‘ — তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায় — ’ ভেসে আসছে গান। সঙ্গে একতারার সুর। বিশ্বভারতী ফাস্ট প্যাসেঞ্জার ধরে আমি কলকাতা অভিমুখে। না শীত, না গরমের মন কেমনের বাতাস আর তাতে এমন সুর, ছন্দ, ব্যঞ্জনা সব যেন নিয়ে যাচ্ছে আমায় অচিনপুরে। এ গান আগেও বহুবার শোনা। বিশেষত, যখন বাড়িতে বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল রেডিও, তখন ঠাকুমার সেই রেডিও সঙ্গীর মাধ্যমে শুনেছি অনেকবার। তখন ‘খাঁচা’ বলতে একটি ছোট খাঁচা আর ‘অচিন পাখি’ শব্দে পোষ মানানো একটি পাখির ছবিই মনে ভেসে উঠত। সেও বেশ লাগত ভাবতে। বাকি বেশিরভাগেরই অর্থ বুঝতাম না। শুধু ভাললাগাটুকু রয়ে যেত। 

বুঝি কী আজও! শুধু শুনি। প্রকৃতির সকল গোপন শক্তির সঙ্গে শরীরের গোপন শক্তির সংযোগ নিয়েই দেহতত্ত্বের সাধনা। প্রত্যেক মানুষের গভীরে যে পরম সুন্দর ঈশ্বরের উপস্থিতি সেই সুন্দরকেই সে উপলব্ধি করতে চায়। মানবদেহের পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেই মিলবে সেই সুন্দরের দর্শন, মহাসুখ। আর সে সুখের সন্ধান দিতে পারেন একমাত্র গুরু। তাই বাউলের পথপ্রদর্শক গুরু, সাধনসঙ্গী নারী, ভিক্ষা করেই জীবনধারণ। আর জীবন জুড়ে মনের মানুষের অন্বেষণ। 

বাউল সাধনার মাধ্যম বাউলগান। রূপক আশ্রিত গান। যেখানে খাঁচার অর্থ নশ্বর দেহ, যাকে বলা হচ্ছে কাঁচা বাঁশের নির্মাণ আর অচিন পাখি সেই তো এ দেহের প্রাণ, মনের মানুষ, পরমাত্মা - আত্মার পূর্ণাঙ্গ রূপ। আহা! কী অপূর্ব ব্যঞ্জনা! তাদের গানে আছে বাংলার প্রকৃতি, মাটি আর মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা। ভাবনায় আছে এক উদার ও সমন্বয়বাদী মানবচেতনা, যেখানে শাস্ত্রীয় ধর্মের অনুশাসন নেই — আছে গান আর গুরুর নির্দেশ। এ তাদের নিজস্ব সাধনগীত। এ ধারার সূচনা সম্ভবত পঞ্চদশ শতকের বৌদ্ধ ধর্মের ভাব, বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্ব ও সুফি দর্শনের প্রভাবে। যেসব বৌদ্ধরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন বা হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন অথচ পূর্বের ধর্মাচারণেই রত ছিলেন তাঁরাই সম্ভবত সেই সময় বাউল মতের ধারক ও বাহক হয়ে ওঠেন। এইভাবেই হিন্দু- মুসলমানের মিলনেই বাউলমত গড়ে ওঠে। সমস্ত ভেদবুদ্ধি ত্যাগ করে তাঁরা যে মিলনের গান গাইতে লাগলেন সেখানে এক সর্বজনীন পরিভাষাও তাঁরা রচনা করলেন। তাদের ভাষায় পরমেশ্বর বা সচ্চিদানন্দ হলেন মানুষ। তিনি সহজ মানুষ, অটল মানুষ, অধর মানুষ, ভাবের মানুষ, রসের মানুষ, অচিন পাখি, অলখ সাঁই।

তবে বাউল গানের ব্যাপক বিস্তার ঘটে মূলত লালন সাঁইয়ের গানের মাধ্যমে। তিনিই এক সময়ের ব্রাত্যজনের সাধন সঙ্গীতকে শিষ্ট সমাজের গ্রহণযোগ্য করে তোলেন। বাউল সাধনায় গুরু-শিষ্য পরম্পরায় তাঁর গানের চেতনায় আজও তরুণ সমাজ উদ্বুদ্ধ হয়। লালনগীতির প্রবক্তাদের মধ্যে তিনি স্বয়ং ছাড়াও ছিলেন পাঞ্জু শাহ, সিরাজ শাহ, দুদ্দু শাহ প্রধান। গ্রামাঞ্চলে এ গান পরিচিত ‘ভাবগান’, ‘শব্দ গান’ বা ‘ধুয়া গান’ নামেও।

