সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

মোবাইলের গেম নয়, আগ্রহ বাড়ুক কমিক্সে

শিশু-কিশোরদের মোবাইল গেম বা অযথা ইন্টারনেট ব্যবহারের আসক্তি থেকে বের করে এনে কমিক্স পড়ার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে লাইব্রেরির মতো প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যালয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। লিখছেন আশুতোষ ঘোষাল।

TINTIN
কমিক্স চরিত্রের নক্ষত্র টিনটিন। ছবি সৌজন্য আনন্দমেলা

Advertisement

ছেলেবেলায় কমিক্স বই-এর সঙ্গে আমাদের একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল। যে যার টিফিনের পয়সা জমিয়ে, টিফিনের সময় এর কাছে ওর কাছে ধার করে খেয়েও কমিক্স বই কেনার কথা আজও সতীর্থদের সঙ্গে আলোচনায়, আড্ডায় উঠে আসে। আদান প্রদানের মাধ্যমে তো বটেই অনেক সময় বই-এর দোকানে দাঁড়িয়েও গোগ্রাসে গিলেছি অনেক কমিক্স। নারায়ণ দেবনাথের ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ‘হাঁদাভোঁদা’ থেকে শুরু করে হর্জের টিনটিন কোনও কিছুই বাদ যায়নি। কমিক্স বই পড়া আমাদের সময় একটা নেশার পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পড়ার বই-এর নিচে ‘নন্টে ফন্টের কান্ডকারখানা’ রেখেও আমরা তখন এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলতাম, পাছে বড়রা কেউ দেখতে পেয়ে বকাবকি করেন কেন পড়াশোনার সময় কমিক্স পড়ছি বলে। 

কমিক্স বই যার এখন একটি সুন্দর নাম দেওয়া হয়েছে ‘গ্রাফিক নভেল’। এর ইতিহাস আলোচনায় প্রথম দিকের যে কয়েকজনের নাম উঠে আসে তার মধ্যে প্রতুলচন্দ্র লাহিড়ী অন্যতম। তিনি ‘যুগান্তর’ কাগজের জন্য ‘শেয়াল পন্ডিত’ নামে একটি ছবিতে-গল্প বা কমিক্স লিখতেন। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা নিয়ে প্রকাশিত বিমল ঘোষের ‘রবিছবি’ ১৯৬১ সালে আত্মপ্রকাশ করে। তবে বাংলা তথা ভারতীয় কমিক্সের দুনিয়ার সম্রাট বলতে যাঁকে বোঝানো হয় তিনি আমাদের সকলের প্রিয় ‘বাঁটুল দা’র স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথ। তাঁর তৈরি কমিক্স চরিত্রের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। ‘হাঁদাভোঁদা’ (১৯৬২), ‘বাঁটুল দি গ্রেট’ (১৯৬৫), ‘নন্টেফন্টের কান্ডকারখানা’ (১৯৬৯), ‘বাহাদুর বেড়াল’ (১৯৮৩), ‘ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু’ (১৯৮৩) আরও কত কি! নারায়ণ দেবনাথের বাঁটুল চরিত্রটিকে অনেকেই ভারতীয় কমিক্স দুনিয়ার প্রথম সুপার হিরো বলে থাকেন। বাঁটুলকে আমরা দেখতে পাই ১৯৬৫ সালের ‘শুকতারা’ পত্রিকায় মে-জুন সংখ্যায় লাল-কালো রঙে। এই সময় বাংলাদেশে চলছিল মুক্তিযুদ্ধ। নন্টে-ফন্টের আগমন হয় ১৯৬৯ সালে ‘পত্রভারতী’ প্রকাশিত ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকায়। নারায়ণ দেবনাথের প্রত্যেকটি কমিক্স চরিত্রের মধ্যে এক অনন্য এবং অনাবিল হাস্যরসের সন্ধান মেলে যা সব বয়সের পাঠক-পাঠিকাদের কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। তিনি ভারতবর্ষের প্রথম কমিক্স চরিত্র রচয়িতা, যাঁকে ডি লিট্ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ভারতীয় কমিক্স ঐতিহ্যকে শীর্ষ স্থানে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নারায়ণ দেবনাথের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই সময় যদি খেয়াল করা হয়, দেখতে পাওয়া যায়  শিশুসাহিত্য ও কিশোর সাহিত্য নিয়ে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছিল ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকায়। বাংলা কমিক্সের এই ধারাটির সঙ্গে সঙ্গে বিদেশী কমিক্সও ভারতবর্ষ তথা বাংলার শিশু-কিশোরদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। সত্তোর-এর দশকের শেষের দিকে ‘আনন্দমেলা’র আগমনের সময়ও এই ধারা অব্যাহত ছিল। ১৯৭৫ সালে ‘আনন্দমেলা’ অনুমতি পায় হর্জের লেখা তরুণ বেলজিয়ান সাংবাদিক টিনটিনের দুঃসাহসিক অভিযানগুলিকে বাংলায় প্রকাশের জন্য। টিনটিন ও তার কথা-বলিয়ে কুকুর কুট্টুসের দুর্দান্ত কমিক্স কাহিনীগুলি অনুদিত হয় বাংলা এবং অন্যান্য ভারতীয় ভাষায়। ভারতীয় ভাষা হিসেবে প্রথম অনুবাদটি হয় বাংলা ভাষায়, যার অনুবাদক ছিলেন ভাষা বিশেষজ্ঞ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। এর প্রায় দশ বছর পর ২০১০ সালে ‘টিনটিন’ কমিক্সের হিন্দিতে অনুবাদ হয়। কিছুদিনের মধ্যেই জনপ্রিয়তায় টিনটিন, কুট্টুস, ক্যাপ্টেন হ্যাডক, প্রফেসর ক্যালকুলাস সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছয়। ভারতবর্ষে টিনটিনের এই সাফল্য লক্ষ্য করে তার সৃষ্টিকর্তা হার্জ বলেছিলেন, ‘‘I receive....a lot of mail from India. Here in the office, are two letters from Calcutta. Now what can there be common between a boy in Calcutta and myself” (Herge`). এছাড়াও ইউদেরজো এবং গোসিনির বিখ্যাত কমিক্স চরিত্র অ্যাসটেরিক্সের গল্পও বাংলায় অনুদিত হয়ে প্রকাশ হতে থাকে ‘আনন্দমেলায়’। সাহসী বীর গলযোদ্ধা অ্যাসটেরিক্স এবং তার অভিন্ন-হৃদয় সঙ্গী ওবেলিক্স শিশু-কিশোরদের স্বপ্নের রাজ্যে নিয়ে যায়। 

এই ক্রমশ-পাঠ্য কমিক্সগুলি বই আকারেও প্রকাশিত হয় ‘আনন্দ’ পাবলিশার্স থেকে। এছাড়াও লি ফকের ‘ফ্যান্টম’ বাংলায় এসে হয়ে যায় অরণ্যদেব যিনি বাস করেন খুলি-গুহায়। অরণ্যদেব ও যাদুকর ম্যানড্রেকের গল্পগুলি প্রাত্যহিক সংবাদপত্রে পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হয়। বিদেশী এই কমিক্সগুলির পাশাপাশি প্রাণের লেখা ‘চাচা চৌধুরী ও সাবু’র কমিক্সগুলিও বেশ মনোরঞ্জক ভূমিকা নিয়েছিল। ‘চাচা চৌধুরীর মগজ কম্পিউটারের থেকেও প্রখর’ এই শব্দবন্ধটি শিশুদের অবচেতনে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিল যে বুদ্ধি প্রয়োগ করে পৃথিবীর যে কোনও সমস্যার সমাধান করা যায়।

এখন মোবাইল ফোনের দৌরাত্ম্যে বাচ্চাদের জীবন থেকে কল্যাণকর অনেককিছুর পাশাপাশি কমিক্স পড়ার আগ্রহও হারিয়ে গিয়েছে। মুদ্রিত হরফ আর ছবির বদলে এখন কমিক্সগুলির ওয়েব এডিশন পাওয়া যায়, যা আগে কল্পনাতীত ছিল। তা সত্ত্বেও এর প্রতি আগ্রহী পাঠক-পাঠিকারা সংখ্যা অনেক কম। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ইউনেস্কো এবং Banglanatak.com-এর মিলিত উদ্যোগে বাংলার লোকশিল্প ও লোকনৃত্যের ঐতিহ্যকে শিশু-কিশোর তথা সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনটি গ্রাফিক নভেল আত্মপ্রকাশ করেছে। পুরুলিয়ার ছৌ-নৃত্য নিয়ে ‘দেখে এলাম ছৌ’ (এক্সপেরিয়েন্সিং ছৌ), দক্ষিণবঙ্গের রায়বেঁশে লোকনৃত্য নিয়ে ‘আজও আছে রায়বেঁশে’ (রায়বেঁশে রকস্‌) এবং নদীয়ার লুপ্তপ্রায় পুতুল নাচ নিয়ে ‘হারানো পায়ের কিসসা’ (দ্য টেল অফ এ লস্ট লেগ) বাংলা ও ইংরেজি দুটি ভাষাতেই প্রকাশিত হয়েছে। এই বইগুলি মেলা অথবা অন্যান্য শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিক্স আকারে লেখা বইগুলির আবেদন নিঃসন্দেহে সাধারণভাবে লেখা বই-এর থেকে অনেক বেশি। লেখক রঞ্জন সেন এ বিষয়ে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী যে বইগুলি তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যাবে। এরপর রাজ্যের আরও ১৫টি লোকশিল্পের উপর এই রকম বই বের করা হবে।

পরিশেষে বলা যায় শিশু-কিশোরদের মোবাইল গেম বা অযথা ইন্টারনেট ব্যবহারের আসক্তি থেকে বের করে এনে কমিক্স পড়ার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে লাইব্রেরির মতো প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যালয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ছোটদের পাঠ্য বিষয়েও যাতে কিছু কমিক্স রাখা যায় তার উদ্যোগ নেওয়াও বাঞ্ছনীয়। অনেক কমিক্স এখন অ্যানিমেশন ভিডিওতেও বেরিয়েছে। বাচ্চাদের সেগুলি মাঝেমাঝে প্রদর্শন করালেও কমিক্স-এর অফুরন্ত সম্ভারের সঙ্গে তারা পরিচিত হবে।

 

(লেখক চিনপাই উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মতামত নিজস্ব)

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন