রবিবারের সকালে ধীরেসুস্থে বিছানা ছেড়ে, আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিয়ে, বাজারঘাট ও সপ্তাহভর জমে থাকা ঘর-গেরস্তালির কাজ সেরে যেটুকু সময় মেলে, তখন মানুষ ভাবে বন্ধুদের কথা। ফোন হাতে তুলে মেসেজ করে: আজ বিকেলে একটু আড্ডা দিলে কেমন হয়, কত দিন দেখা হয়নি! ও-পাশ থেকে হয়তো উত্তর আসে, বা আসে না। ওয়টস্যাপের নীল টিকচিহ্ন জেগে থাকে সময়ের ঠাট্টা হয়ে। গড়পড়তা মানুষ তখন কী করেন? অন্য— দ্বিতীয়, তৃতীয় কোনও বন্ধুকে যোগাযোগ করেন? বন্ধুর বিকল্প খুঁজে নেন অন্যত্র, এমন কোনও কাজে যা মন ফুরফুরে রাখবে? না কি, রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় মনখারাপ করে বসে ভাবেন, জীবন তো এই সে দিনও এমন ছিল না; যাদের মনে হত অত্যাগসহন, তারাও কি পাল্টে গেল এতটাই?
‘বন্ধু’ নামের ব্যক্তিগত, সামাজিক, মানসিক আশ্রয়টির ক্রমশ কমে যাওয়া, কিংবা সম্পূর্ণ বন্ধুহীনতা হয়ে উঠছে একুশ শতকের অভিজ্ঞান, বলছেন সমাজ-মনস্তাত্ত্বিকরা। এই ঘটনার একটা পোশাকি নামও দেওয়া হয়েছে, ‘ফ্রেন্ডশিপ রিসেশন’। গবেষকরা কাজ করছেন নানা দেশের তথ্য নিয়ে; এ বছরেরই এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, একটিও ‘কাছের বন্ধু’ নেই, আমেরিকায় এমন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা ১৯৯০-এর পর থেকে চতুর্গুণ বেড়ে ১২% হয়েছে, দশ বা তার বেশি কাছের বন্ধু আছে এমন মানুষের সংখ্যা কমেছে শতাংশের হারে তিন গুণ। ভাবা হচ্ছিল, কোভিড-অতিমারি এসে বিশ্ব জুড়ে সর্বার্থেই বন্ধুত্ব কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বন্ধুহীনতার অসুখ ছড়িয়ে গেছে তার ঢের আগে থেকেই। আমেরিকানরা যেখানে খুবই বন্ধুপ্রিয়, সপ্তাহে প্রায় ৬ ঘণ্টা ৫০ মিনিট বন্ধু-সঙ্গে কাটাতেন দশকের পর দশক ধরে, সেখানে ২০১৪-১৯ সময়কালে সেই সময় কমে নেমে এসেছে সপ্তাহে মাত্র চার ঘণ্টায়। এক হিসাবে দেখা গেছে, সে দেশে ‘সোলো ডাইনিং’ বা ঘরের বাইরে রেস্তরাঁ-ক্যাফেতে একা বসে খাওয়ার ঘটনা গত দু’বছরে বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
আমেরিকা নিমিত্তমাত্র; ভারতীয়রাও এ প্রশ্ন নিজেদের করে দেখতে পারেন, বন্ধুহীনতায় কি ভারতীয় সমাজও আক্রান্ত? বন্ধুত্বের গুরুত্ব, প্রিয় বা কাছের বন্ধুর সংখ্যা, বন্ধুর সঙ্গে সপ্তাহে বা মাসে কাটানো সময় নিয়ে ভারতে কোনও সমীক্ষা বা গবেষণা হয়েছে কি না জানা নেই, তবে চার পাশে তাকালে যে ছবিটা চোখে পড়ে তা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। অনেকে বলবেন এর সঙ্গে আর্থ-সামাজিক অবস্থানের একটা যোগ আছে: উচ্চবিত্ত মানুষের বন্ধুসংখ্যা কম, মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও সমাজের নিচুতলায় বরং বন্ধুত্ব টিকে থাকে বেশি— এমনকি বার্ধক্যেও। এই সবই অতিসরলীকরণ, যত ক্ষণ না বিজ্ঞানসম্মত আন্তরিক গবেষণায় তা মাপা হচ্ছে। তবে রাজনীতি ও অর্থনীতি যে বয়স-লিঙ্গ-প্রজন্ম নির্বিশেষে আজকের ভারতীয়দের বন্ধুত্বে প্রভাব ফেলছে, সেই ভাবনা অমূলক নয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন ‘সাবআরবান স্প্রল’-এর কথা, নগর ক্রমশ শহরতলি-মফস্সলের দিকে এগিয়ে বড় করে নিচ্ছে তার সীমা, বন্ধুরা চলে যাচ্ছে শহরের মধ্যে থেকেই শহর থেকে দূরে। সমাজতাত্ত্বিকরা বলছেন, আগে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে একটা ‘থার্ড স্পেস’ থাকত— শহরে ক্লাব, কমিউনিটি সেন্টার, পার্ক; গ্রামে খোলা মাঠ, নদীর পাড়, পুজোমণ্ডপ— যেগুলি হয়ে উঠত বন্ধুত্বের অবধারিত ও অবারিত পরিসর। ধনতান্ত্রিক, উন্নয়নমুখী ও বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে রাষ্ট্র বা সরকার এখন এই ‘থার্ড স্পেস’কে মানবিক ভাবে না দেখে দেখছে উপযোগবাদিতার চোখে। শহুরে পার্কে তাই প্রবেশ-ফি, সময় ও নিয়মের কড়াকড়ি; গ্রামে ক্রমশ ফিকে হচ্ছে মাঠ ও নদীর অবয়ব। আর সবার উপরে আছে জীবন-জীবিকার ক্রমবর্ধমান চাপ, কর্মব্যস্ততা যত বেড়েছে, বন্ধুরা তত মুছে যাচ্ছে জীবন থেকে। বন্ধুতে-বন্ধুতে রাজনৈতিক ভাবনায় মতান্তর আগেও ছিল, কিন্তু মনান্তর ছিল অভাবনীয়। এখন তা হয়ে উঠেছে রূঢ় বাস্তব, রাজনীতির বিশ্বাস-অবিশ্বাস মুহূর্তে ভেঙে দিচ্ছে দীর্ঘলালিত বন্ধুত্বকে। আন্তর্জাল, আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্র মানুষকে ঘরকুনো করছে, মানুষ-বন্ধুর বিকল্প হয়ে উঠেছে কয়েক ইঞ্চির ছোট উজ্জ্বল পর্দার ও-পারের বন্ধুরা। এ সত্যিই বিকল্প কি না সে-ও ভাবার, কারণ একটু তলিয়ে দেখলেই বেরিয়ে পড়বে বন্ধুহীনতার, একাকিত্বের নানান চিহ্ন। মনস্তাত্ত্বিকেরা বলছেন, আগেকার সামাজিক জীবনে একাকিত্ব ছিল একটা ‘চয়েস’, কেউ চাইলে তা বেছে নেওয়ার অবকাশ ছিল, না চাইলে অসুবিধা নেই। এখনকার জীবনে একাকিত্ব ক্রমেই হয়ে উঠছে ‘ডিফল্ট’, পূর্বনির্ধারিত। ‘এই নির্বান্ধব জীবন লইয়া কী করিব?’— কে দেবে এ প্রশ্নের উত্তর?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)