সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

এ মোহ আবরণ

Candles

শেষ অবধি বিপদ ঘটে নাই। প্রধানমন্ত্রীর মনোবাঞ্ছা পূরণ করিয়া দেশের বহু মানুষ রবিবার রাত্রি নয়টায় আলো নিভাইয়া প্রদীপ জ্বালিলেন, কিন্তু ইলেকট্রিক গ্রিডগুলি সেই ধাক্কা সামলাইয়া লইয়াছে। অনায়াসে নহে। দেশব্যাপী বিদ্যুৎ সংস্থার ইঞ্জিনিয়রদের রাতের ঘুম ছুটিয়া গিয়াছিল। মাহেন্দ্রক্ষণে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রী স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনাল পাওয়ার মনিটরিং সেন্টারে। নিশ্চয় অকারণে নহে। গোটা দেশ যখন একটি অভূতপূর্ব সঙ্কটের বিরুদ্ধে লড়িতেছে, এবং নাজেহাল হইতেছে, তখন সাধিয়া এমন বিচিত্র উদ্বেগ তৈরি করা কেন? ভক্তরা আপত্তি করিয়া বলিবেন, বিপদ যখন ঘটে নাই তখন আর কথা বাড়াইবার প্রয়োজন কী? বিপদ ঘটে নাই, তাহা দেশের সৌভাগ্য। কিন্তু এ হেন অপরিণামদর্শিতা অব্যাহত থাকিলে ভবিষ্যতেও বিপদ ঘটিবে না, সেই নিশ্চয়তা নাই। অতএব, নূতন নাটকের অবতারণা করিবার পূর্বে প্রধানমন্ত্রী অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করিবেন, এমন একটি দুরাশাকে বাঁচাইয়া রাখিতেই বর্তমান ভুলটির কথা বারে বারে স্মরণ করাইয়া দেওয়া প্রয়োজন। তাঁহাকে মনে করাইয়া দেওয়া প্রয়োজন যে তিনি দেশের সর্বোচ্চ অভিভাবক, তাঁহার প্রতিটি কথার গুরুত্ব অসীম। কথা বলিবার পূর্বে ভাবিবার অভ্যাস তাঁহাকে শিখিতে হইবে। 

যেমন, তাঁহার ভাবা উচিত ছিল যে, প্রদীপ জ্বালিবার তুলনায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বহু কাজ তাঁহার অপেক্ষায় আছে। যে অসংখ্য অভিবাসী শ্রমিক লকডাউনের ধাক্কায় বিপর্যস্ত, তাঁহাদের কী হইবে, প্রধানমন্ত্রী এখনও জানান নাই। আর্থিক প্যাকেজের ঘোষিত কুমিরছানাটি যে দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাইতে পারিবে না, সেই কথাটি যখন ক্রমে স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে, তখন অর্থনীতির উদ্বেগ লইয়াও প্রধানমন্ত্রীর ‘মন কি বাত’ জানা যায় নাই। চিকিৎসকদের জন্য যথেষ্টসংখ্যক পিপিই-র ব্যবস্থা কবে হইবে; মাঠে ফসল কাটিবার জন্য শ্রমিকের ব্যবস্থা হইবে কী উপায়ে; লকডাউনে যাঁহাদের রুজিরুটি বন্ধ, তাঁহাদের কী গতি হইবে— প্রধানমন্ত্রীর নিকট দেশের অনেক কথাই জানিবার ছিল। তিনি প্রদীপ জ্বালাইতে বলিয়াছেন। অস্বীকার করা চলে না, প্রধানমন্ত্রী দৃশ্য রচনা করিতে ভালবাসেন। চোখ ধাঁধাইয়া দেওয়া দৃশ্য। দেশ জুড়িয়া ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বলিতেছে, ইহার মধ্যে তেমন দৃশ্যের সম্ভাবনাটি এতই তীব্র যে প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত তাহার মোহ কাটাইতে পারেন নাই। ফলে, তিনি নিজের পদের দায়িত্ব ভুলিয়া, সময়ের দাবি ভুলিয়া সেই দৃশ্যের হাতে নিজেকে, এবং দেশকে, সঁপিয়া দিয়াছেন। হয়তো ভাবিয়াছেন, হাইওয়ে ধরিয়া মাইলের পর মাইল হাঁটিয়া মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাইতে চাহিতেছে, এই দৃশ্যটি প্রদীপের নীচের অন্ধকারে চাপা পড়িয়া যাইবে।

মধ্যবিত্ত, শহুরে ভারত অবশ্য জানাইয়া দিয়াছে, প্রধানমন্ত্রী সেই ভারতের নাড়ির গতিটি মোক্ষম ধরিয়াছেন। শহুরে ভারত বাজি পুড়াইয়া, বোমা ফাটাইয়া অকাল-দীপাবলি পালন করিল; সঙ্গে ধ্বনি তুলিল, ‘ভারতমাতা কি জয়’। সত্যই যদি ভারতমাতা থাকেন, তবে এই আলোক-বিস্ফোরণে তাঁহার অন্তরাত্মা দীর্ণ হইবার কথা। যেখানে দেশের সিংহভাগ মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন; যেখানে শতাধিক ব্যক্তি করোনা-সংক্রমণে মারা গিয়াছেন, আরও বহু সহস্র হাসপাতালে ভর্তি; যেখানে অনিশ্চয়তার ছায়া প্রতি দিন দীর্ঘতর হইতেছে— সেখানে এই আনন্দ-উদ্‌যাপনের অশালীনতায় ভারতমাতার অসহ্য অপমান। কারণ, যে ভারতীয়রা চরম বিপন্ন, তাঁহারা ভারতমাতারই সন্তান। কিন্তু ইহাই মোদীর ভারত— এই সমাজ তাহার নেতাদের পথ অনুসারে আত্মমোহ এবং আত্মমগ্নতাকে নিজেদের জপমন্ত্র হিসাবে মানিয়াছে। মোদী এই ভারতকে বিলক্ষণ চিনেন।  জানেন, এই অখণ্ড স্বার্থপরতায় নিজের উৎসবের অবকাশ আছে, অন্যের জন্য শোকের ঠাঁই নাই।  দীপাবলির ডাক তিনি অকারণ দেন নাই। 

(অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিয়ো আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, feedback@abpdigital.in ঠিকানায়। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেনআপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন