E-Paper

আড়ালে থাকা শিল্পী-মন

বিনয়িনীর আনন্দে ভরপুর ছেলেবেলা, পিতার আদর, পিতা গুণেন্দ্রনাথের আকস্মিক মৃত্যুর পর মায়ের কঠোর অকালবৈধব্য পালন, বিবাহ, স্বামী-শ্বশুরবাড়ির প্রসঙ্গ, স্বামীর মৃত্যু, শান্তিনিকেতনে মেয়ে প্রতিমাদেবীর আতিথ্য গ্রহণ— এই স্মৃতিকথায় ঠাঁই পেয়েছে।

শম্পা ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ ০৭:৩৬

জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারে পাঁচ নম্বর বাড়িতে জন্মেছিলেন বিনয়িনী দেবী। তিনি গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোন, চিত্রশিল্পী। বোন সুনয়নীও প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী। বিনয়িনীর অনেক গুণ। তিনি শিল্পের প্রকৃত সমঝদার। দক্ষ অভিনেত্রী। ঠাকুরবাড়িতে রত্নাবলী নাটকে রাজার ভূমিকায় অভিনয়ের সময় তাঁর গোঁফ এঁকে দিয়েছিলেন স্বয়ং অবনীন্দ্রনাথ। মেয়েদের ঘরোয়া অভিনয়ে বিনয়িনী অংশগ্রহণ করেছেন। এ-হেন গুণী মানুষটি সারা জীবন থেকেছেন আড়ালে। তাঁর সংসারজীবনে নিত্যকর্মেও শোভন রুচির স্পর্শ থাকত। প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সে পৌঁছে লিখেছেন স্মৃতিকথা, কাহিনী। রবীন্দ্রনাথ জীবনস্মৃতি-র ভূমিকায় লিখেছিলেন, “জীবনের স্মৃতি জীবনের ইতিহাস নহে। তাহা কোন্‌ এক অদৃশ্য চিত্রকরের স্বহস্তের রচনা।” কাহিনী-ও অনেকটা এমনই। যেন নিজের থেকে কিছুটা সরে এসে একান্তে নিজের কথা বলা। লেখিকা যে জীবন প্রকাশ করতে চেয়েছেন, এখানে তা প্রাণ পেয়েছে। এ যেন এক বিনির্মাণ। সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে নিজেকে ফিরে দেখা, সেই ‘ফিরে দেখা আমি’র উপস্থাপনা।

বিনয়িনীর আনন্দে ভরপুর ছেলেবেলা, পিতার আদর, পিতা গুণেন্দ্রনাথের আকস্মিক মৃত্যুর পর মায়ের কঠোর অকালবৈধব্য পালন, বিবাহ, স্বামী-শ্বশুরবাড়ির প্রসঙ্গ, স্বামীর মৃত্যু, শান্তিনিকেতনে মেয়ে প্রতিমাদেবীর আতিথ্য গ্রহণ— এই স্মৃতিকথায় ঠাঁই পেয়েছে। কার্তিকের ভোর, শ্রীধর ঠাকুরের পুজো, সন্ধ্যারতি, রুপোর প্রদীপদানি, ধূপের ধোঁয়া— পুজোর নানা আনন্দময় স্মৃতি আছে তাতে। স্বদেশি আন্দোলনের উদ্দীপনাময় কাল তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। বাপের বাড়িতে চরকা কাটার রেওয়াজ ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তাল ঢেউ তাঁর স্মৃতিকথাকে স্পর্শ করেনি। প্রতিমাদেবীর প্রথম স্বামীর অকালমৃত্যু, রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রতিমার বিধবা-বিবাহ এবং সে কারণে উদ্ভূত তর্কও স্থান পায়নি।

অনুমান করা যেতে পারে, স্বামী শেষেন্দ্রভূষণ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিনয়িনীর মধুর দাম্পত্যবন্ধন ছিল। স্বামীর ছিল বই ও ছবির শখ। ইংরেজি ছাড়াও ফরাসি ভাষা জানতেন। তাঁর উপহার দেওয়া একটি পার্সিয়ান ছবির বই অবনীন্দ্রনাথের ছবি আঁকার ধরন বদলে দেয়। ছেলেবেলায় ছোট ভাই এবং বাবার মৃত্যু, আর পরিণত বয়সে পৌঁছে বড় কন্যা অমিয়া ও স্বামীর মৃত্যু তাঁকে তীব্র শোকাহত করেছিল। ভাবুক মনে দার্শনিক নির্লিপ্ততা বইত ফল্গুধারার মতো। স্বামীর মৃত্যুর পর লিখছেন, “তখন আমার যে ধৈর্য্যগুণ এল, এখন মনে হলে আশ্চর্য্য হয়ে থাকি। মনে হলো এই যে; যাওয়া আসা এ ত কতগুলি তৃণগুচ্ছ, নদির ঢেউয়ে কখন একত্র হচ্ছে, আবার সরে যাচ্ছে।” পাঁচ নম্বর, ছয় নম্বর ও পাথুরিয়াঘাটা— এই তিনটি বাড়ির সূত্রে গাঁথা তাঁর কাহিনী।

কাহিনী

বিনয়িনী দেবী, সঙ্কলন ও সম্পা: জয়িতা বন্দ্যোপাধ্যায়

৫০০.০০

ঋতুরাজ প্রকাশন

হিন্দু ও ব্রাহ্ম, দুই ধর্মীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় ছিল। বৌদিদিদের কাছে ইতু-কথা শোনা, রামায়ণ পড়া, মায়ের কণ্ঠে ব্রহ্মসঙ্গীত, মেম টিচারের কাছে খ্রিস্টের গল্প শোনা— এর মধ্যে বড় হয়ে ওঠা। পূজার্চনা করেছেন সারা জীবন, কিন্তু কোথাও এই দু’টি সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর মনে বিরোধ ছিল বলে মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর মধ্যে সাধনার সহজ রূপটি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। উনিশ শতকের মেয়েদের আত্মচরিতে ঈশ্বরের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য, ভক্তি, স্বপ্নদর্শন প্রভৃতির উল্লেখ পাওয়া যায়। এই চরিতগ্রন্থেও আছে দেবী চণ্ডীর কথা। কাশীধামে গিয়ে চণ্ডীর মন্দির দর্শন, কলকাতার ৯বি প্যারীমোহন লেনে থাকার সময় চণ্ডীর নিত্য দর্শন হত। শারদীয়া পুজোয় শান্তিনিকেতনে থাকার সময় বিনয়িনী স্বপ্ন দেখেন, অসুস্থ কন্যা প্রতিমার বাংলোয় দেবী চণ্ডী দাঁড়িয়ে। আবার বিন্ধ্যাচলে নবরাত্রিতে অষ্টভুজা মূর্তির সামনে অসংখ্য বলিদানে রক্তের ঢেউ ভেসে যাচ্ছে দেখে গা শিউরে উঠেছে তাঁর।

রং-রূপ-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শ ডালপালা মেলেছে তাঁর লেখায়: “গঙ্গা মুঙ্গের শহরটিকে বেষ্টন করে রয়েছেন। পাহারের উপর থেকে দেখাচ্চে যেন রুপর ফিতে জড়ান পরে আছে। নিচে ধানের খেত, সরিষের খেত, ভুটার (ভুট্টার) খেত... আসনের মত উপর থেকে দেখাচ্চে গরু মানুষ খুব ছোট (২) দেখাচ্চে।” তাজমহল দেখে রূপপিপাসু মনের উপলব্ধি: “চাঁদের আলোয় তাজ ভেসে উঠল ঠিক যেন সাদা বড় পদ্মফুল ফুটে রয়েছে চাঁদের ভালবাসায় চাঁদের দিকে চেয়ে রয়েছে…।”

সঙ্কলনে আছে বিনয়িনীকে লেখা অবনীন্দ্রনাথের কিছু চিঠি। একটি আশ্চর্য চিঠি রয়েছে: সারনাথে গিয়ে অবনীন্দ্রনাথের যেন পূর্বজন্মের নানা স্মৃতি মনে পড়ে যায়, এ যেন তাঁর ঘরে ফেরা: “সারনাথের যাদুঘরে যেসব মাটির ঘোড়া, খুরি, গেলাস, কুঁজো দেখেছো, সেসব আমার হাতে গড়া তার কোনো ভুল নেই। তখনকার পটগুলো কোথায় গেল কে জানে।” এক চিঠিতে অবনীন্দ্রনাথ লিখছেন, ঘরে বসে মনে হত বরফের পাহাড় বুঝি মেঘের মতো সাদা, দেখে বুঝেছেন, “সে তীক্ষ্ণতা ও ধবলতা মেঘে সম্ভবে না।” ‘তীক্ষ্ণতা ও ধবলতা’ শব্দ দুটিতে দৈর্ঘ্য প্রস্থ বেধ রং রূপ অন্তর্গত হয়ে যায়। পত্রপ্রেরকের মতো পত্রপ্রাপকের শিল্পবোধও প্রকাশিত, যে-সে লোককে এমন চিঠি লেখা যায় না।

এই স্মৃতিকথনের ভাষা সহজ সাবলীল, প্রসঙ্গান্তরে মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলে। যে নারী কথকতা শুনে বড় হয়েছে সে যে এমন উপভোগ্য কথ্য ভাষায় লিখবে তা নিয়ে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়। মূল পাণ্ডুলিপির কিছু পাতা না থাকায় সেখানে প্রতিমাদেবীর লেখা স্মৃতিচিত্র-এর সাহায্য নেওয়া হয়েছে। কাহিনী লেখার সময় রবীন্দ্রনাথের গানের ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের ভাব ও ভাবনা আরও স্পষ্ট করেছেন লেখিকা। সঙ্কলনে বিনয়িনীর পৌত্র সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের লেখা একটি মূল্যবান প্রাক্‌কথন ও পটভূমি আছে, নিভৃতচারিণী বিনয়িনীকে বুঝতে সহায়তা করবে। পরিশিষ্টে আছে গুণেন্দ্রনাথ, প্রসন্নকুমার, জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের উইল, বিনয়িনী ও প্রতিমাদেবীর উইল, রথীন্দ্রনাথ দেহরাদূনে থাকাকালীন রথীন্দ্র-প্রতিমার চিঠি। অন্তর্ভুক্ত হয়েছে প্রসন্নকুমার প্রকাশিত আ ব্রিফ অ্যাকাউন্ট অব দ্য টেগোর ফ্যামিলি। জয়িতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনা ও গবেষণা বইটিকে হৃদয়গ্রাহী করেছে, তবে কথামুখে কাহিনী সম্পর্কে সম্পাদকের মতামত ও বিশ্লেষণ থাকলে আরও ভাল হত। বইয়ে ব্যক্তি-পরিচিতি, টীকা থাকায় গবেষক-পাঠক উপকৃত হবেন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

book review

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy