্যায় না-খোশ। এর কারণও স্পষ্ট। সেই উনিশ শতকে অসমিয়া জাতীয়তাবাদ ও অস্মিতার উত্থানপর্বেই নির্ধারিত হয়ে যায় যে, বাংলা ও বাঙালির বৈরী উপস্থিতি অসমের স্থানীয়দের জন্য চরম উদ্বেগ ও আশঙ্কার কারণ। হোমি ভাবা তাঁর ‘নেশন অ্যান্ড ন্যারেশন’ গ্রন্থে বলেছেন, নেশন বা জাতিরাষ্ট্র গড়ে ওঠে প্রাথমিক কিছু মিথ-কে আশ্রয় করে। এই ধরনের মিথই ক্রমে রাজনৈতিক ক্ষমতার আশ্রয়ে মান্যতা পেয়ে যায়। স্বাধীনতা-উত্তর কালে অসমিয়া জাতি গঠনের প্রক্রিয়া যেন হোমি ভাবা-র তত্ত্বেরই ফলিত প্রয়োগ লক্ষণীয়। এই ক্ষেত্রে মিথটি হচ্ছে পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান এবং সর্বশেষ বাংলাদেশ থেকে বিশাল সংখ্যক বাঙালি অনুপ্রবেশ অসমের আদিম অধিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সম্পদ, অর্থনীতি ও যাবতীয় অধিকারে থাবা বসাচ্ছে।

ভাষা-ভিত্তিক অসমিয়া জাতীয়তাবাদই অসমের রাজনীতির চালিকাশক্তি। বাম, ডান, মধ্য কোনও রাজনৈতিক দলই এর বিরুদ্ধে গিয়ে রাজনীতি করার সাহস কখনও দেখায়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম আশির দশকের সিপিআইএম। আসু-র বিদেশি-খেদা আন্দোলনের রাজনৈতিক বিরোধিতা শুধু নয়, রীতিমতো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ তৈরি করেছিল এই বাম দলটি। জরুরি-অবস্থা পরবর্তী রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ১৯৭৮ সালে বাম দলগুলি পঁচিশের মতো আসন পেয়ে যায়, সিপিআইএম একাই পায় ১১ আসন। তুমুল কংগ্রেস-বিরোধী হাওয়ায় অসমে বাম-গণতান্ত্রিক শক্তির তখন অভ্যুদয়ের মুহূর্ত। কিন্তু অসমিয়া জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে অসম-আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার খেসারত দিতে হয় দলকে। আশির দশকের পরই বামেরা প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়। দিশেহারা হয়ে ১৯৯৬ সালে তারা অগপ সরকারকে সমর্থন করে বসে।

এই ‘ভুল’ কংগ্রেস-বিজেপি কখনও করেনি। অসমিয়া জাতীয়তাবাদের কাছে নতি স্বীকার করেই তারা অসমে নির্বাচনী প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করেছে। ১৯৯৩ সালে কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর শইকিয়া বিধানসভায় দাঁড়িয়ে জানিয়েছিলেন, অসমে বসবাসরত বিদেশির সংখ্যা নাকি ৩০ লক্ষ। তিন দিন পরেই ঢোক গিলে কথাটি প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু সংখ্যাটি যৌথস্মৃতিতে থেকেই যায়। ১৯৯৭ সালে কেন্দ্রে বামপন্থী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত সংসদকে জানান, গোটা দেশে বিদেশির সংখ্যা এক কোটি! ২০০৪ সালে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রকাশ জয়সওয়াল লোকসভায় জানান যে, শুধু অসমেই রয়েছে ৫০ লক্ষ বিদেশি। পুরো দেশে সংখ্যাটি এক কোটি কুড়ি লক্ষ। অসমে অনুপ্রবেশ নিয়ে সেরা গল্প লিখেছিলেন ১৯৯৮ সালে অসমের রাজ্যপাল শ্রীনিবাস কুমার সিংহ। গল্পের গরুকে মগডালে চড়িয়ে বাইশ পাতার গোপন প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতি নারায়ণনকে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রতি দিন নাকি বাংলাদেশ থেকে গড়ে ৬০০০ জন অনুপ্রবেশ করছে অসমে। অনুপ্রবেশের মিথকে যথেচ্ছ আশকারা দেওয়ায় সিংহ-প্রতিবেদন অসমে বেদের মর্যাদা পেয়ে যায়। ইতিহাস-ভূগোল-রাজনীতি সম্পর্কিত একগুচ্ছ ভুলে ভরা ওই প্রতিবেদন উচ্চতম আদালতের রায়েও উদার ভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। উৎসাহী পাঠকরা এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে রোহিনটন ফলি নরিম্যান ও রঞ্জন গগৈয়ের ডিভিশন বেঞ্চ ২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বরের রায় দেখে নিতে পারেন।

কোনও ধরনের ডেটাবেস বা তথ্যভাণ্ডার নেই। নেই কোনও পদ্ধতি। তবুও দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা খুশিমতো মনগড়া সংখ্যা হাজির করেছেন জাতীয়তাবাদীদের তুষ্ট করতে।

গত ৩১ অগস্ট এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর স্বাভাবিক ভাবেই মুখ থুবড়ে পড়েছে এত দিনের মিথ্যে প্রচার। আসু-র উপদেষ্টা, সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্যের ভাষায়, ‘এত দিন সরকার বিদেশির যে সংখ্যা জানিয়েছিল, তার ধারেকাছেও নেই এনআরসি-ছুটদের সংখ্যা। ফলে আমরা অখুশি।’ অর্থাৎ, অঙ্কের উত্তর আগে থেকেই নির্দিষ্ট করে রাখা ছিল। অঙ্ক করার পর উত্তর মিলল না যখন— হয় অঙ্কটাই ভুল ছিল, অথবা পরীক্ষকই নষ্টের গোড়া। 

অসমিয়া জাতীয়তাবাদীরা এই ‘সামান্য উনিশ লাখ’-এ খুশি হবে না, এ তো জানাই ছিল। এনআরসি কার্যত বিদেশি তত্ত্বকে খারিজ করে দিয়েছে। রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৫.৭৫ শতাংশ মানুষ এই মুহূর্তে এনআরসি-ব্রাত্য। এখনও পর্যন্ত যে খবরাখবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে নিশ্চিত, বেশ বড়সড় সংখ্যায় বৈধ ভারতীয়রা নথি-নির্ভর এই নাগরিকত্ব নিরীক্ষণে বাদ পড়েছেন। ডি-ভোটার এবং তাঁদের পরিবার, ঘোষিত বিদেশি ও বিদেশি ন্যায়াধিকরণে চালু মামলায় যাঁরা ফেঁসে আছেন, তাঁদের পরিবারকে এনআরসি থেকে বাদ রাখা হয়েছে। এঁদের সংখ্যা আড়াই লক্ষ হবে। এ ছাড়া তিন লক্ষ চুয়াত্তর হাজার মানুষ খসড়া থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য পুনরাবেদনই করেননি। সব মিলিয়ে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর এসেছেন এমন লোকজনের প্রকৃত সংখ্যা হয়তো ৩ বা ৪ শতাংশে দাঁড়াবে। আন্তর্জাতিক সীমান্তের এপার-ওপারে ভাষা-সংস্কৃতি অভিন্ন। এক সময় এঁরা এক অঞ্চলেরই বাসিন্দা ছিলেন। দেশভাগ এঁদের ঠেলে দিয়েছে বিদেশে। অখণ্ড ইতিহাস ও খণ্ডিত ভূগোল মাথায় রাখলে এই চার শতাংশ মতো ‘অনুপ্রবেশ’ খুবই স্বাভাবিক। এখানে ‘গেল গেল’ রব তোলার অবকাশই নেই। সংখ্যাতত্ত্ব ‘বিদেশি’ তত্ত্বকে নস্যাৎ করেছে। আসু থেকে অগপ, সবাই তাই বেজার।

কিন্তু কৌতূহলের বিষয় হল, বিজেপিও এই এনআরসি-র বিরুদ্ধে সুর চড়াচ্ছে। এনআরসি একটি সরকারি প্রক্রিয়া যা সংঘটিত হয়েছে উচ্চতম আদালতের তীক্ষ্ণ নজরদারিতে। যাবতীয় নিয়ম-নীতি ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিয়োর, সবটাই কেন্দ্রে ও রাজ্যে বিজেপি সরকারের যুগলবন্দিতে হয়েছে। তা হলে এখন এই বিরোধিতা কেন? 

