Advertisement
E-Paper

সাবধান

সাম্প্রদায়িক সংঘাত বস্তুটি স্বয়ম্ভূ নহে। তাহা নির্মিত হয়। অতি সুকৌশলে, হিসাবি পদক্ষেপে। হাওড়ার প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই নির্মাণের প্রক্রিয়াটিকে নির্ভুল ধরিয়াছেন।

শেষ আপডেট: ১৫ মে ২০১৭ ০০:৫২

সাম্প্রদায়িক সংঘাত বস্তুটি স্বয়ম্ভূ নহে। তাহা নির্মিত হয়। অতি সুকৌশলে, হিসাবি পদক্ষেপে। হাওড়ার প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই নির্মাণের প্রক্রিয়াটিকে নির্ভুল ধরিয়াছেন। কোনও একটি স্থানীয়, খুচরা বিরোধকে ক্রমে ধর্মীয় বিভাজনের অক্ষে স্থাপন করা হয়। বিরোধটিকে সাম্প্রদায়িক রঙে এক বার রাঙাইয়া দিতে পারিলে তাহা নিজের গতিতে চলিতে থাকে, ছড়াইতে থাকে, তীব্রতর হইতে থাকে। অতএব, সাম্প্রদায়িক সংঘাত ঠেকা ইতে হইলে গোড়ায় সক্রিয় হওয়া বিধেয়। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে কথাগুলি আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করিলে যাহাদের লাভ, তাহারা এখন রাজ্যে শক্তি বাড়াইতে মরিয়া। মুখ্যমন্ত্রী পুলিশ-প্রশাসনকে তিরস্কার করিয়া বলিয়াছেন, তাহাদের ব্যর্থতাতেই ধূলাগড়ের ন্যায় ঘটনা ঘটে। কোনও অভিযোগ পাইলে পুলিশ গোড়ায় গা করে না, প্রশাসনের নিকট অঞ্চলের তথ্য নাই। ফলে, কে কোথায় জল ঘোলা করিতেছে, কে সাম্প্রদায়িক বারুদের স্তূপে অগ্নিসংযোগে ব্যস্ত, পুলিশ-প্রশাসন জানিতেই পারে না।

মুখ্যমন্ত্রীর তিরস্কারের যাথার্থ্য প্রশ্নাতীত। কিন্তু, কেন পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকে? প্রশাসনের নিকট কেন খবর থাকে না? এই প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনিকতায় নাই, রাজনীতিতে আছে। পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকে, কারণ কোন সক্রিয়তায় কেন দেবতা অসন্তুষ্ট হইবেন, তাহা আঁচ করা দুষ্কর। অথবা, পুলিশ জানে, যে কোনও সক্রিয়তা, যে কোনও পদক্ষেপই কাহাকে না কাহাকে চটাইবে। বিডিওরা জানেন, বেশি খবর রাখিতে গেলেই বিপদ। মুখ্যমন্ত্রী হয়তো বুঝিতেছেন, একাধিপত্য প্রতিষ্ঠান আগ্রাসী উত্তেজনায় প্রশাসনকে দলের পরবর্ধিত শাখায় পরিণত করিবার কাজটি ঠিক হয় নাই। এই রাজ্যের পুলিশ তাহার দায়িত্ব নির্বাহ করিতে ভুলিয়াছে। শাসক দলের মন রাখিয়া চলাই তাহার একমাত্র কাজ। এবং, শুধু বড় মাপের নেতাদেরই নহে, নন্তু-সন্তুদের মন না রাখিলেও মুশকিল। রাজ্য রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার যে চোরা স্রোত বহিতেছে, তাহার প্রকৃত তাৎপর্য এবং সেই স্রোতকে ঠেকাইবার আবশ্যকতা মুখ্যমন্ত্রী যতখানি অনুধাবন করিবেন, খুচরা নেতাদের পক্ষে ততখানি না করিতে পারাই স্বাভাবিক। তাঁহাদের নিকট সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির গুরুত্ব অধিকতর। প্রশাসনের এক্তিয়ার যদি সেই ক্ষুদ্র স্বার্থের পাটিগণিতে নির্ধারিত হয়, তবে বৃহত্তর লক্ষ্য পূরণ না হওয়ারই কথা। মুখ্যমন্ত্রী তাঁহার দলীয় নেতা, বিধায়কদেরও তিরস্কার করিয়াছেন। কিন্তু, প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করিবার কু-অভ্যাসটির শিকড় এতই গভীরে চলিয়া গিয়াছে যে আশঙ্কা হয়, এক দিনের তিরস্কারে অভ্যাস বদলাইবার নহে।

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সাম্প্রদায়িক গুজব আক্ষরিক অর্থেই বিদ্যুতের গতি পাইয়াছে। পশ্চিমবঙ্গবাসী অভিজ্ঞতায় জানেন, গত কয়েক মাসে বিদ্বেষমূলক মেসেজের সংখ্যা কী পরিমাণে বাড়িয়াছে। গুজবকে বিশ্বাসযোগ্য করিয়া তুলিতে হইলে তাহাকে সংবাদের ছদ্মবেশ পরাইতে হয়। ক্রমে প্রকাশ পাইতেছে, ভিন্‌ রাজ্যের, অতীতের বহু ছবি ব্যবহার করিয়া রাজ্যের পরিস্থিতি সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার চালানো হইয়াছিল। ইহা মারাত্মক অপরাধ। কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণই কর্তব্য। কিন্তু, একেবারে কোনও ভিত্তি না থাকিলে গুজব ছড়ায় না। স্থানীয় বিবাদকে উস্কানি দিয়া তাহাকে সাম্প্রদায়িক সংঘাতে পরিণত করিয়া ফেলিতে পারিলে সেই ভিত্তির সংস্থান হয়। এবং, তাহাকে কেন্দ্র করিয়াই জমিয়া উঠে গুজবের বেসাতি— পরবর্তী বৃহত্তর বিদ্বেষের পথ সুগম হইতে থাকে। এই কারণেই ছোট ঘটনাকে গোড়াতেই সামলাইয়া ফেলা জরুরি। মুখ্যমন্ত্রীর তিরস্কারে যদি প্রশাসনের হুঁশ ফিরে, নেত্রীর পক্ষে যদি মেজো-সেজো নেতাদের সামলানো সম্ভব হয়, একমাত্র তবেই পশ্চিমবঙ্গ এই বিদ্বেষের আগুন হইতে বাঁচিবে।

Communal conflict self-contained
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy