• দেবাশিস ভট্টাচার্য
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

আঁধার ঘুচল কি

‘পাশে আছি’ বোঝাতে গেলে সংবেদনশীলতা জরুরি

Mamata Banerjee

একই দিনে কথা বললেন তাঁরা দু’জনেই। সকালে জাতির উদ্দেশে দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিকেলে সাংবাদিকদের সামনে  বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। ঘুম থেকে উঠেই দেশ জানতে পারল, থালা বাজানোর পরের ধাপে দেশবাসীকে আঁধার ঘরে প্রদীপ জ্বেলে করোনা-যুদ্ধে সামিল হতে বলছেন নরেন্দ্র মোদী।

সেই বিকেলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য হাতে তালিকা নিয়ে বসেছিলেন। তাঁর বলার ছিল, করোনা-মোকাবিলায় রাজ্য এখন পর্যন্ত কী কী করতে পেরেছে এবং আরও কী কী করার বাকি। বলেছেন, কত পরিমাণ কোন কোন সরঞ্জাম সরকারের হাতে এসেছে, আরও কত আসবে। সবটাই কাজের খতিয়ান।

যদি মনে হয়, মোদীর সঙ্গে মমতার তুলনা টানার জন্য এ সব বলা, তা হলে সেটা অতিসরলীকরণ হবে। আবার তুলনা না-আসাটাও কঠিন। কারণ মাসাধিক কালের এই লড়াইয়ের অভিজ্ঞতায় মানুষ ইতিমধ্যে বেশ বুঝে গিয়েছেন দু’জনের ফারাকটা কোথায়! দেশের প্রধানমন্ত্রী চমকদার বাণী ও চটকদার আনুষ্ঠানিকতায় এবং এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হাতেকলমে  কাজে বেশি আস্থাবান। এটা তাই নতুন করে বিশদ বলার প্রয়োজন নেই।

থালা বাজানোর মতোই দিয়া জ্বালানোর জাতীয় কর্মসূচিও কতটা হুল্লোড়ময় উৎসবের আকার নিয়েছিল এবং তাতে করোনা-আতঙ্ক বাড়ল না কমল, সেই আলোচনা না-হয় তোলা থাক। শুধু দু’-একটি প্রশ্ন করতেই হবে। মোদী-রবে সাড়া দিতে  আমাদের চারপাশের যে ছবি দেখা গেল, সেটা কিসের উল্লাস? ঘরবন্দি দেশকে অকাল-দিওয়ালিতে মাতিয়ে যা হল, তা কি প্রকৃতই ‘সংহতি’ প্রদর্শন, না নিছক হুজুগে মাতা বা কোনও নির্মম রসিকতা? যাঁরা বাজারে ভিড় হওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছেন, চায়ের দোকানে আড্ডার বিরুদ্ধে সঙ্গত ভাবেই আপত্তি জানাচ্ছেন, পাড়ায় পাড়ায় বাজি-পটকার এই উদ্দাম  প্রদর্শনীতে তাঁরাও কি খুশি হতে পারলেন? অবশ্যই এই তালিকায় দিলীপ ঘোষদের মতো কতিপয় হতবুদ্ধিকে ধরছি না। তবে সুবুদ্ধি বলে, যা হল, তাতে দিয়া জ্বললেও আঁধার ঘুচল না।       

সঙ্কটকালে মানুষের  পাশে থাকার বিশ্বাসযোগ্য বার্তা দিতে পারা দলমত নির্বিশেষে নেতৃত্বের একটি আবশ্যিক গুণ। তবে তার জন্য সাহস এবং আবেগ দুটোই দরকার। আর চাই সংবেদনশীল, সহানুভূতিপ্রবণ মন। মানুষ সেই স্পর্শটুকু বুঝতে না পারলে বিষয়টি অনেক সময় নিরর্থক প্রচেষ্টা বা চাপিয়ে দেওয়ার মতো মনে হতে পারে।  

