নরেন্দ্র মোদীর উপর্যুপরি দ্বিতীয় জয়ের চমৎকারিত্ব কেবল সংখ্যাতেই নহে, তাহার বিস্তারেও। চোখ ধাঁধাইবার মতো এই বিজয় এ বার নিশ্চিত ভাবেই একটি ভারত-ব্যাপী আখ্যান। এবং, সেই সূত্রে, বলিলে ভুল হইবে না যে এ বারের নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির গ্রহণযোগ্যতা তিন দশক ধরিয়া ধারাবাহিক ভাবে চলিয়া আসা খণ্ডপরিচয়-ভিত্তিক রাজনীতিকে প্রথম বার প্রায় অপ্রাসঙ্গিক করিয়া দিয়াছে। একটিমাত্র পার্টি যে সারা দেশে— দক্ষিণের কিছু অংশ বাদ দিয়া— এমন ভাবে গৃহীত হইতে পারে, কোনও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কিংবা পণ্ডিত কিন্তু আগে তাহা ঠাহর করিতে পারেন নাই। ২০১৪ সালের মোদীর বিপুল জয়ের মধ্যে দক্ষিণ ভারত বাদ পড়িয়াছিল, পূর্ব দিকের দেশের অনেকাংশও ভিন্ন কথা বলিয়াছিল। ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের কথা কেহ মনে করাইতে পারেন, সে বারেও ওই রাজ্যে জাতভিত্তিক দলগুলি বিজেপির দাপটের কাছে হার মানিয়াছিল বলিয়া। কিন্তু না, কোনও একটি রাজ্যের নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের তুলনা করা ছেলেমানুষি। বাস্তবিক, আসমুদ্রহিমাচল এমন একখানি রাজনৈতিক ‘গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ’ বা মহা-আখ্যান তৈরির ভাবনাই যেন বিলুপ্ত হইতে বসিয়াছিল। বিজেপির এ বারের কৃতিত্ব বলিতেছে, সেই মহা-আখ্যান ফিরিয়া আসিয়াছে। 

প্রথমেই বলিতে হয় জাতভিত্তিক রাজনীতির প্রধান চারণভূমি বিহার ও উত্তরপ্রদেশের কথা। বিহারে জাত-রাজনীতির অন্যতম শিরোমণি, জেডিইউ-এর নীতীশ কুমার কি দাবি করিবেন যে, পরিস্থিতির আগাম পূর্বাভাস পাইয়াই তিনি জাত-জোট ছাড়িয়া দিয়া বিজেপির সঙ্গ লইয়াছিলেন? তাঁহাকে বাদ দিয়া এ বারের বিজেপি-বিরোধী আরজেডি জোট বাঁধিয়াছিল জিতনরাম মাঁঝি ও উপেন্দ্র কুশওয়াহার দলের সহিত, সঙ্গে ছিলেন মুকেশ সহানি। দলিত ও মহাদলিতদের সহিত মুসলিম ভোটের এই সমন্বয়ের পাশে কংগ্রেস থাকিলে অপরাজেয় হইবেন, এমনই তাঁহারা ভাবিয়াছিলেন। অথচ দেখা গেল, এনডিএ-র বিজয়রথ তাঁহারা মোটেই প্রতিহত করিতে পারিলেন না, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘শক্তিশালী ভারত’-এর ছবিটি তিপ্পান্ন শতাংশেরও বেশি ভোট টানিয়া লইল, বিপরীতে তাঁহাদের ক্ষোভ-বিক্ষোভের কাহিনিগুলি দানা বাঁধিতে পারিল না। একই ভাবে, উত্তরপ্রদেশে বিজেপির ভোট ২০১৪ সালের বিয়াল্লিশ শতাংশকে ছাপাইয়া যখন এই বৎসর উনপঞ্চাশ শতাংশ ছুঁইতেছে, এসপি-বিএসপির জোটটি কিন্তু তখনও অভিযোগ-প্রত্যভিযোগের প্লাবনেই ভাসমান। যে কোনও কারণেই হউক, মানুষ নিজ নিজ গোষ্ঠীনেতৃত্বের প্রতি আগের মতো বিশ্বস্ততা দেখাইতে অস্বীকার করিয়াছেন। নির্বাচনী ফলাফলে তাহা স্পষ্ট। 

কেবল বিজেপির হৃদয়পুর উত্তর ভারতই নহে। গত পাঁচ বৎসরের ইতিহাস বলিতেছে, গুজরাত বা মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যও কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন কারণে দলিত আন্দোলনে উদ্বেল হইয়াছিল। প্রায় যেন প্রতিক্রিয়ার ধরনে, ওই দুই রাজ্যে উচ্চবর্ণের গোষ্ঠীগুলিও বিজেপি রাজ্য প্রশাসনকে তীব্র সঙ্কটে ফেলিয়াছিল। অথচ, নির্বাচনের অঙ্গনে দেখা গেল, ওই সব বিক্ষোভ কিংবা সঙ্কটের যথেষ্ট প্রতিফলন নাই। এমনকি মুসলিম সম্প্রদায় হইতেও পদ্মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এককাট্টা হইয়াছে কি না, ইহাও একটি প্রশ্ন হইতে পারে। যে সকল ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলি আইডেন্টিটি-রাজনীতির সহিত যুক্ত নহে, তাহারাও অধিকাংশই অসফল— অবশ্যই কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম বাদ দিয়া। সব মিলিয়া যে ছবি তৈরি হইয়াছে, তাহা নিশ্চয় নূতন ভারত-বিশ্লেষণ দাবি করে। গণতন্ত্রের তৃণমূলীকরণের অব্যবহিত উত্তরকল্প যে আইডেন্টিটি-রাজনীতির ধারা, তাহা দিয়া আদৌ আর এই দেশের বাস্তবকে ধরা যাইবে কি না, সেই বিবেচনার অপেক্ষায় থাকে।