• অভিরূপ সরকার
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

হিন্দুর জন্য ধর্মই নাগরিকত্বের অধিকার, মুসলিমদের জন্য চাই কাগজ

ভুল যুক্তি, মিথ্যা দাবি

CAA

সিটিজ়েনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, সাধারণ নাগরিকদের একটা গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রশ্নটা হল, ভারত কি তার ধর্ম-নিরপেক্ষ কাঠামোটা বজায় রাখতে পারবে, না কি অচিরেই একটা হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত হবে? প্রতিবাদীদের আশঙ্কা, কেন্দ্রে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল দেশটাকে দ্রুত দ্বিতীয় সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সিএএ ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলছে। বলছে, ২০১৪ সাল অবধি প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে মুসলমানদের বাদ দিয়ে অন্য ধর্মের মানুষ, যাঁদের বেশির ভাগই হিন্দু, অবৈধ ভাবে ভারতে ঢুকে বসবাস করছেন, তাঁদের শরণার্থী হিসেবে গণ্য করে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। মুসলমানেরা বাদ কারণ সিএএ-র চোখে তাঁরা অনুপ্রবেশকারী। প্রতিবাদীদের সমর্থন বা নিন্দার আগে সিএএ-র সমর্থনে যে যুক্তিগুলো বিজেপি দিচ্ছে সেগুলো ভাল করে খতিয়ে দেখা দরকার। 

পার্লামেন্টে এই বিল নিয়ে বিতর্কের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এই বিলের পক্ষে দু’টি কথা বলেছিলেন। প্রথমত তিনি দাবি করেছিলেন, এই বিলের পিছনে ১৩০ কোটি ভারতবাসীর সমর্থন আছে। সম্ভবত বলতে চাইছিলেন, এই সরকার বিপুল জনাদেশ পেয়ে ক্ষমতায় এসেছে, যার ফলে লোকসভা, রাজ্যসভা দু’টি জায়গাতেই তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা যখন বিলটি আইনে রূপান্তরিত করছেন তখন প্রক্রিয়াটি শুধু আইনসিদ্ধ নয়, নৈতিক ভাবেও গ্রাহ্য, যে হেতু বিপুল জনসমর্থন তাঁদের পিছনে রয়েছে। 

বলাই বাহুল্য, ১৩০ কোটি ভারতবাসীর সকলে বিজেপিকে ভোট দেয়নি। অনেকের ভোটাধিকারই হয়নি, যাঁদের হয়েছে তাঁরাও সকলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, এমন নয়। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ৬০.৩৭ কোটি ভারতীয় ভোট দিয়েছিলেন, তার মধ্যে বিজেপি পেয়েছিল ৩৭.৩৬% ভোট আর সম্মিলিত ভাবে এনডিএ পেয়েছিল ৪৫% ভোট। তাই শ্রীঅমিত শাহের বক্তব্যে কিছু অতিশয়োক্তি আছে। কিন্তু সেটুকু বাদ দিলেও আপাতদৃষ্টিতে তাঁর বক্তব্যের সারবত্তা অস্বীকার করা যায় না। গণতন্ত্র চালিত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়মে। আশা করা যায় না, সব সিদ্ধান্তের পিছনে সমস্ত নাগরিকের সমর্থন থাকবে। সে দিক থেকে দেখলে, অমিত শাহেরা নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন। উপরন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনের বিষয়টা বিজেপির নির্বাচনী ইস্তাহারে পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ করা ছিল। তাই অমিত শাহেরা বলবেন, বিজেপি ভোটারদের সঙ্গে তঞ্চকতা করেনি। যা করার আগে থেকে জানিয়েই করেছে। আর, সিএএ হতে পারে জেনেও যখন ভোটারেরা বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, তখন ধরে নিতে হবে, এর পিছনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের সমর্থন আছে। 

শাহের দ্বিতীয় বক্তব্য নেহরু-লিয়াকত চুক্তি নিয়ে। ভারত ও পাকিস্তান এই দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এবং লিয়াকত আলি খানের মধ্যে ১৯৫০ সালে চুক্তি হয়েছিল দু’টি দেশই সর্বতো ভাবে তাদের সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষা করবে। অমিত শাহ বলছেন, পাকিস্তান সেই চুক্তির মর্যাদা দেয়নি। চুক্তির পরেও পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানে এবং পরবর্তী কালে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুরা ধারাবাহিক ভাবে নিপীড়িত হয়েছেন। সেই নিপীড়িত হিন্দুদের আশ্রয় দিতেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মোদী-শাহদের পূর্বসূরি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় গোড়া থেকেই এই চুক্তির বিরোধী ছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল পাকিস্তান কখনওই তা মেনে চলবে না। বস্তুত, এই চুক্তির প্রতিবাদে শ্যামাপ্রসাদ নেহরু-মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। 

প্রশ্ন হল, সত্যিই কি পাকিস্তান বা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুরা অত্যাচারিত হয়েছেন? এ-ব্যাপারে সরাসরি প্রমাণ পাওয়া শক্ত কিন্তু পরোক্ষ কিছু পরিসংখ্যান থেকে মনে হয়, সে সব দেশে হিন্দুরা খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না। পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের দিকে তাকানো যাক। ১৯৪১ সালের জনগণনা অনুযায়ী সে দেশে হিন্দুরা ছিলেন জনসংখ্যার ২৮%। দেশভাগের পর এই অনুপাত হঠাৎ কমে গিয়ে ১৯৫১-র গণনায় দাঁড়ায় ২২.০৫%। এটা খুব একটা আশ্চর্যের নয়। কিন্তু যেটা আশ্চর্যের সেটা হল, এর পরেও পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত ধারাবাহিক ভাবে কমতেই থেকেছে। কমতে কমতে ২০১১ সালের সেনসাসে তা দাঁড়িয়েছে ৮.৯৬%-এ। মুসলমানদের তুলনায় হিন্দুদের জনসংখ্যার বৃদ্ধিহার কম, শুধু এইটুকু বললে এই কমে যাওয়া ব্যাখ্যা করা যাবে না। ঢাকার অর্থনীতিবিদ আবুল বরকত হিসেব করেছেন, ১৯৬৪ এবং ২০১৩ এই সময়ের মধ্যে ১.১৩ কোটি হিন্দু বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গিয়েছেন। সংখ্যাটার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে হিন্দু ছিলেন ১.৭ কোটি। 

বিজেপির যুক্তিগুলো আপাত দৃষ্টিতে জোরদার মনে হলেও আসলে ফাঁকফোকরে ভর্তি। প্রথমত, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার বিজেপিকে ভোট দিলেও ঠিক কিসের সমর্থনে তাঁরা সেই ভোট দিয়েছেন, এটা আদৌ স্পষ্ট নয়। সিএএ ছাড়াও বিজেপির ইস্তাহারে তিন তালাক, ৩৭০ ধারা, রামমন্দির ইত্যাদি আরও অনেক প্রসঙ্গ ছিল। সম্ভবত, এক-এক জন ভোটার এক-একটা কারণে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। কেউ মোদীর আকর্ষণী শক্তিতে আপ্লুত হয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, আবার কেউ রাহুল গাঁধীর প্রতি আস্থাহীনতার কারণে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। সব মিলিয়ে নিছক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে সিএএ’র পিছনে এত ভোটারের সমর্থন দাবি করা যায় না।

বিদেশে, বিশেষ করে ইউরোপে, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারও ওই বিতর্কিত বিষয়টি নিয়ে আলাদা করে আবার ভোটারদের মতামত জানতে চায়। এই প্রক্রিয়ার নাম ‘রেফারেন্ডাম’ বা গণভোট। স্মরণ করা যেতে পারে, ব্রেক্সিট, অর্থাৎ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংখ্যাগরিষ্ঠ কনজ়ারভেটিভ দলের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ভোটারদের মত জানতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজে ছিলেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন-এ থেকে যাওয়ার পক্ষে। কিন্তু গণভোটে ৫২%-৪৮%-এ হেরে যাওয়ার পর তাঁকে জনতার রায় মেনে নিতে হয়েছিল। সিএএ নিয়ে দেশব্যাপী প্রবল প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে তেমনই একটা রেফারেন্ডামের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটা করার অভিপ্রায় বা সাহস বিজেপির আছে বলে মনে হয় না। তাই নাগরিকদের প্রতিবাদ ছাড়া মত জানানোর আর কোনও উপায় নেই। গণতন্ত্রে প্রত্যেক নাগরিকের প্রতিবাদ করার অধিকার আছে। রাষ্ট্রশক্তি দিয়ে সেই প্রতিবাদ আটকাতে চাইলে সেটা গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করার শামিল। আমরা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম অন্দোলনের সময় দেখেছি সঙ্গবদ্ধ ভাবে প্রতিবাদ করতে পারলে সামগ্রিক জনমতও একটু একটু করে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারের বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। 

বিজেপির দ্বিতীয় দাবি, সিএএ শুধুমাত্র নিপীড়িত হিন্দু শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্যই। এখানে কিন্তু সিএএ-কে এনপিআর ও এনআরসি-র সঙ্গে একত্র করে দেখতে হবে। তিনটিকে মেলালে দাঁড়ায় যে, হিন্দুদের জন্য তাঁদের ধর্মই নাগরিকত্বের অধিকার, কিন্তু এক জন মুসলমানকে কাগজ দেখিয়ে প্রমাণ করতে হবে তিনি বা তাঁর পূর্বপুরুষ একটা বিশেষ সময়ের আগে থেকে এ দেশে বসবাস করছেন। সুদূরপ্রসারী ও ভয়ানক এর তাৎপর্য। আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষের কাছেই তাঁদের জন্মের প্রমাণপত্র নেই, কাজেই মুসলমানদের নাগরিকত্ব অনেকাংশেই সরকারি বদান্যতার ওপর নির্ভর করবে। এবং যে হেতু বর্তমান সরকার মুসলমানদের প্রতি খুব একটা সদয় নয়, তাই ভারতীয় মুসলমানদের ভবিষ্যৎ সরু সুতোয় ঝুলছে।

মেনে নিলাম, আমাদের প্রতিবেশী ইসলামিক দেশগুলিতে হিন্দু সংখ্যালঘুরা যথোপযুক্ত নিরাপত্তা বা মর্যাদা পায়নি। কিন্তু তাই বলে আমরা কেন সেই নিন্দনীয় দৃষ্টান্ত অনুসরণ করব? ধর্মীয় বিভাজনের ঐতিহ্য তো আমাদের নয়। রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমরা বিশ্বনাগরিকতার পাঠ নিয়েছি, গাঁধীজির কাছ থেকে নিয়েছি সহনশীলতার পাঠ। এটা অত্যন্ত আশার কথা যে, আমাদের নতুন প্রজন্মের একটা বড় অংশ, বিশেষত আমাদের ছাত্রসমাজের সিংহভাগ, ধর্মীয় বিভাজন মেনে নেয়নি। ছাত্রদের ভূমিকা দেখে আমার মতো প্রবীণ শিক্ষকের গর্বে বুক ভরে ওঠে। 

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন