Advertisement
E-Paper

সিঙ্গুরে কাজটা কিন্তু ছিল গণতন্ত্রের

গণতান্ত্রিক রাজনীতির শর্ত লঙ্ঘন করে সিঙ্গুরের জমি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সিঙ্গুর আন্দোলন সেই রাজনীতির এক বিরাট সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। সেটা এখনও সম্ভাবনাই থেকে গেল।সিপিআইএম নেতৃত্ব মার্জনা চাওয়ার কোনও কারণ খুঁজে পাননি, সম্ভবত কারণ খোঁজার চেষ্টাই তাঁরা করেননি। অথচ, সেই কারণ অনুসন্ধানটাই হয়তো বা ছিল সবচেয়ে জরুরি কাজ, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন তাঁদের গৃহীত একটি নীতির বিরুদ্ধে জন-বিক্ষোভ তাঁদের রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তিটা নড়বড়ে করে দিয়েছে।

কুমার রাণা

শেষ আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০০:০০
অতঃপর? শিল্পের জন্য সমাবেশ। সিঙ্গুর, জানুয়ারি ২০১৬। ছবি: সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

অতঃপর? শিল্পের জন্য সমাবেশ। সিঙ্গুর, জানুয়ারি ২০১৬। ছবি: সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

সিপিআইএম নেতৃত্ব মার্জনা চাওয়ার কোনও কারণ খুঁজে পাননি, সম্ভবত কারণ খোঁজার চেষ্টাই তাঁরা করেননি। অথচ, সেই কারণ অনুসন্ধানটাই হয়তো বা ছিল সবচেয়ে জরুরি কাজ, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন তাঁদের গৃহীত একটি নীতির বিরুদ্ধে জন-বিক্ষোভ তাঁদের রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তিটা নড়বড়ে করে দিয়েছে। শিল্পায়নের পথে দ্রুত আর্থিক অগ্রগতির উপর যে জোর তাঁদের নীতিটিতে পড়েছিল, তা রাজনৈতিক গণতন্ত্রের কিছু মৌলিক শর্ত লঙ্ঘন করে। এক, নীতিটা ঠিক না ভুল, সে আলোচনার সুযোগ না দিয়েই এর রূপায়ণ; দুই, রূপায়ণের প্রক্রিয়াতে বলপ্রয়োগ। সংগত কারণেই বহু মানুষ একে গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে দেখেছেন।

এমন নয় যে, সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে সারা রাজ্য জুড়েই যে-সব লোক তৎকালীন রাজ্য সরকারের বিরোধিতায় নেমেছিলেন তাঁরা সকলেই শিল্পের বিরোধী ছিলেন বা এখনও আছেন। প্রকৃতপক্ষে, খোদ সিঙ্গুরের যে-জমি নিয়ে গণ-বিক্ষোভ, সেই জমির মালিকদের একটা ভগ্নাংশমাত্রই অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেছিলেন, বেশির ভাগই ক্ষতিপূরণের শর্তে জমি দিয়ে সেই অর্থ অকৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। সমস্যা হল, সরকারি ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত দলগুলি রাজনৈতিক গণতন্ত্রের যে পাঠ নিয়ে থাকেন, তা প্রধানত নির্বাচনকেন্দ্রিক, সুতরাং সীমাবদ্ধ। এক কথায় এটাকে বলা যায় অন্তর্ভুক্তির সমস্যা: ভিন্নমত পোষণের অধিকারটাকে হয় এড়িয়ে যাওয়া, অথবা দমন করা। নির্বাচনী সাফল্যের মাত্রা যত বৃদ্ধি পায়, মতভেদকে অস্বীকার করার প্রবণতা ও মাত্রাও তত বাড়ে। সিঙ্গুরে ঠিক এই সমস্যাটাই হল, যাঁরা জমি দিতে অনিচ্ছুক তাঁদের অধিকার হরণ করা হল। নির্বাচনী সাফল্য শাসকদের চিন্তার এতটাই গতিরোধ করে যে, এই অধিকার হরণে তাঁরা একটি ঔপনিবেশিক, জনবিরোধী, বলপ্রয়োগমূলক আইনের শরণ নিতেও কুন্ঠিত হলেন না। নীতি নৈতিকতাকে আচ্ছন্ন করল।

