সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

এনপিআর নাগরিকের আস্থার দীর্ঘ ঐতিহ্য নষ্ট করতে চলেছে

জনগণনা কিন্তু জরুরি কাজ

Population
প্রতীকী ছবি

জনগণনার তথ্য সংগ্রহ কাজের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জির (এনপিআর) তথ্য সংগ্রহ করা যেন না হয়, সরকারকে এমনই অনুরোধ করেছেন ১৯০ জন অর্থনীতিবিদ। তাঁদের যুক্তি, জনগণনা (সেনসাস) থেকে প্রাপ্ত তথ্য একান্ত জরুরি। সেই তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ার উপর কোনও প্রতিকূল প্রভাব পড়তে দেওয়া চলবে না। অথচ এনপিআর নিয়ে যে ভয় তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়তেই পারে জনগণনায়। তা ছাড়া জনগণনার সঙ্গে সঙ্গে এনপিআর-এর কাজ চালালে তা জনগণনা আইনের ১৫ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে, যেখানে বলা হয়েছে যে জনগণনা-আধিকারিকদের সংগৃহীত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।  

এই আপত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণনা এবং এনপিআর, এ দুটোর কাজ একসঙ্গে করলে আইন যেমন লঙ্ঘিত হয়, তেমনই ভারতে জনগণনার যে দীর্ঘ ইতিহাস, যার ভিত্তিতে জনগণনার উপর মানুষের আস্থা গড়ে উঠেছে, তার ধারাও ব্যাহত হয়।

ভারতে জনগণনা শুরু হয় ১৮৭২ সালে। মাত্র দু’টি ব্যতিক্রম ছাড়া (অসমে ১৯৭১ সালে, এবং জম্মু ও কাশ্মীরে ১৯৯১ সালে) গোটা দেশে স্বচ্ছন্দ ভাবে হয়ে এসেছে গণনার কাজ। চিন যে হেতু নিয়মিত জনগণনা করে না, তাই ভারতের জনগণনাই হল বিশ্বে বৃহত্তম। নীতি তৈরি, প্রকল্প নির্মাণ ও রূপায়ণ, অর্থ বরাদ্দ, প্রচলিত প্রকল্পের সাফল্য বা ব্যর্থতার মূল্যায়ন, মানুষের জীবনযাত্রার মান নিরূপণ, এই সব কিছুর জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য মেলে জনগণনা থেকে। এই তথ্য এত প্রত্যয়ের সঙ্গে সরকার বা গবেষকেরা ব্যবহার করেন, তার কারণ দেশের মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত, এমনকি গোপনীয় তথ্যও জনগণনা-কর্মীদের জানাতে দ্বিধা করেন না। মানুষের এই সহযোগিতার ভিত্তিতেই দাঁড়িয়ে আছে ভারতের জনগণনার ঐতিহ্য ও সুনাম। জনগণনা আইন অনুসারে জনগণনা কর্মীর কাছে তথ্য না দিলে, বা ভুল তথ্য দিলে শাস্তিও হতে পারে। কিন্তু আজ অবধি আইন দেখানোর প্রয়োজন হয়নি। মানুষ স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করেছেন।

দেশবাসীর এমন আস্থার প্রধান কারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের আইনি সুরক্ষার আশ্বাস। জনগণনা আইনের ১১(খ) ধারা অনুসারে, কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকারের অনুমতি ব্যতিরেকে কোনও জনগণনা আধিকারিক কোনও ব্যক্তির তথ্য প্রকাশ করলে তাঁর শাস্তি হবে। এমনকি (১৫ নম্বর ধারা অনুসারে) সেই তথ্য সাক্ষ্য আইনের অধীনে আদালতে পেশ করাও যাবে না। ব্যক্তির সব তথ্য সুরক্ষিত থাকবে। পরবর্তী জনগণনার এক বছর আগে আধিকারিকদের সামনে সব নথি নষ্ট করে ফেলতে হবে। তথ্যের গোপনীয়তাকে এতটা গুরুত্ব দেওয়ার জন্যই জনগণনা এতটা মর্যাদা পেয়েছে। 