গ্রামীণ মানুষের এ গানকে বিশ্বের মঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। তিনি তাঁর নিজের গানেও ভারতীয় রাগসঙ্গীত, পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সঙ্গেই আনুপাতিকহারে মিশিয়েছেন ভারতীয় লোকগান ও দেশজ কীর্তন। বাউলের সত্যের অনুভব তাঁকে উৎসুক করে তুলেছিল তাঁদের সৃষ্টির প্রতি। এ লোকায়ত সুরের কাছে তাঁর ঋণের কথা স্বীকার করেছেন অকপটে। বাউল আর শান্তিনিকেতনের এক সুদীর্ঘ যুগলবন্দী, আর তার সূচনাও রবীন্দ্রনাথ থেকেই। নবনী দাস বাউল মাঝে মাঝেই আসতেন গুরুদেবকে গান শোনাতে। পৌষমেলাকে গ্রামীণ সংস্কৃতির উজ্জীবন হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাউলদের প্রাধান্য ছিল অনেক বেশি। এ কথা সনাতন দাস বাউলের মতো খ্যাতিমান প্রবীনতম শিল্পীও স্বীকার করেছেন। বাঁকুড়ার খয়েরবুনি গ্রাম থেকে প্রথমে শান্তিনিকেতন, সেখান থেকে কলকাতার শ্রোতৃবৃন্দের সমাদর ও অবশেষে লন্ডনের খ্যাতিযশ। উত্তরণের এই সফরে এক গ্রামীণ শিল্পী পৌঁছে যান বিশ্বপরিচিতির আলোকিত বৃত্তে।

আজকের দিনে যিনি বাউল গান তিনি জীবনযাপনে বাউল নাও হতে পারেন। গত কয়েক দশকে শহুরে বিনোদনে বাউল গান এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে তাতে অনেকেই বাউলের সাজে বাউল গান পরিবেশন করে জীবিকা অর্জন করছেন। সমাজেরই একটা অংশ হয়েও তাদের বসবাস সমাজের এক প্রান্তে। অর্থাভাব, দীনতা তাঁদের নিত্যসঙ্গী। তারই মাঝে নিরন্তর সাধনা। এ অবস্থার যদি কিছু পরিবর্তন ঘটে ক্ষতি কী? ক্ষতি নেই ঠিকই, তবে প্রশ্ন থেকেই যায়। আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের আঙিনায় প্রকৃত বাউল আর সাজানো বাউলের মধ্যে কার জায়গা কতটা। তবে এই সাজানো বাউলের প্রচলন লালনের জীবদ্দশাতেই। তখন কাঙাল হরিনাথ গান লিখে গাইতেন এক বিশেষ আঙ্গিকে। নিজেই দল গড়ে নিজের গানগুলি গেয়ে বেড়াতেন। এই ঐতিহ্য এখনও আছে।

ভূমিহীন সম্প্রদায় একসময় সারাদিন ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে যা উপার্জন করত তা দিয়ে জীবনধারণ করত। কিন্তু আজকের চিত্রটা অন্য। জীবিকা হিসেবে বাউল বেছে নিয়েছে গানকে। রেডিও, টেলিভিশন অন্যান্য বিনোদন জগত, বিদেশের হাতছানি এসবও প্রভাবিত করছে আজকের বাউলকে, বাউল গানকে। মূলত একতারা বা দোতারা বাজিয়ে ভাবের গান গায় যে বাউল তার গানে খমক, ডুগডুগি, ঢোল, খোল, করতাল, মঞ্জিরা, ঘুঙুরেরও শব্দ শোনা যায়। তবে আজকের শ্রোতার মনোরঞ্জনে বাউলের গায়কীতেও এসেছে একটা চাকচিক্যময় চমক। এতকাল গ্রামের শ্রোতাদের মন ভরানো বাউলকে বুঝতে হচ্ছে নাগরিক শ্রোতার রুচিবোধ। আগে পোষাকেও তেমন চাকচিক্য ছিল না। নানা রঙের কাপড় জুড়ে দরিদ্র সাধক যে লম্বা তালিমারা আলখাল্লা পরতেন তাকে বলা হত গুধরি। তারই বর্তমান সংস্করণে আছে সচেতন চমক আর বর্ণময়তা। বাউল নারীর পোষাক অবশ্য চিরকাল শাড়িই। 

এ গান ছড়িয়ে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়াভেদে দুই বাংলায়। এ পারে বীরভূম, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান জেলায় যথেষ্ট সংখ্যায় বাউলের দর্শন মিললেও ‘বীরভূমের বাউল’ শব্দবন্ধটি বহুল প্রচলিত। এর কারণ হয়তো একদিকে জয়দেব-কেন্দুলির মেলা অন্যদিকে শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা। আর একটি কারণ হতে পারে নবনী দাস ও তাঁর প্রখ্যাত পুত্র পূর্ণদাস। জয়দেবের মেলা বাউল সাধক ও গায়ক সম্প্রদায়ের এক বৃহৎ পরিসরের মেলা, যেখানে শহুরে মধ্যবিত্তরা এসে বাউলের ভাবের গানে কাটিয়ে নেন তাদের নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি।  

তত্ত্বভিত্তিক গান হলেও এ গানের সুর, ছন্দ, অর্থ ও ব্যঞ্জনায় শুধু রস বিস্তারই নেই, আছে এক অন্য আবেদনও। বুদ্ধিজীবি শ্রমজীবী সকলের কাছেই বাউল গান আজ তাই গ্রহণীয় আর তার সৃষ্টির ধারাও চলমান। গ্রাম বাংলায় এ গান লিখছেন অনেকে। শহরের মানুষও বাউলের ভাবে ভাবিত হয়ে রচনা করেছেন। সমৃদ্ধ হচ্ছে বাউল জগৎ। বহমান এই বাউল জগতের সঙ্গীতধারার জাঁকজমক, চমক যতই আসর মাতাক মরমী শ্রোতাকে আজও টানে বাউল গানের উদাসী ভাব, না পাওয়ার বেদনার সুর। 

(লেখক লাভপুর সত্যনারায়ণ শিক্ষানিকেতন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। মতামত ব্যক্তিগত)