প্রশ্নটা সহজ আর উত্তরও তো জানা! অসমিয়া জাতীয়তাবাদের এনআরসি চাই বাংলাভাষী বিদেশি ঠেকানোর জন্য। কিন্তু বিজেপির এনআরসি চাই মুসলমান অনুপ্রবেশকারী বিতাড়নের জন্য। আসু-র কাছে হিন্দু-মুসলমান যা-ই হোক, ১৯৭১-পরবর্তী সবাই বিদেশি। কিন্তু বিজেপির সংজ্ঞা ভিন্ন। অমিত শাহ বা হিমন্ত বিশ্বশর্মা-র চোখে মুসলিম অনুপ্রবেশকারীরাই ‘উইপোকা’। বিজেপির স্বকপোলকল্পিত ধারণা ও প্রচার হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে লাখে লাখে মুসলমান কৌশলগত ভাবে অসমে ঢুকছে জনবিন্যাস পাল্টে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ‘ইসলামিস্তান’ বানানোর জন্য। হিন্দু বাঙালিদের কাছে এই তত্ত্ব খুব উপাদেয়। এই তত্ত্ব দেখিয়েই বিজেপি ১৯৯১ সালে বরাক উপত্যকা থেকে নির্বাচনী জয়যাত্রা শুরু করে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে কংগ্রেসমুক্ত করে ফেলেছে। অশ্বমেধের ঘোড়া আটকে গেল ‘প্রতীক হাজেলার এনআরসি’তে এসে। কোথায় লাখ লাখ মুসলমান বিদেশি? উনিশ লাখের সংখ্যাগরিষ্ঠরাই যে হিন্দু বাঙালি! স্নানের পর গামলার জল ফেলতে গিয়ে বাচ্চাটাও যে যায় যায়! 

বিজেপি স্বাভাবিক ভাবেই শঙ্কিত। রেজিস্ট্রার জেনারেল সই করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করা পর্যন্ত এই এনআরসি’র কোনও আইনি বৈধতা নেই। সঙ্ঘের চাপ রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার তাই কোন পথে যায়, এই মুহূর্তে বলা মুশকিল। অসমে বিদেশি সমস্যার স্থায়ী সমাধান হোক, কোনও পক্ষই তা চায় না। বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখলেই সুবিধা। বাঙালিরা তাই চাপে থেকেই গেলেন। আইনি ব্যাখ্যা বলছে, এনআরসি-তে নাম থাকা মানেই যে নাগরিকত্ব নিশ্চিত হল, এমনটা নয়। কিন্তু নাম না থাকলে গন্তব্য বিদেশি ট্রাইবুনাল। ১২০ দিনের মধ্যে ৩০০টি ট্রাইবুনালে আবেদন করবেন উনিশ লক্ষ এনআরসি-ছুট। বিচারের বাণী কবে শোনা যাবে, কেউ জানে না। সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি না করে প্রক্রিয়াটিকে আটকে দিলেও এনআরসি বাতিলদের উৎফুল্ল হওয়ার কোনও কারণ নেই। কারণ অসম সরকারের কাছে এখন উনিশ লক্ষ ছ’হাজার ছ’শো সাতান্ন জন ‘বিদেশি’র সমৃদ্ধ তথ্যভাণ্ডার রয়েছে। হেনস্থা করা, বিদেশি বলে দেগে দেওয়া আটকায় কে!

বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব বিল এনে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমায় যাঁরা অবৈধ ভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দিয়ে দেওয়া হবে। অবশ্যই মুসলমান বাদ দিয়ে। এতে তো আবার অসমিয়া জাতীয়তাবাদ রুষ্ট হবে। সে কথা ভেবেই গত ১৫ জুলাই অসম-চুক্তির বিতর্কিত ৬ নম্বর দফা কার্যকর করতে এক উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বি কে শর্মার নেতৃত্বে এই কমিটিতে রাজ্যের ভাষিক বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কোনও প্রতিনিধি নেই। স্থানীয় অসমিয়া ও স্থানীয় জনজাতির জন্য সংসদ, বিধানসভা, পঞ্চায়েত, পুরসভায় আসন সংরক্ষণ, জমির মালিকানা, সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে এদের সংরক্ষণ চালু করাই এই কমিটির কাজ। বাঙালি ও অন্য অ-স্থানীয়দের রুটি-রুজি ও সাংবিধানিক অধিকার এর দ্বারা কেড়ে নেওয়া যাবে।

এনআরসি-পরবর্তী অসমে এক কোটি ‘অ-স্থানীয়’দের নিয়তি কী হবে— মোটেই স্পষ্ট নয়। ধর্মপরিচয়ে বিভক্ত ‘উইপোকা’রা পরস্পরের সর্বনাশেই আহ্লাদে আটখানা! অসমের ল্যাবরেটরি খোলা রেখেই পরবর্তী প্রোজেক্ট মিশন পশ্চিমবঙ্গ!

 

অর্থনীতি বিভাগ, কাছাড় কলেজ, শিলচর