জনগণনার কয়েকটি বিশেষত্ব মনে রাখতে হবে। এক, তা নাগরিক এবং অ-নাগরিকের মধ্যে ভেদ করে না। একমাত্র শর্ত হল, কোনও ব্যক্তি গত ছ’মাস ভারতে রয়েছেন কি না, এবং আগামী ছ’মাস থাকবেন বলে মনে করছেন কি না। দুই, জনগণনা ব্যক্তির তথ্য ব্যবহার করে কেবলমাত্র সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝতে। তথ্য বিশ্লেষণের জনগণনার ফল সর্বনিম্ন পাওয়া যায় মৌজা বা গ্রামস্তর অবধি। অর্থাৎ একটি মৌজার সব মানুষের থেকে সংগৃহীত তথ্য থেকে মৌজার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শৌচ-নিকাশি, প্রভৃতি বোঝা যাবে। কোনও ব্যক্তি বা গৃহস্থালির নিজস্ব তথ্য কখনওই প্রকাশিত হবে না, ব্যবহৃত হবে না, কেন্দ্রের বা রাজ্যের সরকারের বিশেষ নির্দেশ ছাড়া। এবং লক্ষণীয়, আজ অবধি ব্যক্তিগত তথ্য নিষ্কাশন বা ব্যবহারের নির্দেশ কোনও সরকার কখনও দেয়নি।

ভারতে জনগণনা বরাবর দু’টি পর্যায়ে হয়। প্রথমটি গৃহস্থালি গণনা, দ্বিতীয়টি জনগণনা। গৃহস্থালি সমীক্ষায় বাড়ির সংখ্যা গণনা হয়, তার ছাদ-মেঝের উপাদান, ঘরের সংখ্যা, পানীয় জল ও শৌচাগারের অবস্থান, ইত্যাদি দেখা হয়। গৃহস্থালি সমীক্ষার দিনগুলি ঠিক করে রাজ্য সরকার। তার পরের বছর দ্বিতীয় পর্যায়ের জনগণনা করা হয়। এটি সারা দেশে একই সঙ্গে হয়, প্রতি বারই তার দিন থাকে ফেব্রুয়ারি ৯-২৮। এ বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালে গৃহস্থালি গণনা হবে। ব্যক্তির গণনার পর্যায়টি হবে ২০২১ সালে, অর্থাৎ আগামী বছর।

এত দিন নির্বিঘ্নে চলার পর, এ বারেই কেন জনগণনা প্রশ্নের মুখে পড়েছে? তা বুঝতে ফিরতে হবে ২০১০ সালে। সেই বছর গৃহস্থালি গণনার সঙ্গে সঙ্গে এনপিআর-এর একটি প্রশ্নের তালিকাও পূরণ করা হয়েছিল। সেখানে ছিল ব্যক্তির বিষয়ে কিছু প্রশ্ন। যেমন, নাম, বাবা-মায়ের নাম, বিবাহিত কি না, বর্তমান ঠিকানায় কত দিন রয়েছেন, জাতীয়তা, শিক্ষা, পেশা ইত্যাদি। কর্মীরা জানিয়েছিলেন যে এই তথ্যগুলি এনপিআর-এর অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

বিশ্বের অনেক দেশেই নাগরিক তালিকা তৈরি হয়, যা নিয়মিত নবীকরণ বা ‘আপডেট’ করা হয়। কিন্তু সে কাজটা সাধারণত জনগণনার সঙ্গে করা হয় না। এ নিয়ে ওয়াকিবহাল মহলে কিছু চিঠি চালাচালি হলেও, ২০১০ সালে এনপিআর নিয়ে সাধারণ মানুষ তেমন বিচলিত হননি। আজ বিতর্কের ঝড় উঠেছে, কারণ অসমের নিদর্শনের পর এখন মানুষ এনপিআর-কে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন। তাঁদের দুশ্চিন্তা অমূলক নয়। এ বছর এনপিআর প্রশ্নের তালিকায় আটটি বাড়তি প্রশ্ন যোগ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাবা-মায়ের জন্ম কোথায়, এবং জন্মের তারিখ। অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব স্থির করার কাজে এই তথ্য লাগানো যেতে পারে। জনগণনার সঙ্গে এনপিআর-এর প্রশ্ন একসঙ্গে করা হচ্ছে বলে জনগণনার উপরেও সন্দিগ্ধ হয়ে উঠছেন মানুষ। দীর্ঘ দিনের আস্থার ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

আপত্তি আরও আছে। এনপিআর যে তথ্য সংগ্রহ করে, তার সুরক্ষার জন্য কোনও আইন বা বিধি নেই। যে সরকারি নিয়মের অধীনে এনপিআর-এর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ২০১০ সালে, এবং এই বছরও করা হবে, সেই ‘সিটিজ়েনশিপ (রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজ়েনস অ্যান্ড ইসু অব ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ডস) রুলস’ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যকে সেই বাধ্যতামূলক সুরক্ষা দেয় না, যা দেয় জনগণনা আইন। যার ফলে এই তথ্য ব্যবহার করে নাগরিকের উপর নজরদারি করবে রাষ্ট্র, সেই আশঙ্কা থেকে যায়। কিছু নাগরিক সংস্থার দাবি, এনপিআর-এ সংগৃহীত ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার জন্য সংসদে পেশ-করা ‘ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন (২০১৯)’-এ বেশ কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন।

এত গুরুতর আশঙ্কার সামনে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য, এনপিআর কেন? নাগরিকের তালিকা বানাতে চাইলে সরকার প্যান কার্ড, ভোটার কার্ড, আধার কার্ডের তথ্য কাজে লাগাতে পারে। ২০০০ সালে রঙ্গরাজন কমিটি সব ভারতীয়ের জন্য নাগরিক পরিচয়পত্রের সুপারিশ করে, যাতে সরকারি প্রকল্প আরও কার্যকর হয়। সেই সুপারিশ অনুসারে তৎকালীন এনডিএ সরকার নাগরিকত্ব আইন সংশোধন (২০০৩) করে প্রতিটি নাগরিকের বাধ্যতামূলক নথিভুক্তির এবং পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা যোগ করে। তথ্য যাচাই করে সব ভারতীয় নাগরিকের নথিভুক্তির জন্যই আধার কার্ড দেওয়া হয়েছিল। অতএব আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, এই দাবি ইতিহাসের অপলাপ। ভোটার কার্ড দেওয়ার আগেও নাগরিকত্বের দাবি যাচাই করা হয়। আর কত পরীক্ষা দেবে নাগরিক?

সমস্যা অন্যত্র। জন্ম-মৃত্যুর নথিভুক্তিতে দুর্বলতার কারণেই আজ তিরিশোর্ধ্ব নাগরিকদের অধিকাংশ নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখাতে পারেন না। অতএব রাষ্ট্রের কর্তব্য, দেশের সর্বত্র একশো শতাংশ জন্ম-মৃত্যুর নথিভুক্তি নিশ্চিত করা, এবং তার ভিত্তিতে বর্তমান এনপিআর নিয়মিত ‘আপডেট’ করা। নতুন নতুন প্রশ্ন তৈরি, বার বার সমীক্ষা প্রয়োজন নেই বলে মনে হয়।

এনপিআর-এর লাভ স্পষ্ট নয়, অথচ জনগণনার সঙ্গে তার কাজ চালালে কত ক্ষতি হতে পারে, তা বোঝা যাচ্ছে। তাই জনগণনা থেকে জনসংখ্যা পঞ্জিকে বিযুক্ত করাই সমীচীন।

 

অবসরপ্রাপ্ত আইএএস, পশ্চিমবঙ্গ জনগণনার অধিকর্তা (২০০১)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন