পেটের কাছে উঁচিয়ে আছো ছুরি/ কাজেই এখন স্বাধীনমতো ঘুরি/ এখন সবই শান্ত, সবই ভালো।— শঙ্খ ঘোষের সত্তরের দশকের আপাতত শান্তিকল্যাণ কবিতাটি আজও রচিত হইতে পারিত। কাশ্মীরের ইতিহাস ভূগোল পাল্টাইবার নির্মম খেলা শুরু হইবার পরে ছয় সপ্তাহ অতিক্রান্ত, উপত্যকা এখনও কার্যত রাষ্ট্রীয় অবরোধের আড়ালে, স্বাভাবিক জনজীবনের প্রাথমিক শর্তগুলিও অপূর্ণ, কবে পূর্ণ হইবে তাহার আশ্বাসটুকুও নাই, অথচ রাষ্ট্রের চালকরা অম্লানবদনে জানাইতেছেন: সব শান্ত, স্বাভাবিক, নিরাপদ। এবং আত্মপক্ষ সমর্থনে তাঁহারা, অম্লানবদনেই, প্রশ্ন তুলিতেছেন: কাশ্মীরে গত ছয় সপ্তাহে (নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে) এক জনও মারা গিয়াছেন কি? এহ বাহ্য— গুলি চলিয়াছে কি? স্বাভাবিকতার এমন বিচিত্র সংজ্ঞা শুনিলে শাজাহান নাটকের জাহানারা মন্তব্য করিতেন: আবার বলি, চমৎকার!

মহম্মদ ইউসুফ তারিগামি সোমবার দিল্লিতে তাঁহার সাংবাদিক সম্মেলনে কোনও নাটকীয় মন্তব্য করেন নাই। অষ্টপ্রহর নাটক করিয়া বেড়াইবার অভ্যাস বা ইচ্ছা সব রাজনীতিকের থাকে না। ‘কাশ্মীরি এবং হিন্দুস্তানি’ হিসাবে সিপিআইএম নেতা তারিগামির বিস্মিত বক্তব্য: গুলি তো কারাগারেও চলে না, তবে কি কারাবাসই স্বাভাবিক জীবন! ‘ভারতবাসীর উদ্দেশে’ তাঁহার আবেদন, কাশ্মীরের মানুষকে বাঁচিতে দেওয়া হউক, এই ভাবে তাঁহাদের ‘তিল তিল করিয়া মারিবেন না।’ রাষ্ট্রের কানে কথাগুলি পৌঁছাইবে কি না সেই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নহেন। বস্তুত, স্বার্থান্বেষীর প্রশস্তি এবং ভক্তদের বৃন্দগান ভিন্ন অন্য কথা, বিশেষত প্রশ্ন বা সমালোচনা শুনিবার কান ভারতীয় রাষ্ট্রের বর্তমান চালকদের আদৌ আছে কি? সাংবাদিক সম্মেলনের পরে তারিগামির নাম রাষ্ট্রযন্ত্রীদের কালো তালিকায় বিশেষ ভাবে চিহ্নিত হইয়াছে, সেই বিষয়েই বরং অনিশ্চয়তা অনেক কম। এই সন্দেহ অহেতুক নহে যে, দীর্ঘ হইতে দীর্ঘতর অবরোধে উপত্যকার নাগরিকদের মনোবল ভাঙিয়া দেওয়াই দিল্লীশ্বরদের প্রকৃত লক্ষ্য। এই লক্ষ্যের নৈতিকতা লইয়া তর্ক করিয়া লাভ নাই, নৈতিকতা আপাতত সরকারি অভিধান হইতে নির্বাসিত। তাহা না হইলে অশীতিপর ফারুক আবদুল্লাকে জন-নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক বলিয়া দুই বছর অবধি আটক রাখিবার উপযোগী আইনে গ্রেফতার করিতে চক্ষুলজ্জায় বাধিত। কার্যসিদ্ধিই এই জমানার একমাত্র ঈশ্বর।

কার্যসিদ্ধি হইবে কি না সেই প্রশ্ন অবশ্য থাকিয়াই যায়। আজ না হউক কাল পুঞ্জীভূত ক্ষোভের জ্বালামুখ খুলিয়া যাইবে, এমন আশঙ্কা স্বাভাবিক। তারিগামিও বিপদসঙ্কেত দিয়াছেন: সরকারের এই নির্মমতা উপত্যকার মানুষকে মানসিক ভাবে বহুগুণ দূরে সরাইয়া দিয়াছে। কিন্তু অমিত শাহ এবং তাঁহার প্রধানমন্ত্রী নির্বোধ নহেন, তাঁহারা সম্ভবত কাশ্মীরে প্রকৃত স্বাভাবিকতা ফিরিবার আশা করিতেছেন না, সেখানকার মানুষের সুখস্বাচ্ছন্দ্য বিষয়ে ভাবিতেছেনও না। তাঁহারা যদি কাশ্মীর প্রকল্পকে (অবশিষ্ট) ভারতের রাজনীতির মাঠে ফসল তুলিবার কাজে সার হিসাবে ব্যবহার করিতে চাহেন, তবে এখনও পর্যন্ত তাঁহাদের পরিকল্পনা সার্থক বলিয়া মনে করিবার যথেষ্ট কারণ আছে— ভারতীয় নাগরিকরা এবং রাজনৈতিক দলগুলিও মোটের উপর সরকারের কাশ্মীর নীতিতে সন্তুষ্ট। উপত্যকার মানুষের সহিত চুক্তিভঙ্গের অন্যায়, তাঁহাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন, এমনকি তাঁহাদের দীর্ঘ যন্ত্রণাময় বন্দিত্বকেও ভারতবাসী আপাতদৃষ্টিতে উপেক্ষা করিতে, বড়জোর ‘কী আর করা যাইবে’ বলিয়া মানিয়া লইতে প্রস্তুত। ভারতীয় জনসাধারণের প্রতি তারিগামির আবেদন সম্ভবত অরণ্যে রোদনমাত্র। চার দশকের পুরানো কবিতা আজও সুকঠিন সত্য: ‘এ-দুই চোখে দেখতে দিন বা না দিন/ আমরা সবাই ব্যক্তি এবং স্বাধীন/ আকাশ থেকে ঝোলা গাছের মূলে।’