সেটা না হলে সিপিআইএম নেতৃত্বের পক্ষে যে চিন্তাটা করা সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল তা হল, অনিচ্ছুকরা কোন আশংকা থেকে জমি দিতে চাননি, এবং আগ্রহীদের জমির বদলে ক্ষতিপূরণ নিতে রাজি হওয়ার পিছনে কোন সম্ভাবনা বা প্রণোদনা কাজ করছিল। কাণ্ডজ্ঞান প্রয়োগ করেই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যেত: উভয় পক্ষই নিজের নিজের অবস্থান থেকে একটা লাভ-ক্ষতির হিসাব কষেছিলেন; ইচ্ছুকদের পক্ষে ক্ষতিপূরণের অর্থ অন্যত্র বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল— কৃষিতে যা আয়, সে তুলনায় ব্যাঙ্ক বা ব্যবসায় বিনিয়োগ তাঁদের কাছে তুলনায় লাভজনক মনে হয়েছিল। তার চেয়ে বড় কথা, চাষবাষ ছেড়ে অন্য কিছু করার সামর্থ্য তাঁদের ছিল। অন্য দিকে, অনিচ্ছুকদের কৃষির ওপর নির্ভরশীলতা এতটাই বেশি এবং অকৃষিক্ষেত্র থেকে জীবিকানির্বাহের সম্ভাব্যতা এতটাই সীমিত যে, তাঁদের চেতনায় জমিটাই ছিল তাঁদের একমাত্র অবলম্বন।

জমির সঙ্গে কৃষকের সাংস্কৃতিক যোগের কথা সিঙ্গুর বিতর্কে উঠে এসেছে— সেই যোগটাও ভিন্ন ভিন্ন লোকের ভিন্ন ভিন্ন আর্থিক সম্ভাব্যতা থেকে বিযুক্ত নয়। ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক বিভাজনটা মোটা দাগে আর্থ-সামাজিক সক্ষমতার বিচারে দুই শ্রেণির প্রতিফলন। বামফ্রন্ট সরকার সক্ষমতা-কেন্দ্রিক এই বিভাজন দূর করার লক্ষ্য স্থির না রেখে (শিক্ষা স্বাস্থ্য কর্মনিয়োজন ইত্যাদিতে সেই সরকারের অবহেলা‍য় যার প্রতিফলন), আর্থনীতিক প্রগতির যে পথটা বেছে নিলেন, সেটাতে দুর্বলদের চেয়ে বলবানদের লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি ছিল। মানুষ অভিজ্ঞতা থেকেই এই সত্যটা বুঝতে পারেন। দুর্বলদের প্রতি এই অবহেলা একটা আর্থনীতিক বিষয়ের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের প্রশ্নটাকে সামনে তুলে আনে— অনিচ্ছুকদের দাবির প্রতি দৃকপাত না করা যে একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের লঙ্ঘন, তা বোঝার মতো চিন্তাটাই সিপিআইএম নেতৃত্ব করে উঠতে পারেননি। এখনও যে সেই দৈন্যদশা থেকে মুক্তি ঘটেনি, মার্জনা চাওয়ার কারণ খুঁজে না পাওয়ার মধ্যেই তা স্পষ্ট।