যেমন মোদীর এক একটি আহ্বান ঘিরে জনমানসের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। বিপুল সমর্থনের জোরে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। জাতির উদ্দেশে তাঁর মতো পদাধিকারী কিছু বললে তার গুরুত্ব ও মান্যতা ওজনদার হওয়া উচিত। বিশেষ করে, এখন এই সঙ্কটকালে দেশের কর্ণধারের দিকে সবাই তাকিয়ে থাকবেন, তাঁর সুবিবেচনা ও প্রসারিত সক্রিয়তা দেখে মনে ভরসা পাবেন, এমনটাই কাম্য।

অথচ সত্যি বললে, করোনা-পর্বে জনগণের জন্য মোদীর একের পর এক কর্মসূচি ঘোষণা যেন এক জাতীয় রসিকতা হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে চোখ রাখলেও সেটা বোঝা যায়। বিরাট সংখ্যক দেশবাসী মনে করেন, লকডাউনের সিদ্ধান্ত বাদ দিলে তাঁর ঘোষিত এক একটি চমকে আর যা-ই হোক, করোনা-মোকাবিলায় কাজের কাজ হয় না। বরং হিতে বিপরীত হওয়ার পথ খুলে দেয়। জনমনে এক জন প্রধানমন্ত্রীর এ হেন ভাবমূর্তি স্বস্তিকর হতে পারে না। একে হতাশাব্যঞ্জক বলতে হয়!

এই রাজ্যে মমতার করোনা-সংগ্রাম কিন্তু মোটের উপর তাঁর সমালোচকদেরও সাধুবাদ পাচ্ছে। তিনি নিজেও দাবি করেছেন, বাংলা এ ক্ষেত্রে মডেল। বস্তুত অন্য অনেকের থেকে এগিয়ে গিয়ে মমতা এখানে চিকিৎসা-সুরক্ষা, সামাজিক-সুরক্ষা, আর্থিক-সুরক্ষার মতো জরুরি ক্ষেত্রগুলিতে যে সব পদক্ষেপ করেছেন, তাতে সর্বস্তরের মানুষের কিছু না কিছু বাড়তি সহায়তা মিলতে পারে। বড় প্রেক্ষিতে দেখলে আগামী নির্বাচনে এটা তাঁর স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠবে বলেও ধরে নেওয়া যায়। সেটা সম্যক বোঝা যাবে সময় এলে।

তবে সে সব ভোটের রাজনীতি। এখন সেই চর্চার সময় নয়। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই বিপদ-ক্ষণে দেশের দায়িত্বশীল ও ক্ষমতাশালীদের সংবেদনশীলতারও একটা সমান্তরাল পরীক্ষা অবশ্যই হয়ে যাচ্ছে। কেউ চান বা না-চান, মুখ ফুটে স্বীকার করুন, বা না-করুন, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সেখানে দাগ কেটেছেন। 

তাঁর আবেগ, তাঁর সংবেদনা মমতাকে হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে নিয়ে গিয়েছে। দিবারাত্রি কাজ করে চলা পুলিশবাহিনীর কাছেও সশরীর পৌঁছে গিয়েছেন তিনি। সরেজমিন ঘুরেছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পাইকারি ও খুচরো বাজার।  ক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি পালন সুষ্ঠু করতে নিজের হাতে খড়ির গণ্ডি এঁকে দিয়ছেন পথের উপর। 

কেউ কেউ এ সবের পিছনে রাজনীতি দেখেছেন। কেউ কেউ বলেছেন ‘অতিনাটক!’ বলার অধিকার যার যার নিজস্ব। তবে যাঁদের নিয়ে নেতাদের বারো মাসের রাজনীতি, আজ এমন সর্বব্যাপী সঙ্কটের দিনে সেই মানুষদের পাশে সরাসরি দাঁড়াতে পারার এই মানসিকতা কি বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থালা বাজানো অথবা রাস্তায় আতসবাজি পুড়িয়ে সংহতি প্রকাশের চেয়ে কোনও অংশে কম কার্যকর? আজ সেই আত্মসমীক্ষারও সময় এসেছে। 

আসলে অসময়ে নিজে ছুটে যাওয়ার এই স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ খুব বেশি সংখ্যক নেতার মধ্যে দেখা যায় না। মমতা, হয়তো নিম্নবিত্তের পরিসর থেকে উঠে এসেছেন বলেই, এটা তাঁর কর্তব্যের মধ্যে ধরেন। আজ নয়, বরাবর। এ জন্য বহু ঝুঁকিও তাঁকে নিতে হয়।  

মনে আছে, বাবরি-কাণ্ডের পরে দেশের ভীষণ পরিস্থিতির কথা। কলকাতাও ফুটছে। কার্ফু, সেনাটহল চলছে শহরে। রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার। মমতা তখন কংগ্রেসের সাংসদ। (কয়েক দিন আগে দিল্লিতে মন্ত্রিপদে ইস্তফাপত্র জমা দিয়ে এসেছেন।) কালীঘাটের বাড়িতে ঘন ঘন নানা রকম ফোন আসছে তাঁর কাছে। কোনও অভিযোগ পেলেই লালবাজারে জানাতে চেষ্টা করছেন সে কথা। কখনও পুলিশ তাঁর ফোন ধরে, কখনও ধরে না। 

তার পরে নিজেই বেরিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী। সাহস, আবেগ এবং দুর্গতদের প্রতি সহানুভূতি সম্বল করে এক দলীয় সতীর্থের (তিনিও এখন তৃণমূলে) ক্লাবের অ্যাম্বুল্যান্সে কিছু চাল-ডাল, শাড়ি, জামা তুলে নিয়ে ঘুরতে লাগলেন একের পর এক বস্তি এলাকায়। অধিকাংশই সংখ্যালঘু অঞ্চল। পুলিশ-মিলিটারি মাঝে মাঝে পথ আটকায়। মমতা নিজের পরিচয় দিতে দিতে এগিয়ে চলেন। এক দিন এ ভাবেই ধোবিতলায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যায় মাদার টেরিজার। 

আজকের প্রেক্ষিতে সে দিনের ঘটনাটি কিছুটা প্রাসঙ্গিক। আজ থালা বাজানো-বাজি পোড়ানোর ধূমে মুখ্যমন্ত্রী মমতার পথে নামাকে যাঁরা ক্ষমতাসীনের ‘কুশলী চাল’ বলে কটাক্ষ করতে ব্যস্ত, তাঁরা ভেবে দেখুন, ১৯৯২-এর মমতা কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে নাম লেখাননি। এমনকি, বিরোধী দলের পূর্ণ কর্তৃত্বও তাঁর হাতে ছিল না। তিনি তখন যুব কংগ্রেসে। তবে যে কোনও বিপর্যস্ত সময়ে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা মমতা তখনও বুঝতেন, এখনও বোঝেন। এটা সঙ্ঘ, পাঠশালা বা রাজনীতির স্কুলে শিখিয়ে করানো যায় না। ভিতর থেকে তৈরি হয়।

তবে আজ প্রশাসক হিসাবে মমতাকে আর একটি বিষয় যুক্তি দিয়ে বুঝতে হবে। যে রোগে বিশ্ব ত্রস্ত, ভারত কম্পমান, তাতে বাংলায় মৃত ও আক্রান্তদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় বা বিবাদ কিছুই বাঞ্ছনীয় নয়। করোনা-যুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীর দীর্ঘ নিরলস প্রচেষ্টা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। নানাবিধ বাস্তব কারণে রোগের প্রকোপ বাড়া-কমা কিছুই কারও হাতে নেই।

তাই সারা দেশের নিরিখে এই রাজ্যে এখন পর্যন্ত করোনায় মৃত্যু তিন বা ছয়-সাত যেটাই সাব্যস্ত হোক, তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। শেষ পর্যন্ত যা জেগে থাকে, তা হল প্রশাসনের শীর্ষে বসা ব্যক্তিটির মমতাময়ী ভূমিকা।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন