রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ”— কাজী নজরুল ইসলামের লেখা এই বিখ্যাত গানের চরণ শুধুই এক ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশ নয়, বাঙালির সামূহিক সংস্কৃতি ও সমাজজীবনেরও অভিজ্ঞান। রমজান মাস এলে মুসলমান সমাজে এক বিশেষ অধ্যাত্ম-আবহ তৈরি হয়। একই সঙ্গে অ-মুসলমান বন্ধুদের এই প্রশ্ন শোনা যায়, “এ বছর রমজান এত আগে কেন?”, বা “সারা দিন কি কিছুই খাওয়া বা পান করা যায় না?” রোজা সম্পর্কে কৌতূহল, অজ্ঞতা ও আগ্রহ, সব কিছুরই যুগপৎ প্রকাশ সেখানে।
‘রোজা’ শব্দটি মূলত ফারসি ‘রোজেহ’ থেকে আসা, যার আরবি প্রতিশব্দ ‘সাওম’ (বহুবচন ‘সিয়াম’)। আদি হিব্রু ভাষায় ‘সম’ শব্দের অর্থ ‘বিরত থাকা’। ‘রমজান’ এসেছে আরবি ‘রামিদা’ বা ‘রামাদ’ মূল থেকে, যার অর্থ প্রচণ্ড উত্তাপ বা দহন। রোজা বা উপবাসের ধারণা শুধু ইসলামে সীমাবদ্ধ নয়, তা মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় অনুশীলন। ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, ইহুদি ধর্ম-সহ বহু ধর্ম-ঐতিহ্যে এই প্রথা বিদ্যমান। প্রাচীন চিন, গ্রিস, মিশর ও জাপানেও উপবাসকে আত্মশুদ্ধি ও মানসিক সংযমের একটি পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হত।
ইসলামে রোজা এক মৌলিক ইবাদত; ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয়। ইসলামি চান্দ্রবর্ষের নবম মাস রমজানে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ ও সক্ষম মুসলমানের রোজা পালন করা ফরজ। ইসলামি হিজরি বর্ষপঞ্জি চন্দ্রচক্র-নির্ভর বলে একটি চন্দ্রবর্ষ ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে সম্পন্ন হয়। ফলে প্রতি বছর রমজান প্রায় দশ দিন করে এগিয়ে আসে। ইসলামি পরিভাষায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও পঞ্চেন্দ্রিয়গত অশুদ্ধাচার থেকে বিরত থাকার নাম রোজা। তা শুধু বাহ্যিক খাদ্যসংযমে সীমাবদ্ধ নয়, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি অর্জনের অনুশীলন। অসুস্থ, গর্ভবতী ও ঋতুমতী নারী বা বিশেষ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য রোজার বিধানে শিথিলতার সুযোগ রয়েছে।
মধ্যযুগে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর রমজানের গুরুত্ব আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। এ সময় শহরে গ্রামে অনেক মসজিদ নির্মিত হয়, নানা ধর্মীয় আচারের ব্যাপক বিস্তার হয়। ইফতারের সময় পারিবারিক ও সামাজিক সমাবেশ, বিশেষ খাবারের প্রচলন, দরিদ্রদের প্রতি দান-সদকার ব্যবস্থা রমজানকে সামাজিক সম্প্রীতির উৎসব করে তোলে।
বাংলায় ইসলাম প্রচারে সুফি সাধকদের অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁদের খানকাহে রমজান মাসে ইবাদত, কোরান তিলাওয়াত, ইফতার, দান-সদকার আয়োজন স্থানীয় মানুষের মধ্যে ধর্মীয় ও মানবিক চেতনা জাগ্রত করত। এই সাধকদের মাধ্যমে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলাম সহাবস্থানের সম্পর্ক গড়ে তোলে। রমজান এক দিকে মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয় দৃঢ় করে, অন্য দিকে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সমন্বয়ও। মির্জ়া নাথানের বাহারিস্তান-ই-গায়েবি গ্রন্থে আছে, তোপধ্বনির মাধ্যমে রমজানের আগমন ঘোষিত হত। ঢাকার বড়কাটরা, আহসান মঞ্জিল, হোসেনি দালানের ছাদে চাঁদ দেখা কেন্দ্র করে ঘনাত উৎসবমুখর পরিবেশ। সাহ্রির সময় রোজাদারদের জাগিয়ে তুলতে কাসিদা বা ধর্মীয় সঙ্গীত গাওয়ার জনপ্রিয় প্রথা ছিল। পাড়ার যুবকদের দল টিনের চোঙা মুখে বা উচ্চৈঃস্বরে গান গেয়ে মানুষকে জাগাত। কাসিদার ভাষা ছিল প্রধানত উর্দু ও ফারসি, বাংলাতেও কিছু কিছু।
রমজান উপলক্ষে তিন ধরনের কাসিদা প্রচলিত ছিল: চানরাতি আমাদ, খোশ আমদেদ ও আল-বিদা। প্রথমটি রমজানকে স্বাগত জানাতে, দ্বিতীয়টি রোজার মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে, তৃতীয়টি রমজানকে বিদায় জানাতে গাওয়া হত। কাসিদা গাওয়ার দলের মধ্যে প্রতিযোগিতাও হত, বিজয়ীরা পেত পুরস্কার। রমজান ঘিরে বাংলার খাদ্য-সংস্কৃতিতেও বৈচিত্র দেখা যায়। সাহ্রির সময় ঢাকাইয়া মুসলমানদের মধ্যে দুধ, ভাত, কলা, আম, শিরবেরেঞ্জের (দুধ চিনি মাওয়া কিশমিশ দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন) মতো খাবারের চল ছিল। অন্য দিকে ইফতারের সময় শরবত, মিষ্টান্ন ও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার বিনিময়ে সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় হত।
অতীতে রোজা পালনের হার একালের মতো এত বেশি ছিল না। অধিকাংশ মুসলমান কৃষক বা শ্রমজীবী হওয়ায়, কঠোর শারীরিক পরিশ্রম হেতু অনেকেই নিয়মিত রোজা রাখতে পারতেন না। পরিবারে নারীরা তুলনায় বেশি রোজা পালন করতেন। গ্রামীণ সমাজে রোজা নিয়ে কিছু কুসংস্কারও প্রচলিত ছিল। আবুল মনসুর আহমদ তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন, অনেকেই মনে করতেন পানি বা তামাক গ্রহণে রোজা নষ্ট হয় না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে বাঙালি মুসলমান সমাজ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে ধর্মীয় পুনর্জাগরণমূলক আন্দোলন— যেমন ফারায়েজি, ওয়াহাবি ও আহলে-হাদিস আন্দোলন— রমজানের রোজা ও শরিয়তসম্মত জীবনযাপনে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে।
উনিশ ও বিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রমজান কেন্দ্রিক সাহিত্য, পত্রপত্রিকায় আলোচনা, ইফতার-সংস্কৃতি ও সামাজিক অনুষ্ঠান বাঙালি মুসলমানদের সাংস্কৃতিক পরিচয় দৃঢ় করে। রমজান তাই ধর্মীয় চর্যা পেরিয়ে ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজ মিলিয়ে এক বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা। রোজা মানুষকে সংযম ও সহমর্মিতার মতো মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়, একাধারে তা বাঙালি মুসলমানের সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গেও গভীর ভাবে আশ্লিষ্ট।
ইতিহাস বিভাগ, ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র কলেজ
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)