অবশ্য বিশ্লেষণী অনুসন্ধান থেকে বিরত থাকার এই গুণ কেবল সিপিআইএমের অর্জন নয়। যেমন, যাঁরা আজকে আদালতের রায়কে সিঙ্গুর আন্দোলনের জয় বলে উদযাপিত করছেন, একটু তলিয়ে দেখলেই কিন্তু তাঁরা এটাকে একপ্রকার পরাজয় হিসেবেও দেখতে পেতেন— যে প্রশ্নটা ছিল একান্ত ভাবেই একটা গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিষয়, তার সমাধান পেতে আদালতে যেতে হল; যে সমস্যাটার সূচনাই হয়েছিল একটা বলপ্রয়োগমূলক আইনের প্রয়োগের মধ্য দিয়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতে তার সুরাহা করা গেল না, আইনি ব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে হল। আইন তো আসলে ব্যক্তি-নিরপেক্ষ নয়— একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বিচারক ভিন্ন ভিন্ন রায় দেন। আলোচনানির্ভর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সেখানে অনেক বেশি নিরপেক্ষ ও নৈর্ব্যক্তিক হতে পারে।

আবার, শাসনতন্ত্রের অ-গণতান্ত্রিক প্রয়োগের বিরুদ্ধে, বহু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রয়াসে, দলীয় রাজনীতি এবং নাগরিক রাজনীতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সামাজিক রাজনীতির একটা ব্যাপকতর রূপ হিসেবে যে সিঙ্গুর আন্দোলন বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল, তার যাবতীয় ফসল যে কার্যত একটিই রাজনৈতিক দল কেটে নিয়ে গেল সেটাও কি একপ্রকার পরাজয় নয়? দলটিকে দোষী সাব্যস্ত করা চলে না, দলীয় রাজনীতি দলীয় আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ নেবেই। কিন্তু যে বৃহত্তর লোক-সম্মিলন এই আন্দোলনের নির্মাতা ছিল, সেই লোকেদের অনেকাংশই যখন দলীয়তার কাছেই নিজেদের সমর্পিত করে দেন, তখন সামাজিক নৈতিকতার কংকালসার চেহারাটাই ফুটে ওঠে। তাঁরা সহজেই ভুলে যান যে দলীয় রাজনীতির বিরোধিতা করেই তাঁরা সামাজিক প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। যে শক্তি সমাজে দলীয় রাজনীতিকে জনস্বার্থের পথে সুস্থিত থাকতে সতর্ক করবে বলে প্রত্যাশিত ছিল, সেটাই যখন দলের অংশ হয়ে ওঠে, তখন তাকে সামাজিক রাজনীতির পরাজয় হিসেবে না দেখে উপায় নেই।

এ-কথা ঠিক যে, পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক রাজনীতির পরিসরটা কোনও দিনই খুব প্রশস্ত ছিল না, কিন্তু এটাও সত্য যে, দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা দলীয় রাজনীতির আধিপত্যের বিরুদ্ধে লোকসাধারণের উষ্মা জমতে জমতে একটা সামাজিক রাজনীতির ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, যা সিঙ্গুর থেকে নন্দীগ্রাম-লালগড় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। কিন্তু, অবশেষে সেই রাজনীতি শুধু এক দলের বিরুদ্ধে অন্য এক দলকে অধিষ্ঠিত করল না, একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতিষ্ঠাতেও অনুঘটকের কাজ করল। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গের হাজার সমস্যা থাকা সত্ত্বেও, এ রাজ্য ব্যক্তি-নৈতিকতার এমন একটা উচ্চ মান বজায় রাখতে পেরেছিল, যা তাকে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে একটা স্বতন্ত্র স্থান দিয়েছিল। আজকের পশ্চিমবঙ্গ যেন ব্যক্তি-নৈতিকতা-বিবর্জিত সর্বভারতীয় রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যটি অর্জন করতে বদ্ধপরিকর।

আবার সিঙ্গুর আন্দোলন উচ্চ-গুণমানসম্পন্ন এক রাজনীতির সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। বহু-আকাঙ্ক্ষিত এই সম্ভাবনার ভিত্তি ছিল জনসাধারণের উপর বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরগুলোর সম্মিলন। পাশাপাশি, এই আন্দোলনের মধ্য পশ্চিমবঙ্গের সমাজে চলে আসা লঘু-গুরু ভেদাভেদগুলো থেকে খানিকটা হলেও বেরিয়ে এসে উচ্চবর্গীয়রা ক্ষমতাবৃত্তের বাইরে থাকা নিম্নবর্গীয়দের পক্ষ অবলম্বনের মানসিক প্রস্তুতি নিতে পেরেছিলেন, বা নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, হয়তো বা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার আশঙ্কায়। তাঁরা যে তাঁদের শ্রেণি-অবস্থানের টানেই আবার শাসকপক্ষে ফিরে গেলেন, এটাকেও দুর্বলদের সাময়িক পরাজয় বলে মেনে না নেওয়া কঠিন।

আর্থনীতিক ক্ষেত্রেও সিঙ্গুর নতুন চিন্তাভাবনার বহু সুযোগ দিয়েছিল। যেমন, শিল্পায়ন বিষয়ে কী নীতি নেওয়া হবে? সমাজে বৈষম্য যে ক্রমবর্ধমান তা জানতে গবেষণার দরকার নেই; কলকাতা শহর থেকে সীমান্তবর্তী গ্রাম পর্যন্ত এক দিকে মানুষের সীমাহীন অসহায়তা-অক্ষমতা, অন্য দিকে বৈভব ও ক্ষমতার নির্লজ্জ প্রদর্শন, চাইলেই চোখে দেখা যায়। এই উৎকট শ্রেণি-বিভাজনে শিল্পায়ন অবশ্যই সুবিধাভোগীদের বেশি লাভবান করে; কিন্তু সেই সঙ্গে আর্থনীতিক বৃদ্ধির প্রয়োজনটাকেও অস্বীকার করা চলে না। দুর্বলদের সক্ষমতা-বৃদ্ধি, সামাজিক প্রক্রিয়াগুলোতে তাঁদের হিস্সাদারি সুনিশ্চিত করা, অর্থাৎ, তাঁদের নিজেদের মতো করে বিকশিত হতে পারার সুযোগ সৃষ্টির নৈতিক কর্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার সঙ্গে শিল্পায়নের আর্থনীতিক উদ্যোগের বিরোধ এবং সামঞ্জস্যের প্রকৃতি ও পরিসরগুলো কী রকম, বিশ্ব-জোড়া আর্থনীতিক গতি-প্রকৃতির সঙ্গে স্থানিক সম্পর্কগুলো কী হবে, কী ভাবে সেই সম্পর্কগুলোকে জনসাধারণের মধ্যে সর্বাপেক্ষা বঞ্চিতদের স্বার্থে কাজে লাগানো যেতে পারে, তা নিয়ে গভীর আলোচনার প্রভূত সুযোগ সিঙ্গুর আন্দোলন আমাদের দিয়েছিল। কৃষি বিষয়েও একই কথা। গত তিন দশকে কৃষিতে উৎপাদন ব্যবস্থায় যে গভীর, কিছু ক্ষেত্রে আমূল, পরির্বতনগুলো ঘটে গেছে সেগুলোর বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে গুরুতর চিন্তার প্রয়োজনটাও সিঙ্গুর আন্দোলন তুলে ধরেছিল। সিঙ্গুর কেবল জমি দিতে অনিচ্ছুক কৃষকদের আন্দোলন ছিল না, রাজনৈতিক দর্শন, আর্থনীতিক নীতি, এবং সামাজিক নৈতিকতা বিষয়ে নতুন ভাবে চিন্তা করার একটা প্রবেশপথও ছিল। চিন্তার পরিবর্তনটাই হতে পারত সিঙ্গুরের মহত্তম জয়। সে সুযোগ হয়তো সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়নি। কিন্তু কাজটা অনেক বেশি কঠিন হয়েছে, এটা মেনে নিয়েই বোধহয় আমরা সুযোগটাকে ব্যবহার করার কথা ভাবতে পারি।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy